লাইফস্টাইল

মধুর গুণাগুণ ও উপকারিতা

গাজীপুর কণ্ঠ, লাইফস্টাইল ডেস্ক : মৌমাছিরা তাদের এনজাইম ঘটিত ক্রিয়াকলাপ ও তরলের বাষ্পীভবনের মাধ্যমে উদ্ভিদের চিনিজাত নিঃসরণ থেকে মধু তৈরি করে। বিভিন্ন উদ্ভিদ থেকে মধু সংগ্রহ করে মৌমাছিরা মোম ও রজন দিয়ে মৌচাক তৈরি করে তাতে মুধ সঞ্চয় করে। মৌয়ালরা সেই মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করে বাজারজাত করে থাকে। এই আঠালো ও মিষ্টি স্বাদের খাবারটি রান্নাবান্নায় ও বাণিজ্যিক পানীয় তৈরিতে মিষ্টিবর্ধক হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। তাছাড়া অসামান্য পুষ্টিগুণের কারণে স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও এটি ব্যবহার করা হয়।

বিভিন্ন ধরনের মধু
বাংলাদেশে অনেক রকমের মধু পাওয়া যায়। এর মধ্যে সুন্দরবন মধুর জন্য শ্রেষ্ঠ জায়গা। এখানকার মধুগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সেরা হানিপ্ল্যান্ট গাছের খলিসা ফুলের মধু বা পদ্ম মধু। খলিসা ফুল হয় সাদা আর এর মধুর রং বেশ গাঢ় এবং খুব কড়া ও মিষ্টি স্বাদযুক্ত। ফাল্গুন মাস অর্থাৎ মার্চ থেকে এপ্রিলে এই মধু পাওয়া যায়।

এরপরেই চৈত্র মাসে আসে হালকা লালচে রঙের ও মিষ্টি পশুর ফুলের মধু। আষাঢ় মাসের বাইন মধু আবার খলিসা কিংবা পশুর মধুর মতো এতটা কড়া স্বাদের নয়।

সাদা রঙের কেওড়া মধুর মিষ্টি স্বাদের সঙ্গে একটু টক থাকে। এই মধু জ্যৈষ্ঠ মাসে পাওয়া যায়। শীতের সময় বেশি মেলে সরিষা ফুলের মধু। এই সাদাটে ও খুব ঘন মধুটি খুব তাড়াতাড়ি জমে যায়।

কালিজিরা ফুলের কালচে রঙের মধু সহজে স্ফটিকায়িত হয় না। এতে কিছুটা গুড়ের ঘ্রাণ পাওয়া যায়।

সুন্দরবনের গেওয়া ফুলের মধুর স্বাদ হয় তেঁতো। বাদামি রঙের পাতলা এই মধু পাওয়া যায় বর্ষাকালে। সচরাচর স্ফটিকায়িত হয় না তবে এর উপরিতলে পোলেনের পুরু স্তর জমতে দেখা যায়।

স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মধুর উপকারিতা
মধুতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক দ্বারা সৃষ্ট সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করে। এটি একই সঙ্গে প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াম ও অ্যান্টি-সেপটিক, যা যে কোন সংক্রমণ দূর করতে এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। এছাড়াও মধু গলনালী প্রশমিত করে, কাশি কমানো ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে, যার ফলে সাইনাসের আক্রমণের সম্ভাবনা কমে যায়।

মস্তিষ্কের শক্তি ও স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মধু সম্পূর্ণরূপে স্বাস্থ্যবান করে তুলতে পারে। এর বিপাকীয় চাপ প্রতিরোধ এবং মস্তিষ্ককে শান্ত ও প্রশান্তকরণ দীর্ঘমেয়াদে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। মধুতে থাকা প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও থেরাপিউটিক বৈশিষ্ট্যগুলো মস্তিষ্কের কোলিনার্জিক সিস্টেম, সঞ্চালন ও স্মৃতিশক্তি হ্রাসকারী কোষগুলোকে হ্রাস করতে সহায়তা করে।

