আলোচিতজাতীয়

রোজাকে সামনে রেখে শুল্ক কমেছে, বাজারে দাম কমবে?

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : এক সপ্তাহ আগে চার ধরনের পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক কমানো হলেও তার প্রভাব নেই বাজারে। আর সহসা প্রভাব পড়বে বলেও মনে হয় না। রোজার মাসকে সামনে রেখে শুল্ক কমানো হয়েছে।

অবশ্য আগামী সপ্তাহে ভোজ্য তেল ও চিনির দাম কিছুটা কমবে বলে জানিয়েছেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। আর বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী বলেছেন ১ মার্চ থেকে ওই চারটি পণ্য কম দামে বিক্রি না করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আমদানিকারকেরা সংবাদ মাধ্যমকে বলছেন, ডলার সংকট এবং এলসি খোলা থেকে আমাদানি পর্যন্ত সময় বিবেচনায় নিতে হবে। তারা যা আগেই আমদানি করেছেন তার শুল্ক তো দিয়ে দিয়েছেন। ওই চার ধরনের পণ্য আমদানিতে ১৫ দিন থেকে দেড় মাস সময় লাগে। সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আর খেজুর আমদানিকারকেরা অভিযোগ করেছেন শুল্কায়নের সময় দাম বাড়িয়ে দেখানোয় বাস্তবে খেজুরের দাম কমার কোনো সম্ভাবনা নেই।

আমদানিকারকেরা এই শুল্ক কমানোর সুবিধা সর্বোচচ ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত পাবেন। চাল আমদানিতে ১৫ মে পর্যন্ত সুবিধা দেয়া হলেও চলতি অর্থ বছওে চাল আমদানি হচ্ছে না।

শুল্ক কমায় দাম কত কমার কথা:
৮ ফেব্রুয়ারি চার ধরনের পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক কমানোর প্রজ্ঞাপণ জারি করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। পণ্যগুলো হলো: চাল, ভোজ্য তেল, চিনি ও খেজুর।

সেদ্ধ ও আতপ চালের আমদানি শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে সেদ্ধ ও আতপ চাল আমদানিতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বা রেগুলেটরি ডিউটি ২৫ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এ সুবিধা চাল আমদানিকারকেরা পাবেন আগামী ১৫ মে পর্যন্ত। দেশে পরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেলের উৎপাদন ও ব্যবসা পর্যায়ের মূল্য সংযোজন কর বা মূসক বা ভ্যাট পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়েছে। এ সুবিধা তারা পাবেন আগামী ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত। বিদেশ থেকে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত সয়াবিন তেল এবং পাম তেল আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। আমদানিকারকেরা এ সুবিধা পাবেন ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত।

খেজুরের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ কমানো হয়েছে। আগে আমদানি শুল্ক ছিলো ২৫ শতাংশ। আমদানিকারকেরা এ সুবিধা পাবেন আগামী ৩০ মার্চ পর্যন্ত।

পরিশোধিত ও অপরিশোধিত উভয় ধরনের চিনির আমদানি আমদানি শুল্ক কমানো হয়েছে। অপরিশোধিত চিনি আমদানিতে প্রতি মেট্রিক টনে আমদানি শুল্ক কমিয়ে এক হাজার টাকা করা হয়েছে। আগে যা ছিল দেড় হাজার টাকা। আর পরিশোধিত চিনি আমদানিতে টনপ্রতি আমদানি শুল্ক কমিয়ে করা হয়েছে দুই হাজার টাকা, আগে যা ছিল তিন হাজার টাকা। এ শুল্ক ছাড় পাওয়া যাবে ৩১ মার্চ পর্যন্ত।

এক পয়সাও দাম কমেনি:
শুল্ক কমানোর এক সপ্তাহ পর বৃহস্পতিবার বাজারে দেখা গেছে ওই চার ধরনের ভোগ্য পণ্যের দাম এক পয়সাও কমেনি।প্রতি কেজি সাধারণ মানের খেজুর ২২০ থেকে ২৫০ টাকা। এক মাস ধরে এ দরেই এসব খেজুর বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। গত বছরের চেয়ে অবশ্য কেজিতে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি।

