আলোচিতসারাদেশ

ইসি’র নির্দেশে বদলির তালিকায় ৩২৬ ওসি এবং ২০৭ ইউএনও : চলছে তদবির ও দেনদরবার

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্দেশে দেশের বিভিন্ন থানায় কর্মরত ৩২৬ অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ও ২০৭ উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) রদবদল করা হচ্ছে।

প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ওসিদের একই জেলায় বা একই মেট্রোপলিটন এলাকায় রেখে রদবদলের প্রস্তাব ইসিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যেই রেঞ্জ ডিআইজি ও মেট্রো কার্যালয়গুলোতে শুরু হয়ে গেছে এ নিয়ে তদবির ও দেনদরবার। ভালো পোস্টিং পেতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন পরিদর্শকরা। স্থানীয় সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের সঙ্গে যোগসাজশেও অনেক পরিদর্শক ওসি পদে পোস্টিং নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।

উল্লেখ্য, প্রথম দিকে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছিল যে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া মাঠ প্রশাসনে রদবদল করা হবে না। পরে গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব অনুসন্ধান এবং নানা দপ্তর থেকে পাওয়া অভিযোগ থেকে ইসি বিভিন্ন প্রার্থীর পক্ষে ওসি ও ইউএনওদের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের ব্যাপারে জানতে পারে। অনুসন্ধানে তারা জানতে পারেন, ওসি ও ইউএনওরা অনেক দিন থেকে একই এলাকায় দায়িত্ব পালন করায় তাদের সম্পৃক্ততা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে সকল থানার ওসি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের বদলির নির্দেশ দেয় কমিশন। প্রাথমিকভাবে ওসি পদে ৬ মাসের বেশি ও ইউএনও পদে এক বছরের বেশি একই স্টেশনে দায়িত্ব পালন করছেন এমন কর্মকর্তাদের বদলির নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ পুলিশে ৬৬১টি থানা রয়েছে। এর মধ্যে হাইওয়ে পুলিশ, শিল্পপুলিশ, নৌপুলিশ, রেলওয়ে পুলিশের থানা বাদে ক্রাইম ডিভিশনে ওসি আছেন ৫২৮ জন। মূলত ক্রাইম ডিভিশনের ৫২৮ ওসির মধ্য থেকে যারা একই কর্মস্থলে ৬ মাসের বেশি সময় থেকেছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের তালিকা করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। এই তালিকায় নাম এসেছে ৩২৬টি। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আওতাধীন এলাকার ৫০ থানার মধ্যে ৩৩ থানার ওসি ৬ মাসের বেশি একই স্টেশনে দায়িত্বপালন করছেন।

পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সংবাদ মাধ্যমকে জানান, ‘আমরা চেষ্টা করছি একই জেলা বা মেট্রো এলাকাতেই ওসিদের রাখতে। যেমন ধরেন সাভারের ওসি আশুলিয়ায়, আশুলিয়ার ওসি সাভারে, আবার ধামরাইয়ের ওসি দোহারে কিংবা দোহারের ওসি ধামরাইয়ে। কারণ আশপাশের এলাকার আইনশৃঙ্খলা ও নানা বিষয় সম্পর্কেও তাদের ভালো ধারণা থাকার কথা। এতে তাদের পক্ষে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।’

অন্যদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ইসির নির্দেশে বদলি করা হচ্ছে ২০৭ জন উপজেলা নির্বাহী অফিসারকেও (ইউএনও)। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৪৯ জন, ময়মনসিংহে ১৫, বরিশাল বিভাগে ১২, সিলেটে ২১, রংপুরে ১৭, রাজশাহীতে ২৭, চট্টগ্রামে ৪৮ ও খুলনায় ১৮ জনকে প্রাথমিকভাবে বদলি করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন শাখার উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. আনোয়ার হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা পাওয়ার পরই পুলিশ সদর দপ্তরের প্রশাসন শাখা কাজ শুরু করে দিয়েছে। আশা করছি খুব দ্রুত কাজটি শেষ করা যাবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কমিশন থেকে দেওয়া চিঠির নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব অফিসার ইনচার্জ থানায় ৬ মাসের বেশি সময় ধরে আছেন, তাদের তালিকা করা হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী তাদের বদলির প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা হচ্ছে।’

