আলোচিতসারাদেশ

ফের আলোচনায় ‘গায়েবি’ মামলা

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : বিএনপির বেশ কিছু নেতাকর্মী গ্রেপ্তারও হয়েছেন। বারবার ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ আনা হয়েছে এসব মামলায়। অথচ ঘটনাস্থলের আশপাশে যারা ছিলেন তারা কেউই ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শোনেনি। এসব মামলার বাদী পুলিশ কিংবা আওয়ামী লীগ বা এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী। আসামি বিএনপি নেতাকর্মী। অধিকাংশ মামলায় অভিযোগও হুবহু এক।

গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর ভাটারা থানায় বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা করেন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা পরিচয় দেওয়া মো. হাসান। বাস ভাঙচুর, চার-পাঁচটি ককটেল বিস্ফোরণসহ লাঠিসোঁটা নিয়ে আওয়ামী লীগ কর্মীদের উপর হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে মামলায়। বিএনপির ২২ নেতার নাম উল্লেখ করেএবং অজ্ঞাত ৫০-৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এই মামলায় পুলিশ দু’জনকে গ্রেপ্তারও করেছে।

এজাহারে বলা হয়েছে, গত বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে কুড়িল প্রগতি সরণিতে ফ্লাইওভারের পাশে বিশ্বরোডের মূল সড়কে বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মী প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে লাঠিসোঁটা, ককটেল ও পেট্রোল বোমায় সজ্জিত হয়ে বাস গাড়ি ভাঙচুর করে। টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বাধা দিলে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীকে পিটিয়ে আহত করা হয়। চারটি বিস্ফোরিত ককটেলের অংশবিশেষ, পাঁচটি পেট্রল বোমাসদৃশ বস্তু, বাঁশের লাঠি ও পোড়ানো টায়ার জব্দ দেখানো হয়েছে।

কিন্তু সংঘর্ষস্থলের আশপাশের বাসিন্দা ও দোকানিরা বলেন, বুধবার রাতে মিছিল, ককটেলের বিস্ফোরণ বা সংঘর্ষ কিছুই হয়নি। ককটেল বিস্ফোরণের কোন শব্দও শোনেননি। ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক রাসেল বাবু জানান, মামলায় যে ঘটনাস্থলের কথা বলা হয়েছে, তা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে বুধবার রাতে তারা মশাল মিছিল করেছেন। মিছিল থেকে একজনকে গ্রেপ্তারও করেছে পুলিশ। সে ঘটনায় ভাটারা থানায় কীভাবে মামলা হয়? মিছিল হয়েছে ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকায়। হয়রানির জন্যই এই মামলায়।

ভাটারা থানার অফিসার ইনচার্জ মো. সাজেদুর রহমান জানান, “মামলা তো যে কেউ করতে পারে। আমরা তদন্ত করছি। দুই জনকে গ্রেপ্তারও করেছে। ঘটনা কিছু না ঘটলে তো আর মামলা হয় না। তদন্ত করে আমরা দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।”

২০১৮ সালে নির্বাচনের আগে এমন ‘গায়েবি’ মামলা হয়। বিএনপির অভিযোগ, গত জুলাই থেকে ‘গায়েরি’ মামলা দেওয়া শুরু হলেও গত ১০ দিনে সারা দেশে সংখ্যা এ সংখ্যা বেড়েছে। বিভাগীয় গণসমাবেশ ঠেকাতে ঢাকায় ৬০টি সহ সারা দেশে ১৩৬টি মামলা হয়েছে। রাজশাহীর আট জেলায় ৩৭ মামলাতেই আসামি ১০ হাজারের বেশি। আগামী ৩ ডিসেম্বর রাজশাহীতে বিএনপির সমাবেশ হওয়ার কথা রয়েছে।

বিএনপিমহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেছেন, আন্দোলন বাধাগ্রস্ত করতে গায়েবি মামলার খেলা শুরু করেছে সরকার। কোনো কিছু ঘটেনি, হঠাৎ বলে দিল- নাশকতা হয়েছে। নিজেরাই বোমা রেখে মামলা দিচ্ছে। নিজেদের অফিস ভাঙচুর করে বিরোধী দলের নেতাকর্মীকে আসামি করার খেলা চলছে।