আগের মতোই প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৭০ থেকে ১৭৩ এবং খোলা তেল ১৫৮ থেকে ৬২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর পাম তেলের লিটার ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা । এক মাসের বেশি সময় ধরে এ দরেই বিক্রি হচ্ছে ভোজ্যতেল। দুই মাস ধরে খোলা চিনির কেজি ১৪০ থেকে ১৪৫ এবং প্যাকেটজাত চিনি ১৪৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এখনও সেই দরে কিনতে হচ্ছে চিনি।

বাজারে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল ৭০ থেকে ৭৫, মাঝারি চাল ৫৫ থেকে ৬৫ ও মোটা চালের কেজি ৫০ থেকে ৫৪ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। শুল্ক কমানোর পর চালের দাম কমেনি। তবে চলতি অর্থবছরে কোনো ধরনের চাল আমদানি হয়নি। গত বছর ১৭ থেকে ১৮ লাখ টন চাল আমদানির অনুমতি দিলেও আমদানি হয়েছে চার লাখ ২১ হাজার টন।

কলাবাগানের মুদি দোকানদার আব্দুর রহিম সংবাদ মাধ্যমকে জানান,” আমদানি শুল্ক কমানোর পর ওইসব পণ্যের দাম এখনো কমেনি। আমরা আগের দামেই বিক্রি করছি। কমবে কিনা জানিনা। তবে চালের দাম অভিযানের ফলে কয়েকদিন আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে। আর চিনি, সয়াবিন ও পাম তেল এবং খেজুরের দাম গত ১৫ দিন থেকে এক মাস আমরা একই দামে বিক্রি করছি। চিনির দাম কিছুটা কমেছে তবে তা এখন নয়, আগেই কমেছে।”

তার কথা,” কবে কমবে আমরা জানি না। পাইকারি যাদের কাছ থেকে আনি তারা কমালে আমরাও কমাবো। তার আগে তো পারব না।”

আমদানিকারকেরা যা বলছেন:
বাংলাদেশের ভোজ্য তেল এবং চিনি আমদানির যে পাঁচটি বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আছে তার মধ্যে মেঘনা গ্রুপ একটি। ওই গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার মজিবুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশে চিনি আসে প্রধানত ব্রাজিল থেকে। আর সয়াবিন ও পাম তেল আনা হয় ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে। ব্রাজিল থেকে চিনি আনতে সব মিলিয়ে কমপক্ষে এক মাস লাগে। আর ভোজ্য তেল আনতে ১৫ দিন থেকে এক মাস লাগে। ফলে আমরা নতুন আমদানি করলে শুল্ক কমানোর সুবিধা পাবো। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি আগেই আমদানি করা তেল ও চিনির দাম কমাতে। কয়েকদিনের মধ্যেই আমরা তেলের দাম কিছুটা কমাবো। চার-পাঁচ টাকা ডিসকাউন্ট দেব লিটারে।”

তার কথা,”অনেকেই রোজার মাসের চাহিদা হিসাব করে তেল-চিনি নিয়ে এসেছেন। হয়তো ওই মাসের জন্য নতুন অল্প কিছু আমদানি হবে। পাইপলাইনে যা আছে তা শুল্ক সুবিধা পাবে। যার এলসি আগেই খোলা হয়েছে , পাইন লাইনে আছে সেগুলো নির্ধারিত সময়ের আগে খালাস হলে শুল্ক সুবিধা পাওয়া যাবে।”

তার বিবেচনায় সরকার যে নির্ধারিত সময়ের জন্য শুল্ক সুবিধা দিয়েছে তাতে অল্প অল্প পরিমাণ তেল চিনি এই সুবিধায় আনা যাবে।

তবে ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, “তাতে খুচরা দামের ওপর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। কারণ ডলারের দাম বেশি হওয়ায় তা সমন্বয় করতে গিয়ে দাম তেমন কমানো যাবে না।”

এদিকে ফ্রুটস ইমপোর্টারর্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম অভিযোগ সংবাদ মাধ্যমকে করেছেন,”আমদানি শুল্ক কমানো হলেও খেজুরের দাম কমবে না। কারণ শুল্কায়নের সময় কাস্টমস কর্মকর্তারা খেজুরের দাম অনেক বেশি ধরে তার ওপর ডিউটি নির্ধারণ করছে। এটা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন আমদানি শুল্ক কমাতে তারা কমিয়েছেন। কিন্তু দাম বেশি দেখিয়ে দুইগুণ-তিনগুণ শুল্ক নিচ্ছেন।”

