আলোচিতজাতীয়

সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দুর্নীতি : দুদকের ১০ সুপারিশ ফাইলবন্দি

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : সাবরেজিস্ট্রি অফিসের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দেওয়া ১০ দফা সুপারিশ বাস্তবায়ন করেনি নিবন্ধন অধিদপ্তর। সুপারিশগুলো প্রায় দুই বছর ধরে ফাইলবন্দি রয়েছে। তবে চিহ্নিত অপরাধগুলোর মধ্যে থেকে বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে কয়েকটি মামলা করেছে দুদক। আবার অভিযোগের ভিত্তিতে নিবন্ধন অধিদপ্তরও কয়েকজন সাবরেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানা গেছে।

আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন নিবন্ধন অধিদপ্তরের সাবরেজিস্ট্রার অফিসগুলোকে অনিয়ম-দুর্নীতির উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে ২০২২ সালে ১০টি সুপারিশসহ নিবন্ধন অধিদপ্তরকে একটি প্রতিবেদন দেয় দুদক।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দলিল নিবন্ধনের পর সময়মতো বালাম বইতে কপি না হওয়ার কারণে মূল দলিল সরবরাহে কয়েক বছর দেরি করা হয় এবং সার্টিফায়েড কপি সরবরাহেও জটিলতার সৃষ্টি করা হয়। এ ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতারা দালালের খপ্পরে পড়েন এবং দ্রুত সেবা পাওয়ার জন্য উৎকোচ দিতে বাধ্য হন। এ ছাড়া দলিল রেজিস্ট্রেশনের সময় রাজস্ব হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা করা পে-অর্ডার, ব্যাংক ড্রাফট, চেক ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের হিসাবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা হয় না। এতে ব্যাংক ড্রাফট, পে-অর্ডার, চেকগুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে গায়েব হয় এবং জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টি হয়। জমি রেজিস্ট্রেশন হওয়ার সময় জমা করা জাল পে-অর্ডার, ব্যাংক ড্রাফট, চেক ইত্যাদি নির্ধারিত সময়ে ব্যাংকে জমা না দেওয়ার কারণে পরবর্তী সময়ে তা খুব কমই ধরা পড়ে। পে-অর্ডার, ব্যাংক ড্রাফট, চেক ইত্যাদি এন্ট্রি দেওয়ার জন্য রক্ষিত রেজিস্ট্রারের সব কলাম পূরণ করা হয় না। দলিল রেজিস্ট্রেশন হওয়ার পর নোটিশসংশ্লিষ্ট এসি ল্যান্ড অফিসে পাঠানোর কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। দাতা-গ্রহীতার মধ্যে জমির প্রকৃত বিনিময় মূল্য বেশি হলেও তা দলিল লেখক ও সাবরেজিস্ট্রারের সহায়তায় কম দেখিয়ে রেজিস্ট্রেশন করার কারণে প্রকৃত রেজিস্ট্রেশন ফি পাওয়া থেকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে। নিয়োগ-বদলির ক্ষেত্রে ব্যাপক বাণিজ্যের জনশ্রুতি রয়েছে, আইন ও ম্যানুয়াল অনুযায়ী তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী বদলি, দলিল লেখক, নকলনবিশ (এক্সট্রা মোহরার) নিয়োগের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট জেলা রেজিস্ট্রারের। কিন্তু বাস্তবে এ নিয়োগ ও বদলি আইজিআরের দপ্তর থেকে করা হয়। নিয়োগবহির্ভূত অনেক লোক রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে কাজ করেন, যাদের উমেদার (পিয়ন) বলা হয়। সাবরেজিস্ট্রি অফিসে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবৈধ লেনদেন এসব উমেদারের মাধ্যমে হয়ে থাকে। ফলে এসব অনিয়ম-দুর্নীতি অবিলম্বে রোধ করা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদকের পক্ষ থেকে ১০ দফা সুপারিশ করা হয়। সুপারিশসগুলোর মধ্যে রয়েছে নিবন্ধনের পর গ্রহীতাকে তাৎক্ষণিক দলিল ডেলিভারি দিতে তিন কপি দলিল সম্পাদন করে রেজিস্ট্রেশন করা, যাতে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দাতা-গ্রহীতাকে এক কপি করে দলিল দেওয়া হয় এবং এক কপি বালাম বইতে অনুলিপির মাধ্যমে সংরক্ষণ করা যায়। প্রতিটি দলিল ডেটাবেজে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। রেজিস্ট্রেশন ‘ফি’ হিসেবে প্রাপ্ত পে-অর্ডার, ব্যাংক ড্রাফট, রেজিস্ট্রারে এন্ট্রিসহ সময়মতো সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে জমা দেওয়া এবং সিটিআর রিপোর্ট সংগ্রহ করা প্রয়োজন। জমির হালনাগাদ খতিয়ানের কপি সংশ্লিষ্ট সাবরেজিস্ট্রার অফিসে সংরক্ষণ নিশ্চিত করা এবং সে অনুযায়ী দলিল নিবন্ধনের আগে জমির মালিকানাসংক্রান্ত বিষয় নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। কোনো দলিল নিবন্ধনের জাল দলিল হিসেবে প্রতীয়মান হলে দেওয়ানি আদালত ছাড়া ওই দলিল বাতিল করা সম্ভব হয় না। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। যদি এ ক্ষেত্রে আইন সংশোধনের মাধ্যমে আপিল ও রিভিউ ক্ষমতা জেলা রেজিস্ট্রার ও তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে (এআইজিআর) দেওয়া যায়, তাহলে দেওয়ানি আদালতে মামলাজট হ্রাস পাবে এবং জমির প্রকৃত মালিক দীর্ঘমেয়াদি হয়রানি থেকে রেহাই পাবেন।

