আলোচিতসারাদেশস্বাস্থ্য

মশার পেছনে ওড়ে শতকোটি, তবু রেহাই পাচ্ছে না নগরবাসী

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় মশা মারার জন্য ২০১৯-২০ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৪৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা, পরে সেটা বেড়ে ৫৮ কোটিতে দাঁড়ায়। চলতি অর্থবছরে ডিএনসিসিতে মশা মারতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮৪ কোটি টাকা।

পাঁচ বছরের ব্যবধানে মশানিধনের খরচ অনেক বাড়লেও এ কাজে সফলতা দেখাতে পারেনি ডিএনসিসি। একই অবস্থা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেও। সেখানে প্রায় ৫০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে বছরে শতকোটি টাকার বেশি খরচ হলেও নগরবাসী মশার অত্যাচার থেকে রেহাই পাচ্ছে না। মশা মারায় খরচ বাড়লেও মশা কমে না। নগরবাসীর অভিযোগ, এর কারণ সিটি করপোরেশনের গাফিলতি, কার্যকরী ওষুধ ব্যবহার না করা, ঠিকমতো ওষুধ না ছিটানো ও মশার প্রজননক্ষেত্র চিহ্নিত করে ধ্বংস করতে না পারা। মানুষের সচেতনতার অভাবও একটা কারণ।

জানা গেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ মশানিধনে আলাদা কর্মসূচি নিয়ে থাকে। কিন্তু তাদের কর্মসূচি তেমন কার্যকরী নয়। ফলে নগরীর মানুষ মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ থাকে। আবার ডেঙ্গু মৌসুমে হাজার হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। গত বছরও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। এর মধ্যে ঢাকায় ১ লাখ ১০ হাজার ৮ জন। আর ঢাকার বাইরে ২ লাখ ১১ হাজার ১৭১ জন। গত বছর ডেঙ্গুতে মারা গেছে ১ হাজার ৭০৫ জন। ঢাকায় ৯৮০ জন ও ঢাকার বাইরে ৭২৫ জন। এ হিসাব হাসপাতালে ভর্তি হওয়াদের। তাদের বাইরে কয়েক লাখ লোক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বাড়িতে থেকে ও চিকিৎসকের চেম্বারে গিয়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছে। এর হিসাব সরকারি দপ্তরে থাকে না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘এখানে যে ওষুধ ছিটানো হয় সেটি কতটা কার্যকর তা পরীক্ষা করে জানা দরকার। কার্যকর ওষুধ আমদানি করা দরকার। ওষুধ ঠিকমতো ছিটানো হয় কি না, তার তদারকি দরকার। সিটি করপোরেশনের তদারকি কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মানুষকে সংযুক্ত করা দরকার। তাহলে নিশ্চিত হওয়া যাবে ওষুধ ঠিকমতো ছিটানো হয় কি না।’ তিনি বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায় সিটি করপোরেশনের মশককর্মীরা রাস্তায় ওষুধ ছিটায়। মশা কিন্তু রাস্তায় থাকে না। মশা থাকে বাসাবাড়ির আনাচে-কানাচে, ড্রেনে, ময়লার স্তূপে ও যেসব জায়গায় পানি জমে সেখানে। এসব জায়গা স্থানীয়দের সহায়তা চিহ্নিত করে ওষুধ ছিটাতে হবে। মশানিধনে তিনটি কথা মনে রাখা জরুরি ঠিক ওষুধ, ঠিক সময় ও ঠিকমতো ছিটানো।’

নগরীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মশার উৎপাত বেড়েছে। মানুষ মশার কামড় থেকে রক্ষা পেতে নিজেরাই কীটনাশক স্প্রে, মশার কয়েল ও মশারি ব্যবহার করছে। তারা মশানিধন কার্যক্রম বাড়াতে সিটি করপোরেশনের প্রতি আহ্বান জানান।

রাজধানীর মগবাজারের বাসিন্দা রুহুল আমিন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘এই এলাকায় মশার উৎপাত বেড়েছে। কিন্তু সিটি করপোরেশনের মশককর্মীদের ওষুধ ছিটাতে দেখা যাচ্ছে না।’

রাজধানীর পোস্তগোলার বাসিন্দা শাফনাজ ইসলাম সংবাদ মাধ্যমকে জানান, তার পরিবারের সদস্যরা চারতলায় থাকেন। তার ফ্ল্যাটসহ আশপাশের এলাকায় প্রচুর মশা। সামনে ডেঙ্গুর মৌসুম। তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আতঙ্কে আছেন।

মিরপুর শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা আবুল কাশেম সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, মিরপুরে মশা আছে, তবে অন্য বছরের তুলনায় কিছুটা কম। সামনে বৃষ্টির মৌসুম। মশা বাড়বে। সিটি করপোরেশনের ওষুধ ছিটানো আরও বাড়ানো দরকার।

