আন্তর্জাতিকআলোচিত

গাজা শহর ঘিরে রেখেছে ইসরায়েলি সেনারা, চলছে লাগাতার লড়াইও

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, তারা “গাজা শহর ঘিরে ফেলার কাজ শেষ করেছে” এবং তারা হামাসের সামরিক চৌকি , সদরদপ্তর এবং স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে।

জাতিসংঘ বলছে, গাজা উপত্যকায় একটি স্কুলে ২০ জন নিহত হয়েছে এবং চারটি আশ্রয় কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গত সাতই অক্টোবর থেকে হাজার-হাজার বিমান হামলা ও কামানের গোলা ছুড়ে আসছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলে হামাসের হামলা ১৪০০ জন নিহত এবং ২০০ বেশি মানুষকে জিম্মি করার পর থেকে অভিযান চালিয়ে আসছে দেশটি।

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে তারা হামাসের স্থাপনায় হামলা করছে, যার মধ্যে রয়েছে সুড়ঙ্গ এবং রকেট লঞ্চার। তবে তারা বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা ‘সর্বনিম্ন রাখার’ চেষ্টা করছে।

গাজায় হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, গত সাতই অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ৯০০০ মানুষ নিহত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার যা হলো

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী বলেছে, তারা “গাজা শহরটি সব দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে” এবং হামাসের স্থাপনাগুলোতে হামলা চালাচ্ছে। গাজা উপত্যকায় এই শহরটি সবচেয়ে বড় এবং যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এটি ছিল সবচেয়ে ঘনবসতি সম্পন্ন এলাকা।

জাতিসংঘ বলেছে, ২৪ ঘণ্টার কম সময়ে গাজায় থাকা তাদের চারটি স্কুল যেগুলো আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো, সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য কাজ করা জাতিসংঘের সংস্থাটি বলেছে, জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে থাকা একটি স্কুলে অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছে।

বিচ শরণার্থী শিবির এবং আল বুরেইজ শিবিরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এগুলোতে কমপক্ষে তিন জন নিহত হয়েছে।

বুধবার খোলা মিশর সীমান্তে রাফাহ ক্রসিং দিয়ে সীমিত সংখ্যক নাগরিক গাজা ত্যাগ করতে পেরেছে। মিশরীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ২১ জন আহত ফিলিস্তিনি, ৩৪৪ জন বিদেশি পাসপোর্টধারী যাদের মধ্যে ৭৩ জন শিশু রাফাহ ক্রসিং পার করেছে।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে “আরো বেশি ব্রিটিশ নাগরিক” গাজা ত্যাগ করে মিশরে ঢুকেছে। কিন্তু তারা কোন সংখ্যা জানায়নি। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ৭৪ জন আমেরিকার নাগরিক যাদের দ্বৈত জাতীয়তা রয়েছে তারা রাফাহ ক্রসিং দিয়ে পারাপার হয়েছেন।

গাজায় থাকা হামাসের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত সাতই অক্টোবর থেকে এখনো পর্যন্ত ৯০০০ মানুষ নিহত হয়েছে। সেসময় হামাস ইসরায়েলে হামলা চালালে ১৪০০ জন নিহত হয়। এরপর থেকে ইসরায়েল বিমানের মাধ্যমে গাজায় বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে “হামাসকে ধ্বংস” করার উদ্দেশ্যে।

লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবুল্লাহ আরো বলেছে, বিস্ফোরক ভর্তি দুটি ড্রোনের মাধ্যমে লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তে শেবা ফার্ম/ মাউন্ট দভ এর বিতর্কিত এলাকায় থাকা ইসরায়েলি সেনা অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে তারা।

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ইসরায়েলের জন্য ত্রাণ সহায়তা বিল পাস
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে ইসরায়েলের জন্য ১৪.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ত্রাণ সহায়তা বিল পাস হয়েছে। তবে এটি সেনেটে পাস হতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে বলে জানানো হয়।

প্রতিনিধি পরিষদে বিলটির পক্ষে ২২৬টি ভোটের বিপরীতে ১৯৬টি ভোট পড়ে। ১২ জন ডেমোক্রেট সদস্য বিলটির পক্ষে ভোট দিয়েছেন আর দুই জন রিপাবলিকান বিলটির বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন।

ডেমোক্রেটিক নেতারা এই বিলে ইউক্রেনের জন্য তহবিল থাকার বিষয়টিও সংযুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হাউসের রিপাবলিকান সদস্যরা ইউক্রেন ও ইসরায়েলের জন্য একটি অভিন্ন বিল আনতে চাননি।

রিপাবলিকানদের আনা এই প্রস্তাবে তহবিল যোগানের বিষয়টি নিয়েও আপত্তি রয়েছে ডেমোক্রেটদের। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে কর আদায়ে নিয়োজিত অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগের তহবিল কমিয়ে ইসরায়েলকে বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

সেনেট নেতা চাক শুমার এই বিলকে “গভীর ত্রুটিযুক্ত” বলে উল্লেখ করে বলেছেন, কংগ্রেসের উচ্চ পরিষদ যেখানে ডেমোক্রেটদের কিছুটা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সেখানে এটি পাস হতে পারবে না।

প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যিনি নিজেও একজন ডেমোক্রেট, বিলটি তার টেবিলে গেলে সেটিতে ভেটো দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন।

