ওসির মধ্যস্থতায় ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে!
গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ধর্ষিত তিন সন্তানের এক জননীকে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার মধ্যস্থতা করছেন পাবনা সদর থানার ওসি। এ ঘটনায় ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে শোকজ করা হলেও তার পক্ষেই কথা বলছেন জেলার পুলিশ সুপার।
পাবনা সদর থানার ওসি ওবাইদুল হকের মধ্যস্থতায় ধর্ষণের শিকার ওই নারীকে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ধর্ষিত ওই নারীর স্বামী আছেন।
গত ৩১ আগস্ট ধর্ষণের শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ওই নারী। ৫ সেপ্টেম্বর পাবনা সদর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন তিনি। পুলিশ অভিযুক্তদের মধ্যে রাসেল নামে একজনকে আটক করে। পরে ওসি ওবাইদুল হকের মধ্যস্থতায় পাবনা সদর থানায় রাসেলের সাথে ওই নারীর বিয়ে দিয়ে ধর্ষণের ঘটনা ধামাপাচাপ দেয়ার চেষ্টা করা হয়।
সংবাদ মাধ্যমে এ ঘটনা প্রকাশের পর সোমবার ওসিকে শোকজ করে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। মঙ্গলবার অভিযুক্ত রাসেলকে আটক দেখিয়েছে পুলিশ।
আক্রান্ত নারীর ভাই অভিযোগ বলেন, ‘‘৫ সেপ্টেম্বর রাতে তার বোনকে নিয়ে থানায় মামলা করতে গেলে ওসি তার মেডিকেল পরীক্ষাসহ অন্যান্য আইনগত বিষয় নিয়ে কথা বলে বোনকে থানায় রেখে দেন এবং আমাদের পরদিন আসতে বলেন। কিন্তু পরদিন ওসি আমাদের ফোন করে বলেন, মামলা করার দরকার নেই কারণ রাসেলের সাথে তার বোনের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। আমার বোনের স্বামী আছে, তিনজন সন্তান আছে। ওসি সাহেব কীভাবে রাসেলের সাথে তার বিয়ে দিলেন?”
স্থানীয় লোকজন জানান, এলাকার প্রভাবশালীদের পক্ষ নিয়ে ওসি টাকার বিনিময়ে ধর্ষকের সঙ্গে ওই নারীর বিয়ে দিয়েছেন।
ওসি ওবাইদুল হক এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি বলেন, ‘‘আমি কোনো কথা বলব না, আমার বিষয়টি স্যারেরা দেখছেন, যা বলার তাদের বলেছি।”
ওসির পক্ষে অবস্থান নিয়ে পাবনার পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘ওই নারীকে আত্মহত্যা থেকে বাঁচাতে বিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন আমরা ধর্ষণের মামলা নিয়েছি এবং রাসেলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, জড়িত অন্যদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। যে বিয়ে পড়িয়েছেন তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।”
বিয়ের মধ্যস্থতা করায় ওসির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে কি না, সেই প্রশ্নে পুলিশ সুপার বলেন, ‘‘ওসি তো কোনো ফৌজদারী অপরাধ করেননি। আর তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে না।” ধর্ষিত ওই নারীকে এখানো থানায় রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
গত ৩০ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জে এক স্কুল ছাত্রীকে অপহরণের পর ধর্ষণ করে কারারক্ষী মৃদুল দত্ত। পরে তাকে আটক করা হলেও সমঝোতার মাধ্যমে ওই স্কুল ছাত্রীকে বিয়ে এবং আট শতক জমি লিখে দিয়ে রেহাই পান তিনি। গত ১০ মে চাঁদপুরে একই ধরনের ঘটনায় চার অভিযুক্তকে আটক করা হয়। পরে তাদের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা নিয়ে তাদের একজনের সঙ্গে ওই কিশোরীকে বিয়ে দেয়া হয়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) উপ-পরিচালক নীনা গোস্বামী বলেন, ‘‘আগে সমাজের প্রভাবশালীরা আইনের তোয়াক্কা না করে নিজেরাই সালিশ করে ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষণের শিকার নারীর বিয়ে দিতেন, এখন সেটা সরাসরি পুলিশ শুরু করেছে, যা এলার্মিং। এ রকম বিয়ে অনেক হচ্ছে বলে আমরা জানতে পারছি, তবে সঠিক পরিসংখ্যান নেই।”
আসকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খানের ভাষ্য, ‘‘নব্বইয়ের দশকে এক গবেষণায় দেখা যায় ২০ ভাগ ধর্ষিতাকে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেয়া হয়। আদালতের মাধ্যমে অতীতে আমরা এ রকম বিয়ের ঘটনা দেখেছি। অধিকাংশ ঘটনায় সমঝোতায় বাধ্য করা হয়। এ কারণেই ধর্ষণের মামলায় শতকরা পাঁচ ভাগের বেশি শান্তি হয় না।”
বাল্য বিবাহ নিরোধ আইনের ১৯ ধারা ধর্ষণে উৎসাহ ও ধর্ষণের পর সমঝোতার সুযোগ করে দেয় বলে মনে করেন অনেকে। এজন্য ওই ধারটি নিয়ে হাইকোর্টে রিট করেছিল জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি। ওই ধারায় বিশেষ ক্ষেত্রে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের সর্বোত্তম স্বার্থে অভিভাকদেরও আদালতের অনুমতি নিয়ে বাল্য বিবাহকে বৈধতা দেয়া হয়েছে।
জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সাবেক প্রধান অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, ‘‘ওই ধারা বাতিলের জন্য আমরা আবার আদালতে যাব। প্রচলিত আইনে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেয়া অপরাধ হলেও কৌশলে বিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং এর সংখ্যা অনেক।”
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘‘ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেয়া মানে হলো দানবের সাথে বিয়ে দেয়া। এর মাধ্যমে অপরাধীকে শাস্তি না দিয়ে অপরাধের শিকার নারীকে শাস্তি দেয়া হয়, ওই নারীকে স্থায়ীভাবে অপরাধীর হাতে তুলে দেয়া হয়। এতে তার জীবনটা নরক হয়ে ওঠে, মাতৃত্বে সংকট তৈরি হয়।”
সূত্র: ডয়চে ভেলে