মধু প্রাকৃতিক শক্তির একটি চমৎকার উৎস কারণ এতে উপস্থিত প্রাকৃতিক চিনি সরাসরি রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে দ্রুত দেহের শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। ফলে কোন রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে যে কোন শারীরিক ব্যায়াম করা যায়। তাই প্রতিদিন সকালে প্রাতঃরাশের ৩০ মিনিট আগে এক চামচ মধু এক গ্লাস হালকা গরম পানিতে মিশিয়ে খাওয়া উচিত। পানি কাঁচা জৈব মধুর পুষ্টি সক্রিয় করে মানবদেহে নিঃসৃত করে এবং শরীরে অন্য কিছু প্রবেশ করার আগে ৩০ মিনিট ধরে শরীরকে সেই পুষ্টিগুলো শোষণ করতে দেয়।

ঘুমাতে যাবার আগেও মধু খাওয়া ঘুমের জন্য উপকারি। মধু দেহের ভেতর সরবরাহ করে সেরোটোনিন যা মূলত একটি নিউরোট্রান্সমিটার যা মেজাজকে উন্নত করে। শরীরের আভ্যন্তরীণ সিস্টেম সেরোটোনিনকে রূপান্তর করে মেলাটোনিনে যেটি একটি রাসায়নিক যৌগ যা দীর্ঘ ও আরামদায়ক ঘুমের জন্য সহায়ক।

মধুর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
মধুতে থাকে চিনি ও শর্করা, তাই অতিরিক্ত মধু খেলে রক্তে চিনির পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের খাদ্যতালিকায় এটি অন্তর্ভুক্ত করার আগে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে অবশ্যই কথা বলে নেয়া উচিত।

অতিরিক্ত মধু খাওয়া প্রতিদিনের ক্যালরির পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে। এটি শরীরের ওজন বৃদ্ধির দিকে ধাবিত করবে।

মধুতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে ঠিক কিন্তু অতিরিক্ত মধু খাওয়া নিম্ন রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।

মধুর মত আঠালো পদার্থ অতিরিক্ত মুখে নেয়া হলে অধিক পরিমাণ চিনি মুখের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। এটি দাঁতের সঙ্গে লেগে থেকে দাঁতের ক্ষয় করতে পারে।

যাদের মধুতে অ্যালার্জি আছে তাদের প্রচণ্ড পেট ব্যথা, বদ-হজম ও ডায়রিয়া হতে পারে।

খাঁটি মধু চেনার উপায়
খাঁটি মধু ফ্রিজে রাখা হলে এটি স্ফটিকাকার হয়ে যাবে না, বরং তরল অবস্থাতেই থাকবে। ভেজাল মধু শক্ত এবং স্ফটিক হয়ে যায়। এছাড়াও ভেজাল মধুর উপরিভাগে চিনির একটি সাদা স্তর আলাদা হয়ে থাকতে দেখা যায়।

রাসায়নিক দ্রব্যমুক্ত কাঁচা মধুর চেনার উপায় হচ্ছে এতে সাদা ফেনা তৈরি হবে।

ম্যাচের কাঠি খাঁটি মধুতে ডুবিয়ে তোলার পর এতে আগুন ধরাতে গেলে সঙ্গে সঙ্গে আগুন জ্বলবে। আর আগুন না লাগলে বুঝতে হবে তা ভেজাল মধু।

ভিনেগার-পানির দ্রবণে কয়েক ফোঁটা মধু মেশালে যদি ফেনা তৈরি হয় তবে মধুটি খাঁটি নয়।

