আলোচিতজাতীয়শিক্ষা

করোনার পর মানসিক চাপে শিক্ষার্থীরা

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : করোনা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এর ফলে আত্মহত্যার মতো দুঃখজনক ঘটনাও বাড়ছে।

‘আঁচল ফাউন্ডেশন’ নামে তরুণদের একটি প্রতিষ্ঠানের জরিপ বলছে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শতকরা প্রায় ৭৬ ভাগ শিক্ষার্থী নানা ধরনের একাডেমিক চাপে আছেন। এর বাইরে পারিবারিক ও সামাজিক চাপও আছে। সেশন জট, পরীক্ষার খারাপ ফলাফল, অ্যাকাডেমিক চাপ ও ভবিষ্যৎ ভাবনায় তাদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক সঞ্চারিত হচ্ছে। তারা নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। নানা আসক্তির পাশাপাশি তারা ইলেকট্রনিক ডিভাইসেও আসক্ত হয়ে পড়ছেন। মনোচিকিৎসক এবং শিক্ষা গবেষকেরা বলছেন করোনা পরবর্তী শিক্ষা নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনার দরকার ছিলো, সেটা না করায় এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং এবং পরিবারে তাদের প্রতি যে মনোযোগ দরকার ছিলো তা দেয়া হচ্ছে না।

জরিপ যা বলছে

‘আঁচল ফউন্ডেশন’- বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪০৪ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ৫৭ জন, স্কুলের ২১৯ জন, মাদ্রাসার ৪৪ জন, কলেজ পড়ুয়া ৮৪ জন৷ তাদের মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ছিলো ২৪২ জন এবং পুরষ শিক্ষার্থী ১৬২ জন।

‘করোনা পরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর একাডেমিক চাপের প্রভাব এবং তাদের আত্মহত্যার প্রবণতা’ শীর্ষক জরিপে মোট এক হাজার ৬৪০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। জরিপে অংশ নেয়া ৭৫.৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন তারা করোনা পরবর্তী একাডেমিক চাপের কারনে বিভিন্ন ধরনের মানসিক সম্মুখীন হচ্ছেন। এই চাপের কারণ, করেনায় দীর্ঘ বিরতির ফলে সৃষ্ট সেশনজট, পড়াশোনায় অনীহা, পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে হতাশা, শিক্ষাঙ্গণে পঠিত বিষয় বুঝতে না পারা ইত্যাদি। ৫৭.৯৯ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন যে তাদের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অতিরিক্ত ভয় ও উদ্বেগ কাজ করছে।

৭০.৭৩ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছেন, মোবাইল, ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, তাদের জীবনকে সহজ করে তুললেও এর উপর অতিরিক্ত আসক্তি ও নির্ভরতা শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তারা একা হয়ে পড়ছেন এবং সামাজিকভাবে কম মিশছেন, নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন। আবার মানসিক সমস্যা জনিত কারণে অতিরিক্ত ঘুম অথবা নিদ্রাহীনতা হচ্ছে। এর ফলে ৭১.৭১ শতাংশ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন ধাপে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আর সন্তানদের প্রতি অতিরিক্ত স্বপ্ন বা প্রত্যাশার চাপে ৫৫.৪৩ শতাংশ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

জরিপে অংশ নেয়াদের মধ্যে ৬৭.৬৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের,২৩.৪১ শতাংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং ২.২৬ শতাংশ শিক্ষার্থী অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের। পুরুষ শিক্ষার্থী ও নারী শিক্ষার্থী যথাক্রমে ৪৩.৯ এবং ৫৬.১ শতাংশ।

কেন এই অবস্থা, কী করতে হবে?

আঁচল ফাউন্ডেশনের সভাপতি তানসেন রোজ বলেন, ‘‘করোনার পর দ্রুত সিলেবাস শেষ করতে চাইছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। আর পরিবার চাইছে তারা পড়াশুনা শেষ করে দ্রুত চাকরি নেন। এই দুই ধরনের চাপের সঙ্গে সামাজিক ও ব্যক্তিগত বিষয়ের চাপও আছে। ফলে শিক্ষার্থীরা এক ধরনের নাজেহাল অবস্থার মধ্যে রয়েছেন। তাদের কাছ থেকে সবাই শুধু প্রত্যাশা করছেন৷ দিন দিন এই প্রত্যাশা বাড়ছে। কিন্তু তাদের পক্ষ কীভাবে, কতটা দেয়া সম্ভব সেটা কেউ ভাবছেন না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা পরিবার কোনো পক্ষ থেকেই না, ফলে তারা তারা অনেকটা অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়েছেন। এর ফলে আত্মহত্যার মত দুঃখজনক ঘটনা ঘটছে।”

তার কথা, ‘‘আসলে আমাদের মানসিকতার পরির্তন না আসলে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাউন্সেলিং এবং গুড প্যারেন্টিং খুব জরুরি। শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা বিবেচনায়া না নিয়ে শুধু চাপ দিলে পরিস্থিতি খারাপ হতে বাধ্য হচ্ছে।”

এই সময়ে বিশ্বব্যাপীই একটা চাপ আছ। প্রতিযোগিতা, কর্মসংস্থান, ভবিষ্যত- এগুলো নিয়ে একটা গ্লোবাল চাপ আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মনে করেন, সেই চাপের বাইরে নয় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরাও। তিনি বলেন, ‘‘করোনায় যে একটা পরিবর্তন এসেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সেটা হিসাবে রাখছে না। তারা আগের মতই শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে৷ এখানে যে পরিবর্তন ও কাউন্সেলিং-এর প্রয়োজন আছে তা তারা ভাবছেন না, ফলে শিক্ষার্থীরা চাপে পড়ছেন। এটা তারা বলার জায়গাও পাচ্ছেন না। আবার আমাদের অভিভাবকেরা চান তারা দ্রুত লেখা পড়া শেষ করে চাকরি করুক। পাশের বাড়ির কেউ চাকরি পেয়ে গেলে সেটার তারা তুলনাও করছেন।”

তিনি বলেন, ‘‘করোনা পরবর্তী শিক্ষা নিয়ে আগেই ভাবা দরকার ছিলো, তবে এখনো সময় আছে৷ আর সরকারের উচিত হবে যে লাখ লাখ শূন্য পদ আছে তাতে নিয়োগ দেয়া। আমাদের এখানে এখন সরকারি ও বেসরকারি চাকরির মধ্যে একটা বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে, ফলে সবাই মনে করছেন চাকরি মানে সরকারি চাকরি। তাই সরকারের উচিত এই বৈষম্য দূর করতে উদ্যোগ নেয়া।”

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক মনোচিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘‘এই সময়ে পরিবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল হতে হবে, তাদের পর্যবেক্ষণে রেখে তাদের সমস্যার কথা শুনতে হবে। চেষ্টা করতে হবে সমস্যা সমাধানের। তাদের ওপর চাপ না দিয়ে সহনীয়ভাবে তাদের হ্যান্ডেল করতে হবে।”

তিনি বলেন, ‘‘শিক্ষার্থীদের জীবনের সংগ্রাম এবং সাফল্য দুইটি সম্পর্কেই বাস্তব ধারণা দিতে হবে। পড়াশুনা শুধু বইয়ে সীমবদ্ধ রাখলে চলবে না। আর সবার মানসিক সক্ষমতা সমান নয়। সেটা বুঝে সেইভাবে আচরণ করতে হবে। আর পরিস্থিতি খারাপ হলে মনোচিকিৎসকের সহায়তা নিতে হবে।”

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button