দক্ষিণখানের বাসিন্দা গোলাম সাত্তার সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, এই এলাকায় প্রচুর মশা। মানুষ মশার কয়েল, ইলেকট্রিক ব্যাট, স্প্রে ও মশারি ব্যবহার করছে। তার এলাকায় এক মাসেও সিটি করপোরেশনের মশককর্মীদের মশার ওষুধ ছিটাতে দেখা যায়নি। তিনি মশকনিধন কার্যক্রম বাড়ানোর জন্য সিটি করপোরেশনের প্রতি আহ্বান জানান।

সূত্র জানায়, গত রোববার ডিএসসিসিতে মশা মারার বিষয়ে বৈঠক হয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস মশানিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। মশার প্রজননক্ষেত্র খোঁজ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) ১০টি অঞ্চল রয়েছে। এসব অঞ্চলে ৭৫টি ওয়ার্ড রয়েছে। মশানিধনে ১ হাজার ৫০ জনবল কাজ করছে। মশানিধনে প্রায় ৫০ কোটি টাকা খরচ হয়। কিন্তু মশার আক্রমণ থেকে মানুষ রেহাই পাচ্ছে না।

ডিএসসিসির প্রধান ভা-ার ও ক্রয় কর্মকর্তা মোহাম্মদ বশিরুল হক ভুঞা সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, মশানিধন কার্যক্রম সারা বছরই চলে। প্রয়োজনীয় ওষুধ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। তিনটি স্থানে ফিল্ড পরীক্ষা শেষে ওষুধ ছিটানো হয়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো ফজলে শামসুল কবির বলেন, ‘এখন কিউলেক্স মশা বেশি হয়ে থাকে। মশার বিস্তার কমাতে আমাদের মশানিধনকর্মীরা কাজ করছে। আমাদের ৭৫ ওয়ার্ডের প্রতিটিতে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত লার্ভিসাইডিং ও দুপুর আড়াইটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত অ্যাডালটিসাইডিং ওষুধ ছিটানো হয়। মশার বংশবিস্তার কমাতে খাল, ডোবা, নালা, ড্রেন পরিষ্কার করা হচ্ছে। আমাদের কাজের কারণে এ বছর মশা অনেক কম।’ তিনি বলেন, ‘সামনে ডেঙ্গুর মৌসুম। আমরা সতর্ক আছি।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও (ডিএনসিসি) ১০টি অঞ্চলে বিভক্ত। এসব অঞ্চলে মোট ৫৪টি ওয়ার্ড রয়েছে। ডিএনসিসিতে মশানিধনে গত অর্থবছরে ৫২ কোটি ৫০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮৪ কোটি টাকা।

সিটি করপোরেশনে কীটতত্ত্ববিদ নেই : মশানিধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন কীটতত্ত্ববিদরা। শহরের কোথায় মশার প্রজননস্থল তৈরি হয়েছে এবং সেখানে মশানিধনে কী কার্যক্রম গ্রহণ করা দরকার তা নিয়মিত ইনস্পেকশন করে প্রতিবেদন দেন করপোরেশনের কীটতত্ত্ববিদরা। তার ওপর ভিত্তি করেই করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ মশানিধনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু উত্তর সিটি করপোরেশনে একজন কীট নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা থাকলেও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে কোনো কীটতত্ত্ববিদ নেই। ফলে মশার প্রজননক্ষেত্র বা উৎপত্তিস্থল অজানা থেকে যায়।

স্বাস্থ্যের প্রি-ইনস্পেকশন রিপোর্ট আসে মৌসুম শেষে : কীটতত্ত্ববিদদের ওপর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্ভরতা অনেক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইনস্পেকশন করে এপ্রিলে আর রিপোর্ট দেয় জুলাই-আগস্টে। ফলে তাদের কার্যক্রম শুরুর আগে মশা শহর-গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে।

এ বিষয়ে ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাসের সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রি-ইনস্পেকশন করে থাকে। তারা এপ্রিল মাসে ইনস্পেকশন করে তার রিপোর্ট সিটি করপোরেশন পাঠায় জুলাই-আগস্টে। ফলে অভিযান দেরিতে শুরু হয়। ইতিমধ্যে মশা বংশবিস্তার করে ফেলে। রিপোর্ট যথাসময়ে পেলে দ্রুত অভিযান চালিয়ে মশার আবাসস্থল ধ্বংস করা যায়।’

মানুষ সচেতন নয় : রাজধানীর কোথায় মশার উৎপত্তিস্থল বা কোনো বাসাবাড়িতে মশার প্রজননস্থল তা জানালে ডিএসসিসি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করতে পারে। মশার আবাসস্থল ধ্বংসসহ যাবতীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু গত দুই মাসে নাগরিকদের কোনো ফোন আসেনি। মানুষ যথাযথমাত্রায় সচেতন নয়।

 

সূত্র: দেশ রূপান্তর

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button