‘আমরা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি’
নয় বছর বয়সী শিশু রাফিফ আবু জিয়াদা বর্তমানে গাজার দক্ষিণাঞ্চলের খান ইউনিসে বসবাস করছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে সে জানায়, সে নোংরা পানি পান করছে এবং এর কারণে পেট ও মাথা ব্যথায় আক্রান্ত হচ্ছে।

“রান্নার জন্য কোন গ্যাস নেই, পানি নেই, আমরা ঠিক মতো খেতে পারিনা। আমরা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি,” সে বলে।

“আঙিনায় ময়লা পড়ে আছে আর পুরো জায়গাটি দূষিত।”

আমার মনে হয় না গাজায় বোমা হামলা অব্যাহত থাকলে আমার ভাই ফিরে আসবে”
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, গত সাতই অক্টোবর ২৪২ জন মানুষকে জিম্মি করেছে হামাস।

উডি গোরেনের কাজিন বা ভাই তাদের মধ্যে একজন।

বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে গোরেন তার ভাইয়ের বর্ণনায় বলেন, “সে সাধারণ একজন মানুষ, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, তার স্ত্রী আছে, তিন সন্তান আছে।” তার পরিবার “দুশ্চিন্তায় অসুস্থ” হয়ে যাচ্ছে, উডি বলেন।

কিন্তু তার সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে,তিনি মনে করেন, জিম্মিদের পরিবার আসলে “কাউকেই বিশ্বাস করতে পারছে না।”

“আমরা আমাদের সরকার বিশ্বাস করি না, আমরা মনে করি না যে তারা জিম্মিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। আর হামাসকে তো আমরা অবশ্যই বিশ্বাস করি না,”তিনি বলেন। তিনি আরো বলেন, তারা আসলে “স্পষ্ট কোন সদুত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না।”

“আমি বুঝি না যে কিভাবে, কোন পথে, গাজাকে মাটিতে মিশিয়ে ফেলার মতো বোমা হামলা অব্যাহত রাখলে তা আমার ভাইকে ফিরিয়ে আনবে। আমি কোন উপায় দেখছি না যে কিভাবে তাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জীবিত উদ্ধার করা হবে,” গোরেন বলেন।

ইসরায়েল বলছে, তারা হামাসকে “ধ্বংস” করার মাধ্যমে তারা তাদের দেশ ও বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা করছে।

ভাষণ দেবেন হেজবুল্লাহর প্রধান
লেবানন থেকে বিবিসির সংবাদদাতা হুগো বাচেগা জানিয়েছেন, লেবাননের শিয়া ইসলামি গোষ্ঠী হেজবুল্লাহর প্রধান নেতা হাসান নাসরাল্লাহ শুক্রবার তার অনুসারীদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন। ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এটা তার প্রথম জনসম্মুখে ভাষণ।

তার বক্তব্যে গোষ্ঠীটির পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে সে বিষয়ে ইঙ্গিত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরইমধ্যে গোষ্ঠীটির যোদ্ধারা লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তে ইসরায়েলি বাহিনীর সাথে তীব্র লড়াই করছে।

এর ফলে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, সেটি এই সংঘাতের আরেকটি যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

যাই হোক, এখনো পর্যন্ত সহিংসতার বেশিরভাগই নিয়ন্ত্রণ করা গেছে।

গত সাতই অক্টোবর হামাসের হামলায় ১৪০০ জন নিহত হওয়ার পর থেকে লেবানন হেজবুল্লাহ গোষ্ঠীটির উপর নজর রেখে চলেছে।

গোষ্ঠীটি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তাদের হামলা জোরদার করেছে।

দুই পক্ষই সংঘাত মারাত্মক আকারে বেড়ে যাওয়া ঠেকাতে পদক্ষেপ নিয়েছে এবং বেশিরভাগ হামলা সীমান্ত এলাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে এটা পরিবর্তিত হতে পারে।

ব্লিঙ্কেনের সামনে কঠিন কাজ
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনকে বহনকারী বিমানটি জ্বালানি নিতে আয়ার‍ল্যান্ডে অবতরণ করেছে। তিনি ইসরায়েলে নিযুক্ত নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জ্যাক লিউকে নিয়ে তেল আবিব যাচ্ছেন যেখানে তিনি দিনভর ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করবেন।

ওয়াশিংটন ডিসি ত্যাগ করার পর থেকে এই সফরটি এখনো পর্যন্ত মোটামুটি শান্তই রয়েছে।

তবে এর গতি আগামী কয়েক দিনে বাড়বে।

মার্কিন এই কূটনীতিক দলটির সামনে কঠিন কাজ রয়েছে- একদিকে ইসরায়েলিদের প্রতি আমেরিকার সমর্থন অব্যাহত রাখতে হবে, অন্যদিকে গাজায় বেসামরিক প্রাণহানি সীমিত রাখতে চাপ দিতে হবে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ধ্বংসযজ্ঞ ইসরায়েলের আরব প্রতিবেশীদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে এবং এই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ব্লিঙ্কেন বলেছেন, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে কিভাবে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি স্থাপন করা যায় সে সম্পর্কে সামনের দিনগুলোতে তিনি এই অঞ্চলের সব নেতার সাথে আলোচনা করতে চান।

সপ্তাহ শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী যদি ইসরায়েলের হামলার লাগাম টানার নতুন কোন আশ্বাস বা প্রমাণ এসব আরব নেতাদের সামনে হাজির করতে না পারেন তাহলে দীর্ঘস্থায়ী কোন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করাটা তার জন্য কঠিন হবে।

 

 

সূত্র: বিবিসি

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button