সম্পাদিত দলিলের দাতা, গ্রহীতা, দলিল মূল্য, জমির বিবরণের ডেটাবেজে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মৌজার গড় মূল্য সহজে পাওয়া যাবে এবং কেনাবেচা করা জমি সহজে চিহ্নিত করা যাবে। সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সাবরেজিস্ট্রার অফিস একই কর্তৃপক্ষের অধীনে এনে একই কমপ্লেক্সে স্থাপন করা যেতে পারে, যাতে জমি রেজিস্ট্রেশন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নামজারি/জমাভাগের কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে যাবে।

দুর্নীতিমুক্ত জনসেবা নিশ্চিত করতে ও সরকারি রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে জমির শ্রেণি যেমন-নালা, চালা, ডোবা, নাল, ভিটি ইত্যাদি নিশ্চিত হওয়ার জন্য ভূমি জরিপ অধিদপ্তরের জরিপ তথ্যের সঙ্গে নিবন্ধন অধিদপ্তরের সব পর্যায়ে ডিজিটালাইজেশন/অটোমেশন পদ্ধতি চালু করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। সাবরেজিস্ট্রার ও স্টাফ বদলির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট বদলির নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছাড়া লটারির মাধ্যমে বদলির ব্যবস্থা গ্রহণ যেতে পারে।

এসব সুপারিশ দুই বছরে বাস্তবায়ন না হলেও গত বছর রেজিস্ট্রেশন ফি, আয়করের পে-অর্ডার, ব্যাংক ড্রাফটসহ বিভিন্ন খাতের প্রায় ৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবরেজিস্ট্রার নিহার রঞ্জন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক, যা এখনো আদালতে বিচারাধীন। জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে দলিল রেজিস্ট্রি করায় সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগে গত ডিসেম্বর মাসে চার সাবরেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। এই চার সাবরেজিস্ট্রার হলেন খোন্দকার গোলাম কবির, মো. সাইফুল ইসলাম, আনোয়ারা বেগম ও মো.মোজাহারুল ইসলাম।

এদিকে একই ধরনের অভিযোগে গত বছর কয়েকজন সাবরেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়েছে নিবন্ধন অধিদপ্তর। গত ডিসেম্বরে সরকারি ফিসের অতিরিক্ত টাকা আদায় করায় নরসিংদী জেলার শিবপুর সাবরেজিস্ট্রার মিজাহারুল ইসলামকেও বরখাস্ত করেছে নিবন্ধন অধিদপ্তর। গত নভেম্বরে ঘুষ-দুর্নীতি ও রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগে বিভাগীয় তদন্ত সাপেক্ষে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর সাবরেজিস্ট্রার পারভীন আক্তারকে বরখাস্ত করা হয়। ঘুষের বিনিময়ে ১৫ একর জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে ১২টি দলিল রেজিস্ট্রি করে রাষ্ট্রের ১ কোটি ২৬ লাখ ৩৯ হাজার ২২৯ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সত্যতা পাওয়া যায়। এ ছাড়া সেপ্টেম্বরে ঘুষের বিনিময়ে তীব্র মাত্রার মানসিক প্রতিবন্ধী বিক্রেতার দলিল রেজিস্ট্রি করায় বরগুনা জেলার আমতলী সাবরেজিস্ট্রার নুরুল আফসারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়।

এগুলোর সবই আইন মন্ত্রণালয় ও নিবন্ধন অধিদপ্তরে আসা অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে দুদকের দেওয়া সুপারিশের ভিত্তিতে কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। এ ব্যাপারে নিবন্ধন অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক আবদুস ছালাম আজাদ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘দুদকের কোনো সুপারিশের কথা আমার জানা নেই। তবে নিবন্ধন অধিদপ্তরের কোনো ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ এলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

দুদক সচিব মাহবুব হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘দুদকের পক্ষ থেকে দেওয়া সুপারিশ বাস্তবায়ন না করা দুঃখজনক। তবে দুদকের স্বাভাবিক কার্যক্রম থেমে নেই। অভিযোগ এলেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

 

সূত্র: খবরের কাগজ

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button