আলোচিতজাতীয়সারাদেশ

ঘরে ও কলকারখানায় তীব্র গ্যাস সংকট: উৎপাদন ব্যাহত

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : এই শীতে বাংলাদেশে গ্যাস সংকট তীব্র হয়েছে। শুধু ঢাকায় নয়, প্রায় পুরো দেশে। ঘরে রান্নার কাজে যেমন গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না, তেমনি গ্যাসের অভাবে শিল্প উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এটাকে ‘সাময়িক সংকট’ বললেও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সহসা এই সংকট দূর হওয়ার সম্ভাবনা কম৷

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক প্রায় ৪১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চাহিদার বিপরীতে সব বিতরণ কোম্পানি মিলে এখন গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহ করছে সর্বোচ্চ ২৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। ৩০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলেও বড় ধরনের সংসকট হয় না।

বাংলাদেশে গ্যাস ক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত ও আমদানি করা এলএনজি দিয়ে চাহিদা মেটানো হয়। আর গ্যাস গৃহস্থালির রান্না, শিল্প কারখানা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়।

গত এক মাস ধরে একদিকে আমদানি করা এলএনজির সরবরাহ যেমন কমেছে, অন্যদিকে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদনও কমেছে।

আমদানি করা এলএনজি দিয়ে এতদিন দৈনিক ৭০ থেকে ৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলেও এখন তা দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। পাশাপাশি দেশের গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলনও দৈনিক ১০ থেকে ১২ কোটি ঘনফুট কমে গেছে। এলএনজির দুইটি ভাসমান টার্মিনালের একটি এখন রক্ষণাবেক্ষণের কাজে বন্ধ। আর গ্যাস কুপগুলোতে রক্ষণাবেক্ষনের কাজ চলছে বলে পেট্রোবাংলা দাবি করেছে।

গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প সংকটের মুখে আছে। বিজিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট শহীদুল্লাহ আজিম সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “কোনো কোনো কারখানার উৎপাদন ৩০ ভাগে নেমে এসেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জসহ সব খানেই গ্যাস সংকট। আমরা এটা নিয়ে মন্ত্রণালয়ে বার বার কথা বলেছি । কিন্তু মার্চের আগে এই সমস্যার সমাধান হবে না বলে জানানো হয়েছে।”

“তারপরও আমরা তরল গ্যাস কিনে উৎপাদন ও সরবরাহ ঠিক রাখার চেষ্টা করছি। কিন্তু উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে,” বলেন বিজিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট।

চট্টগ্রামের প্যাসিফিক জিন্সের সাইয়েদ মোহাম্মদ তানভীর সংবাদ মাধ্যমকে জানান, তারা এখন তীব্র গ্যস সংকটে ভুগছেন। উৎপাদন কমে গেছে, ক্রেতাদের কীভাবে সামলাবেন সেই চিন্তায় আছেন।

নারায়ণগঞ্জ এলাকার পোশাক কারখানাগুলো গ্যাসের অভাবে সবচেয়ে বেশি সংকটে আছে। সেখানকার অধিকাংশই নিট গার্মেন্টস। এছাড়া অন্যান্য শিল্প কারাখানাও সংকটে আছে । আধুনিক পেপার মিলের জেনারেল ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম জানান, তারা ক্যাপাসিটির অর্ধেকও উৎপাদন করতে পারছেন না গত ১৫ দিন ধরে।

ঢাকার প্রায় সব এলাকায়ই এখন রান্নার গ্যাসের সংকট চলছে। অভিজাত এলাকায় গ্যাস পাওয়া গেলেও সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত গ্যাসের চাপ কম থাকে। এছাড়া অনেক এলাকা আছে যেখানে দিনের বেলায় গ্যাসই থাকে না। মিরপুরের জেসমিন লিপি বলেন, “সকাল ৮ টায় গ্যাস চলে যায়, আসে রাত ১১টায়। রান্নাবান্না রাতেই করতে হয়। তারপরও আমি দিনে রান্না করা ও পানি গরম করার জন্য ইলেকট্রিক চুলা কিনে নিয়েছি। আমার পরিচিত আরো অনেকে ইলেকেট্রিক চুলা কিনেছেন।”