তবে গায়েবি মামলার বিষয়ে গত বুধবার রাজশাহীতে এক অনুষ্ঠানে আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা অভিযান চালাচ্ছি। যেখানে যা পাওয়া যাচ্ছে, উদ্ধার করছি। কেউ যদি আগুন সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে চায়, তা হলে তা রুখে দিতে প্রস্তুত আছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।”

এদিকে গায়েবি মামলা ও হয়রানির বিরুদ্ধে ৩০ নভেম্বর দেশজুড়ে নির্যাতনবিরোধী সমাবেশ করা হবে বলে ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইমরান সালেহ প্রিন্স। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ ভীত হয়ে পড়েছে। ফলে তারা বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করে ভীতি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু তাদের ব্যর্থতার কারণে সাধারণ মানুষ ফুঁসে উঠেছেন। আমরা এখন সরকার পতনের আন্দোলনের দ্বারপ্রান্তে।”

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (গণমাধ্যম) মো. মনজুর রহমান বলেন, “গায়েবি মামলা বলে আইনে কিছু নেই। যে ঘটনা ঘটছে, সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মামলা হচ্ছে। পুলিশ আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছে।”

গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার নিমপাড়া ইউনিয়নের জোতকার্তিক বিএন উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে গোপন বৈঠক থেকে ককটেল বিস্ফোরণের ‘ঘটনায়’ বিএনপির ১৫০ নেতাকর্মীকে আসামি করে মামলা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, খবর পেয়ে গেলে বিএনপি কর্মীরা চারটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে, ইট ও পাথর নিক্ষেপ করে পালিয়ে যায়। বিপুলসংখ্যক বাঁশের লাঠি ও হামলায় ব্যবহৃত পাথরের টুকরা জব্দ করা হয়েছে আলামত হিসেবে।

তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হামলা ও সংঘর্ষ দেখেননি। জোতকার্তিক বিএন উচ্চ বিদ্যালয়ের নৈশপ্রহরী আব্দুল কুদ্দুস বলেন, যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে, তখন তিনি স্কুলের মাঠেই ছিলেন। সেখানে সভা দূরে থাক, একজন মানুষও ছিল না।

পাবনার ৯ থানায় ‘ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় ১১টি মামলায় বিএনপির আট শতাধিক নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গল ও বুধবার রাতে ১৮টি ককটেল বিস্ফোরিত হয়েছে। ২১টি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতারা এসব মামলার বাদী। তবে ঘটনাস্থলের আশপাশের লোকজন বোমা বা ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ পাননি।

বিএনপির তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ আগস্ট থেকে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে এ ধরনের ৯৬টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৪ হাজার ৪১২ জনকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে। অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে ১০ হাজার ৬৬৪। এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪৪৫ জনকে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে দায়ের হওয়া এসব মামলায় যাদের সাক্ষী করা হয়েছে, তাদের একটি বড় অংশই ঘটনা সম্পর্কেই জানেন না। গত সোমবার নওগাঁর মহাদেবপুর থানায় বিএনপির ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরো ২০-২৫ জনকে আসামি করে মামলা করেন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি কাওছার আলি প্রামাণিক। পরদিন মঙ্গলবার রাতে ১২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত ৪০-৫০ জনকে আসামি করে নওগাঁ সদর থানায় একটি মামলা করেন জেলা ছাত্রলীগের সদস্য মোশাররফ হোসেন শান্ত। দুটি মামলার এজাহারের ভাষা প্রায় একই। শুধু ঘটনাস্থল ও আসামি ভিন্ন।

আওয়ামী লীগ কি বিএনপির আন্দোলনে ভয় পাচ্ছে? ভয় থেকেই কী এসব ‘গায়েবি’ মামলা হচ্ছে? জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বলেন, “আওয়ামী লীগ কোনো আন্দোলনকে ভয় পাই না। সব রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় কিছু না কিছু অপরাধী আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে। নির্বাচন এলে ওই অপরাধীরা তাদের তৎপরতা শুরু করে। ফলে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীকে তো ব্যবস্থা নিতেই হয়। তবে বিনা কারণে যদি কোনো রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়, সেটা নিন্দনীয়।”

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button