সুন্দরবনের উচ্চ আর্দ্রতার কারণে এখানকার মধু পাহাড়ী মধুর মতো ঘন থাকে না। আবহাওয়ার তারতম্যের সঙ্গে মধুর বৈশিষ্ট্যেও পরিবর্তন আসে। শুষ্ক ও ঠান্ডা আবহাওয়ায় এটি ঘন হয় আর আর্দ্র আবহাওয়ায় হয়ে যায় পাতলা। সারা বছর পানিতে নিমজ্জিত থাকার ফলে ম্যানগ্রোভ বন প্রচুর আর্দ্রতা শোষণ করে। তাই বিশুদ্ধ সুন্দরবনের মধু সবসময় পাতলা ও তরল হয়।

মধু খাওয়ার সঠিক নিয়ম

সাধারন নিয়মানুসারে, প্রতি এক কাপ চিনির জন্য ৩/৪ কাপ মধু ব্যবহার করা, রেসিপিতে তরল অংশ থেকে ২ টেবিল চামচ কমানো ও ওভেনের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচে রাখা যেতে পারে।

শুধু খালি মধুর বদলে যেভাবে মধু খাওয়া যেতে পারে
সস হিসেবে বা খাবারের ওপর দিয়ে হালকাভাবে মিশিয়ে
কফি বা চায়ে মধু মিশিয়ে
টোস্ট বা প্যানকেকের ওপরে মধু দিয়ে
দই, বা যবের সঙ্গে মধু মিশিয়ে
লালা আটার রুটির সঙ্গে কাঁচা মধু, চিনাবাদাম-মাখন দিয়ে

মধু চিনি ও শর্করায় ভরপুর তাই মধু খাওয়া ভারসাম্যপূর্ণ হওয়া উচিত। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অনুসারে, নারীদের দিনে ১০০ ক্যালোরির বেশি চিনি গ্রহণ উচিত নয়। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই পরিমাণটি দিনে ১৫০ ক্যালোরি পর্যন্ত উঠতে পারে। এটি নারীদের জন্য দুই টেবিল চামচ ও পুরুষদের জন্য তিন টেবিল চামচের একটু বেশি।

মধুতে বোটুলিনাম এন্ডোস্পোর থাকতে পারে যা শিশুদের বোটুলিজমের কারণ হতে পারে। এটি মূলত একটি বিরল কিন্তু গুরুতর ধরনের খাদ্য বিষক্রিয়া, যা শিশুদের পক্ষাঘাতের কারণ হতে পারে। এমনকি পাস্তুরিত মধুতেও এই স্পোর থাকার সম্ভাবনা থাকে। এই কারণে ১ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধু খাওয়ানো উচিত নয়।

মধুর বাজার দর
মধুর অনলাইন বাজারগুলোতে সর্বসাকূল্যে কোম্পানি ভেদে প্রতি কেজির দাম ৬০০ থেকে ১৪০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

সরিষা ফুলের মধু প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, বড়ই ফুলের মধু প্রতি কেজি ৮০০, ধনিয়া ফুলের মধু প্রতি কেজি এক হাজার, সুন্দরবনের মধু প্রতি কেজি ৯০০ থেকে ১৩০০, লিচু ফুলের মধু প্রতি কেজি ৭০০ থেকে ১২০০, সুন্দরবনের খলিশা ফুলের মধু প্রতি কেজি ৯০০ থেকে ১,৩০০, কালোজিরা ফুলের মধু প্রতি কেজি ৯০০ থেকে ১,৪০০ ও মিশ্র ফুলের মধুর এক কেজি ৯০০ থেকে ১,১০০ টাকা।

বিশ্বজুড়ে যুগ যুগ ধরে মধু আরোগ্য লাভের সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যে কোন সংক্রমণের বিরুদ্ধে মধুর কার্যকারিতা নিয়ে চলমান গবেষণাগুলোতে ইতিবাচক সাড়া মিলছে। চিনির একটি উৎকৃষ্ট বিকল্প হলেও মধু গ্রহণে পরিমিতিবোধ বজায় রেখে সুষম খাদ্য গ্রহণ করা উচিত।

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button