বদলি হওয়া পুলিশ কর্মকর্তারা এই অল্প সময়ের মধ্যে নির্বাচনী এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা আয়ত্তে আনতে পারবেন, সে সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আশা করছি এ বদলিতে কোনো ধরনের প্রভাব পড়বে না। কারণ এখানে সবাই পেশাদার। আশা করছি, নির্বাচনকালীন সরকার বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন যেভাবে নির্দেশনা দেবেন সেইভাবে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কাজ করবে। নির্বাচনকালীন বদলি, পদায়নের বিষয়ে আমাদের মানসিক প্রস্তুতি থাকে বলে আমরা বিশ্বাস করি, বদলিতে কাজের ওপর কোনো ধরনের প্রভাব পড়বে না।’

বদলি প্রক্রিয়া কবে নাগাদ সম্পন্ন হবে জানতে চাইলে ডিআইজি বলেন, ‘কমিশন যে নির্দেশনা দিয়েছে, তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চলছে। এখানে প্রত্যেক পুলিশ পেশাদার। এতে মাঠ পর্যায়ে কোনো প্রভাব পড়বে না।’

প্রসঙ্গত, তফসিলের কিছুদিন আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ডিএমপিতে নতুন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন হাবীবুর রহমান। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে বিপুলসংখ্যক পদোন্নতি ও বদলি হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আওতাধীন ৫০ থানার মধ্যে অন্তত ৩৩ থানার ওসি বদবদল করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন) এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, ডিএমপির আওতাধীন এলাকার ৩৩ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পদে রদবদল আসছে। সব পরিদর্শকই দক্ষ। বদলির ফলে নির্বাচনী কাজে কোনো প্রভাব পড়বে না। আজকেই (রবিবার) বদলির আদেশ হবে বলে জানান এ পুলিশ কর্মকর্তা।

ইসির নির্দেশে মাঠ পুলিশে ব্যাপক রদবদলের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়ে গেলে নিরাপত্তা বাহিনী থেকে শুরু করে সবকিছুই নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত থাকে। তাই কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই সারা দেশের সব ওসি কাজ করবেন। কমিশন মনে করছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে একই স্টেশনে ওসি হিসেবে আছেন, তারা হয়তো কারও প্রতি অনুগত হতে পারে। সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হলে তাদের বদলি করা প্রয়োজন। ওসিদের নিয়ে এ ধরনের বিবেচনা কমিশনের। এজন্যই তারা সারা দেশে ওসিদের ট্রান্সফার করেছে।’

ওসিদের ব্যাপক হারে বদলিতে নির্বাচনপূর্ববর্তী ও পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কোনো প্রভাব পড়বে না বলে জানিয়েছে নন-ক্যাডার পুলিশদের সংগঠন বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ওসি মো. মাজহারুল ইসলাম সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, নির্বাচনের আর মাত্র এক মাস বাকি। এর মধ্যে নতুন একটি এলাকা নতুন ওসির নিয়ন্ত্রণে আনা একটু কষ্টসাধ্য বিষয়। তারপরও আমরা আশাবাদী। বাংলাদেশ পুলিশের পরিদর্শক যথেষ্ট পেশাদার ও দক্ষ। ফলে দায়িত্ব পালনে কোনো প্রভাব পড়বে না।

জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ৬ মাসের বেশি এক থানায় দায়িত্ব পালন করা ওসিদের বদলি করতে গত ৩০ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিবকে নির্দেশনা দিয়েছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি)। যার অনুলিপি পুলিশ মহাপরির্শক (আইজিপি)কেও দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সব উপজেলা নির্বাহী অফিসারকেও (ইউএনও) পর্যায়ক্রমে বদলির নির্দেশ দিয়েছেন ইসি। এক্ষেত্রে যে ইউএনওরা এক বছরের বেশি এবং যে ওসিরা ছয় মাসের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের বদলি করার জন্য স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। বদলি করা ইউএনও ও ওসিদের অন্য জেলায় বা অন্যত্র বদলির প্রস্তাব আগামী ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে পাঠাতে বলা হয়েছে। এ জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগকে আগামী ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসি। তফসিল ঘোষণার পর এটিই প্রশাসনিক পর্যায়ে কমিশনের বড় পদক্ষেপ।

 

সূত্র: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button