গাজীপুর

পূর্বাচলে চেয়ারম্যান অলির স্বজনদের নামে ৬৩ প্লট, দুদকের অনুসন্ধান শেষ পর্যায়ে

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের জন্য গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলার ছয় হাজার ১৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। জমি অধিগ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে তা বরাদ্দে বড় ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে।

বরাদ্দ হওয়া জমির মধ্যে কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ অলিউল ইসলামের (অলি) নিকটাত্মীয় ও স্বজনদের নামে বরাদ্দ হয়েছে ৬৩টি প্লট। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে প্লটগ্রহীতারা বড় অঙ্কের অর্থও হাতিয়ে নিয়েছেন!

জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও রাজউকের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে এমন জালিয়াতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। অভিযোগ অনুসন্ধান পর্যায়ে সংস্থাটির উপপরিচালক মো. রফিকুজ্জামান নথিপত্র সংগ্রহের পাশাপাশি রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পের পরিচালক ও প্রধান প্রকৌশলীসহ (বাস্তবায়ন) নয় কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। জিজ্ঞাসাবাদে বেশকিছু অসঙ্গতি ধরা পড়েছে বলে জানা গেছে। চলছে আরও যাচাই-বাছাই।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ অলিউল ইসলামের বিরুদ্ধে (ঢাকার এলএ কেস-২/০১-০২, ৩/১০-০২ ও ৭/০১-০২ এর মাধ্যমে) ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া সত্ত্বেও জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে নিজ আত্মীয়-স্বজনদের নামে ৬৩টি প্লট হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। প্রতিটি প্লটের আয়তন তিন কাঠা। একই সঙ্গে এসব প্লট যাদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তারা এর আগে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থও হাতিয়ে নেন!

এ বিষয়ে দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, অভিযোগটি পাওয়ার পর সংস্থাটির যাচাই-বাছাই কমিটির সুপারিশক্রমে এটি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। এরপর অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পের পরিচালক শেখ শাহিনুল ইসলাম ও প্রধান প্রকৌশলী উজ্জ্বল মল্লিকসহ বেশকিছু কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এছাড়া রাজউকের এস্টেট ও ভূমি-৩ শাখার উপপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান; তিনজন সহকারী পরিচালক মো. ইফতেখারুল ইসলাম, ফারিয়া সুলতানা ও বিধান রায়, দুজন কানুনগো মো. আব্দুস সাত্তার ও মো. গিয়াস উদ্দিন এবং সার্ভেয়ার মো. মতিউর রহমানের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধান শেষ পর্যায়ে রয়েছে। শিগগিরই চূড়ান্ত প্রতিবেদন কমিশনের জমা দেওয়া হবে।

অন্যদিকে, যার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ সেই নাগরী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ অলিউল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, প্লটগুলো যখন বরাদ্দ দেওয়া হয় তখন আমি চেয়ারম্যান ছিলাম না। স্থানীয় আওয়ামী লীগের সেক্রেটারিও ছিলাম না। অভিযোগটা অনেক আগের। নির্বাচনের সময় একটি পক্ষ আমার বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার চালিয়েছিল।

‘আমি যে এলাকায় বসবাস করি, সেখানে সবাই আমার আত্মীয়-স্বজন। আমার এলাকার ১৪০০ জনকে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সবাই কোনো না কোনোভাবে আমার স্বজন। অভিযোগটা পুরো মিথ্যা। যারা ক্ষতিগ্রস্ত তারাই প্লট পেয়েছেন। ভিন্ন কিছু হওয়ার সুযোগ নেই। যদি সুযোগ থাকত তাহলে অন্য এলাকার অনেক ক্ষমতাবান ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন প্লট পেতেন।’

দুদক ও রাজউক সূত্রে জানা যায়, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পটি ১৯৯৫ সালে হাতে নেয় রাজউক। পূর্বাচল শহর প্রকল্প তৈরির আগে ২০০৩ সালে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলার ছয় হাজার ১৫০ একর জমি ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও ১১ জন সহকারী কমিশনারের (ভূমি) সমন্বয়ে গঠিত একটি দল জমি অধিগ্রহণ করে। ঢাকার জেলা কার্যালয়ের এলএ কেস নং-২/০১-০২, ৩/১০-০২ ও ৭/০১-০২ এর মাধ্যমে অধিগ্রহণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।

পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে যাদের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে তাদের কাছ থেকে প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত আবেদনপত্র আহ্বান করা হয় ২০১০ ও ২১০৮ সালে। আগ্রহীরা রাজউক ভবনের ব্যাংক থেকে আবেদন ফরম সংগ্রহ করে জামানত দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও আদিবাসী কোটায় প্লট পাওয়ার জন্য আবেদন করেন। আবেদনপত্রের সঙ্গে ডিসি অফিসের অ্যাওয়ার্ড সনদ, পরিচয়পত্র ও স্থানীয় চেয়ারম্যানের সনদপত্র জমা দেন। এসব আবেদনপত্র রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পের পিডির নেতৃত্বে রাজউক কর্মকর্তারা যাচাই-বাছাই করেন। যাচাই শেষে এক হাজার ৪৪০ জনকে প্লট বরাদ্দের সুপারিশ করেন।

২০২১ সালের ৯ মে এসব প্লট সাময়িক বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে কালীগঞ্জে আদিবাসী কোটায় ৮৯৯টি, ক্ষতিগ্রস্ত কোটায় ৪৪১টি এবং রূপগঞ্জে ক্ষতিগ্রস্ত কোটায় ১০০টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া সত্ত্বেও জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে একজন চেয়ারম্যানের আত্মীয়-স্বজনদের নামে ৬৩টি প্লট বরাদ্দের অভিযোগ ওঠে। মূলত ডিসি অফিস থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ও আদিবাসী শনাক্ত করা হয়। যার ভিত্তিতে রাজউক প্লট বরাদ্দ দেয়। প্লট বরাদ্দের আবেদনের সঙ্গে কারা চেয়ারম্যানের আত্মীয়-স্বজন, সেটা শনাক্ত করার কথা নয়। বরাদ্দের ক্ষেত্রে কোনো জালিয়াতি, অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়ে থাকলে সেটাও বের করা খুব সহজ কাজ নয়।

এ বিষয়ে জানতে দুদকের উপপরিচালক মো. রফিকুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি বক্তব্য দিতে অস্বীকার করেন।

অন্যদিকে, রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন) মো. উজ্জ্বল মল্লিকের সঙ্গে ফোনে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। তিনিও কল রিসিভ করেননি।

 

আরো জানতে…

দুর্নীতির মাধ্যমে ৬৩টি প্লট হাতিয়ে নিয়ে দুদকের জালে নাগরীর চেয়ারম্যানসহ তাঁর স্বজনরা!

এলএ শাখার সহযোগীতায় ‘পূর্বাচলে প্রায় সাড়ে ৫শ কোটি টাকা মূল্যের প্লট’ হাতিয়ে নেয়ার পায়তারা!

 

 

সূত্র: ঢাকা পোস্ট

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button