তিনি দাবি করেন, “আমরা ইরাক থেকে সাধারণ মানের খেজুর কার্টনে করে আমদানি করেছি ৯০০-১০০০ ডলারে। এখন শুল্কায়নের সময় দাম ধরা হচ্ছে দুই হাজার ৫০০ ডলার। আর বস্তায় ভরে প্রতি টন আনি ৫০০-৬০০ ডলারে, কিন্তু শুল্কায়নের সময় দাম ধরা হয় এক হাজার ডলার। তাহলে একদিকে শুল্ক কমানোর কথা বলছে অন্যদিকে দুই-তিনগুণ শুল্ক বেশি আদায় করছে।” তার কথা, এই পরিস্থিতিতে নতুন কওে কেউ খেজুর আমদানি করবে না।

অজুহাত থাকবেই:
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের(ক্যাব)সহসভাপতি এস এম নাজের হোসেন বলেন,”শুল্ক কমানোর ঘোষণা আরেকটু আগে দিলে ভালো হতো। তবে এখনো এর সুবিধা ভোক্তাদের পাওয়া উচিত। আসলে ব্যবসায়ীরা এই সুযোগে কম শুল্কে পণ্য আমদানি করে পরে বেশি দামে বিক্রি করবে। এটা তাদের একটা পলিসি। এজন্যই তারা নানা অজুহাত দেখাচ্ছে। এরইমধ্যে বাজারে ওই চারটি পণ্যের দাম কিছুটা হলেও কমা উচিত ছিল। কিন্তু একটুও কমেনি।”

তার কথা, “এর আগে আমরা দেখেছি আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়লে তারা আগে আমদানি করা পণ্যের দামও সঙ্গে সঙ্গে বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু শুল্ক কমালে তারা আমদানির সময় ও ডলারের অজুহাত দেয়।”

তিনি জানান,” বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী ও ভোক্তা অধিদপ্তরের ডিজি বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে আমিও ছিলাম। ব্যবসায়ীরা সেখানে দাম কমানোর কোনো প্রতিশ্রতি দেয়নি। উল্টো তাদের কেউ কেউ বলেছেন. চার পণ্যে শুল্ক কমানোর কারণে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।”

সামনের সপ্তাহে চিনি ও তেলের দাম কমবে:
ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন,”আমদানি শুল্ক কমানোর পর বাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে একটু সময় লাগবে। আরো আগে শুল্ক কমালে আরো আগে প্রভাব পড়ত। আমরা এক সপ্তাহের মধ্যে ট্যারিফ নির্ধারণ করে দেব। কাগজপত্র দেখে এটা করব। তাতে ভোজ্য তেল ও চিনির দাম কমবে। তবে চিনির দাম সামান্য কমবে। কারণ চিনির আমদানি শুল্ক সবচেয়ে কম কমানো হয়েছে।”

আর বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “আমরা সামনের সপ্তাহের মধ্যে দাম ফিক্সড কওে দেয়ার চেষ্টা করছি। ১ মার্চ থেকে এই চারটি পণ্য কম দামে বিক্রি করতে হবে। আমরা এরমধ্যে আমদানিকারকদের আগে আনা পণ্য ক্লিয়ার করতে বলেছি। এক তারিখ থেকে আমরা আমদানিকারকদের গুদামে ইন্টরভেন করব।”

তিনি বলেন,” আসলে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। তারা ইচ্ছা করে সরবরাহ কমিয়ে দেয়। এবার যাতে সেটা করতে না পারে সেজন্য আমরা নানা ব্যবস্থার কথা ভাবছি।”

আর খেজুর আমদানিকারকদের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “সব মানের খেজুর একইসঙ্গে আমদানি করে একই দাম ধরা হত। তারপর ইচ্ছে মতো বাজারে দাম নির্ধারণ করে বিক্রি করা হত। এই কারণে এনবিআর একটি অ্যাসেসমেন্ট দাম নির্ধারণ করে দেয়। তারপরও তাদের অভিযোগ আমরা দেখব।”

“আমরা বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে আমদানিকারকদের মূল হাব খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। এরপর ঢাকায় মৌলভীবাজারের ব্যবসায়িদের সঙ্গে বৈঠক করব,” জানান বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশে পবিত্র রোজার মাস শুরু হবে।

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button