শেখ আব্দুস সাত্তার লিমন থাকেন কামরাঙ্গিরচর এলকায় । তিনি সংবাদ মাধ্যমকে জানান, “আমাদের এলাকায় রাত ২টার পর গ্যাস আসে। আবার ভোর রাতে চলে যায়। সারাদিনের রান্নাবান্না গভীর রাতেই করে রাখতে হয়। ফলে ঘুমানোও আর হয় না।”

তিনি বলেন,” আমিসহ অনেকে বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করলেও তারও এখন সংকট শুরু হয়েছে। দাম বেড়ে যাচ্ছে।”

মিরপুর ও কামরাঙ্গিরচর ছাড়াও যাত্রাবাড়ি, সায়েদাবাদ, শান্তিনগর, মহাখালি, খিলগাঁও, গোলাপবাগসহ আরো অনেক এলাকায় এখন গ্যাসের দেখা মেলাই ভার।

চট্টগ্রামেরও একই অবস্থা বলে জানান, চট্টগ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ হামিদুল্লাহ। তিনি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, বৃহত্তর বাকলিয়া এলাকায় ১৫-২০ লাখ মানুষের বসবাস। ওই এলাকায় গ্যাস এখন থাকে না বললেই চলে।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘‘বর্তমান গ্যাস সংকট সাময়িক। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে যে গ্যাস সংকট চলছে, আগামী মার্চে রোজার আগেই তা কমবে।” তিনি বলেন, “আমরা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের একটা টাইমলাইন ঠিক করে ফেলেছি। ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ থাকবে। এখন আমরা মাত্র ২০ শতাংশ গ্যাস বিদেশ থেকে আমদানি করি। ৮০ শতাংশ নিজস্ব গ্যাস ব্যবহার করছি।”

আর পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. কামরুজ্জামান খান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘‘আমাদের দুইটি ভাসামান এলএনজি টার্মিনালের একটি গত এক মাস ধরে মেরামতের জন্য সিঙ্গাপুরে ছিল। সে কারণে সরবরাহ ৫০ কোটি ঘনফুট কম ছিল। মেরামতের পর সেটি চলে এসেছে। দুই-এক দিনের মধ্যেই গ্রিডে প্রতিদিন ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হবে। এর ক্যাপাসিটি বাড়িয়ে ৬০ কোটি ঘনফুট করা হয়েছে৷ অন্যটির ক্যাপাসিটিও বাড়ানো হবে। আর কিছু কুপ পর্যাক্রমে রক্ষণাবেক্ষণে থাকে। মার্চে গ্যাস সংকট কেটে যাবে।”

তবে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মকবুল ই ইলাহী চৌধুরী সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “যে প্রক্রিয়ায় চলছে তাতে গ্যাস সংকট কাটবে না। এর সঙ্গে যুক্তরা আমদানির ওপর জোর দিচ্ছেন। কারণ, আমদানি করলে তাদের নানা সুবিধা। ব্যবসায়ীদের সুবিধা। আর আমদানির ওপর নির্ভর করা হলে সংকট হবেই। আজকে ইউক্রেন যুদ্ধ। কালকে আরেকটি সমস্যা হবেই।”

“জ্বালানি খাতে সয়ংসম্পূর্ণ হতে না পারা একটি দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের গ্যাস থাকার পরও তা উত্তোলনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। আবার যে কুপগুলো আছে সেগুলো ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণও করা হচ্ছে না। তাহলেও উৎপাদন বাড়ত। গ্যাস না থাকলে বিদ্যুতেরও সংকট হয়। গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসে থাকে। এই শীতে গ্যাস সংকটের কারণে আমাদের শিল্প উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রচুর ক্ষতির মুখে পড়ছে অর্থনীতি,” বলেন তিনি ।

তার কথা ,” পেট্রোবাংলা দাবি করছে, তারা ৪৬টি কুপ খনন করেছে। এটা আসলে অসত্য তথ্য। তারা মেরামতের কাজকেও খনন হিসেবে দেখিয়েছে। বাস্তবে তারা ১৭টি কুপ খনন করেছে। তারা না পারলে অন্যদের সুযোগ দেয়া উচিত।”

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button