আলোচিত

ডোপ টেস্টে পুলিশের দ্বৈতনীতি

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : কেবল কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যদের ডোপ টেস্ট করা হয়েছে গত তিন বছর। বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) থেকে ওপরের পদের কর্মকর্তাদের একজনও ডোপ টেস্টের মুখোমুখি হননি। তাই নিচের দিকের পদে কর্মরত পুলিশ সদস্যরা ভেতরে ভেতরে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলছিলেন। প্রথম এক বছর ডোপ টেস্ট গতি পেলেও গত দুই বছর এই কর্মযজ্ঞে ধীরগতি চলছিল। এখন প্রায় বন্ধ।

অপরদিকে, ডোপ পজিটিভ হলেই চাকরিচ্যুত না করে পুনর্বাসন ও চিকিৎসার দাবি জানিয়েছে পুলিশের একটি সংগঠন।

অভিযোগ উঠেছে, পুলিশে সিদ্ধান্তহীনতা ও দ্বৈতনীতির কারণে ডোপ টেস্টের এই কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একই বাহিনীর মধ্যে দুই নিয়ম চলে না। ডোপ টেস্ট করলে সব পদেই করা উচিত। তবে যারা অপারেশনাল কাজে মাঠে যান, মাঠেই বেশি থাকেন, তাদের টেস্ট আগে হবে এটাই স্বাভাবিক। তাদের সংখ্যাও বেশি। তাই টেস্টও বেশি হবে। তবে ডোপ টেস্ট নিয়ে পুলিশের নিজস্ব একটি নীতিমালা থাকা উচিত। সেই নীতিমালাটা যথাযথভাবে আছে কিনা দেখতে হবে।

ডিএমপিতেই শুরু, ডিএমপিতেই বন্ধ

পুলিশ সদস্যদের মাদকমুক্ত রাখতে ২০২০ সালের ১০ মার্চ প্রথম ডোপ টেস্ট শুরু হয় ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি)। শুরুর পর ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই কার্যক্রমে গতি ছিল। এই ১১ মাসে প্রায় ১০০ জন পুলিশ সদস্য ডিএমপিতে ডোপ টেস্টে পজিটিভি হন। তারা মাদকাসক্ত ছিলেন। তবে ২০২১ সালের মার্চ থেকে ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত এই ১৮ মাসে মাত্র ২০ জন শনাক্ত হয়েছেন। আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে কোনও ডোপ টেস্ট হয়নি। সর্বশেষ ডোপ টেস্ট হয় গত ২৭ জুলাই। সব মিলিয়ে গত তিন বছরে ১২০ জন মাদকাসক্ত পুলিশ সদস্য ধরা পড়েছেন।

পরীক্ষা ও পজিটিভের তালিকায় কারা এগিয়ে

ডিএমপির ডোপ টেস্টের তালিকা অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি পজিটিভ হয়েছে পুলিশ কনস্টেবলরা। ডোপ টেস্টে পজিটিভ ১২০ জন পুলিশ সদস্যের মধ্যে ৮৪ জনই কনস্টেবল। বাকিদের মধ্যে সাত জন নায়েক, সাত জন সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই), ১১ জন উপ-পরিদর্শক (এসআই), একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট ও একজন পুলিশ পরিদর্শক আছেন।

পজিটিভ সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা

ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়েছেন এমন ১২০ জনের মধ্যে ইতোমধ্যে ১১১ জনের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই একজন মৃত্যুবরণ করেছেন, একজন অবসরে চলে গেছেন।

ছড়িয়ে পড়েছে অসন্তোষ

একই বাহিনীতে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের একটি অংশের ডোপ টেস্ট হওয়া, অপর অংশের না হওয়া নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক পদের পুলিশ সদস্যরা এটা নিয়ে কথা বলছেন। এএসপি থেকে আরও ওপরের পদের কর্মকর্তাদেরও ডোপ টেস্টের আওতায় আনলে হয়তো এই প্রশ্ন উঠতো না। একাধিক কনস্টেবল ও পুলিশ পরিদর্শকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের অসন্তোষের কথা জানা গেছে। তবে কেউ তাদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। নন-ক্যাডার পুলিশ সদস্যদের সংগঠন বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন এ নিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক দফায় কথাও বলেছেন।

বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও পরিদর্শক মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের ডোপ টেস্টের ঘোষণায় ছিল বাহিনীর সব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পরীক্ষা করা হবে। কোনও একটা পদ পর্যন্ত হবে, এমন হওয়ার কথা ছিল না। এটা একটা ভালো উদ্যোগ। সন্দেহভাজন সবার টেস্ট হওয়া উচিত। আমরা তাই জানি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের আধুনিক পুনর্বাসন কেন্দ্র রয়েছে। কেউ পজিটিভ হলেই তাকে চাকরিচ্যুত করার হার্ডলাইনে না যাওয়াই উত্তম। কারণ, মাদকাসক্তি এক ধরনের অসুস্থতা। এজন্য চিকিৎসার প্রয়োজন। যারা পজিটিভ হবে তাদের চিকিৎসা করানো যেতে পারে। এরপরও সে সুস্থ বা ভালো না হলে চাকরিচ্যুত করা যেতে পারে। আমরা এই দাবি আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানাবো।’

বাহিনীর স্বার্থে সব পদের পুলিশ সদস্যের ডোপ টেস্টের দাবি

পুলিশ বাহিনীকে মাদকমুক্ত করতে সদ্য সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ডোপ টেস্টের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। মূলত ডোপ টেস্টের মাধ্যমে একটি বার্তা দিয়ে বাহিনীর সদস্যদের মাদক থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন তিনি। শুরুর দিকে বেনজীর আহমেদ বলেছিলেন, ‘আগাছা ঘর থেকে পরিষ্কার করতে চাই।’ এরপরই পুলিশ বাহিনীতে ডোপ টেস্ট শুরু হয়। তবে সব পদে এই কার্যক্রম বিস্তার লাভ না করায় এখন কার্যত বন্ধই হয়ে যাচ্ছে ডোপ টেস্ট।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা বলেন, ‘যেকোনও নিয়ম সবার জন্য সমান। পুলিশ একটি শৃঙ্খলাপূর্ণ বাহিনী। এখানে সবাই সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করবেন। সবর জন্য সমান বিধি। কেউ বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত না। ডোপ টেস্ট হলে সবারই হওয়া উচিত। তবে যেহেতু কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক পদের কর্মকর্তারা অপারেশনাল কাজটি করেন, সেজন্য তাদেরই আগে হওয়া উচিত। এএসপি থেকে ওপরের পদের কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল হিসেবে ধরা হয়। তাই তাদের হয়তো পরে করা হবে।’

বন্ধ না, সন্দেহজনক কাউকে পাচ্ছে না ডিএমপি

আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে ডোপ টেস্ট না হলেও ডিএমপি জানিয়েছে, সন্দেহজনক কাউকে গত দুই মাসে পাওয়া যায়নি, তাই টেস্ট করা হয়নি। এই প্রক্রিয়া চলমান।

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম ও অপারেশনস) একেএম হাফিজ আক্তার বলেন, ‘বর্তমান পুলিশ মহাপরিদর্শকও মাদকের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতিতে অটল। কেউ মাদক সেবন, বহন কিংবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হলে তাদের বাহিনীতে রাখা যাবে না। এ বিষয়ে আরও জোরালো কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। ডোপ টেস্ট কখনও বন্ধ হবে না। আরও জোরালো হবে।’

ক্যাডার কর্মকর্তাদের ডোপ টেস্টে বাধা কোথায়

ডিএমপির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের নিয়োগ, পদায়ন, বদলি সবকিছু আলাদা নিয়মে হয়। তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে সরকারের উচ্চ মহল থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পুলিশের কোনও ইউনিট বা বাহিনী এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তবে এর সঙ্গে একমত নন সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা। তিনি বলেন, ‘অন্য ক্যাডারদের সঙ্গে পুলিশ ক্যাডারকে মেলানো যাবে না। অন্য কোনও ক্যাডার তো আইনগতভাবে শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না, যা পুলিশ পারে। অতএব, এখানে মাদকের বিস্তার প্রতিরোধ করতে হবে। এটা পুলিশই সিদ্ধান্ত নিতে পারে তার সদস্যদের ডোপ টেস্ট করবে কিনা। এজন্য একটা পলিসি থাকা প্রয়োজন।’

কৌশল বদল, চাকরিতে প্রবেশের সময় ডোপ টেস্টে জোর

চাকরি পাওয়ার পরে না, আগেই ডোপ টেস্ট নিয়ে চাকরিতে প্রবেশের বিষয়ে পুলিশ, আনসার, ফায়ার সার্ভিস, কারা অধিদফতর, বিজিপি ও পুলিশে নিয়োগের বিষয়ে কড়াকড়ি করা হচ্ছে। ডোপ টেস্ট করেই তারপর নিয়োগ দেওয়া হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সম্প্রতি বলেছেন, মাদকাসক্তরা যেন পুলিশে ঢুকতে না পারে, সে জন্য নিয়োগের আগেই ডোপ টেস্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডোপ টেস্ট করে বেশ কিছু পুলিশ সদস্যকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। পুলিশে যারাই মাদক নেয় তাদের টেস্ট করে বরখাস্ত করা হবে।

 

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button