আলোচিতজাতীয়

শুরুই হয়নি ঢাকার চারপাশের নদ-নদী দূষণমুক্তের কাজ

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : দখল ও দূষণমুক্ত স্বাভাবিক প্রবহমান নদ-নদী নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েই গঠন করা হয়েছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। যদিও এ দায়িত্ব পালনে সংবিধিবদ্ধ সংস্থাটির সফলতা সামান্যই। চলতি বছরের জুনে ঢাকার আশপাশের চার নদীকে দূষণমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন কমিশনের চেয়ারম্যান। এজন্য এক বছরের আলটিমেটামও দেন তিনি। লক্ষ্য পূরণে ছয় মাস বাকি থাকলেও এখনো মাঠ পর্যায়ে এ-সংক্রান্ত কোনো কাজই শুরু হয়নি। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অসহযোগিতাকেই বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

নদী রক্ষা কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি বছরের জুনে নদীসংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন কমিশনের চেয়ারম্যান। বৈঠকে চেয়ারম্যান বলেন, ‘আগামী এক বছরের মধ্যে ঢাকার চারপাশের নদ-নদী দূষণমুক্ত করা হবে।’

ওই বৈঠকে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা বলেন, তীব্র দূষণে আক্রান্ত ঢাকার নদ-নদীগুলো এক বছরে দূষণমুক্ত করা সম্ভব নয় বলে কমিশনের চেয়ারম্যানকে জানানো হয়েছিল। তাছাড়া কীভাবে ও কোন পদ্ধতিতে নদ-নদী দূষণমুক্ত করা হবে, সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকলে এমন ঘোষণা ফাঁকা বুলিতে পরিণত হতে পারে এমন আশঙ্কাও বৈঠকে তুলে ধরা হয়।

নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী মার্চে রাজধানীকে ঘিরে বয়ে চলা চার নদ-নদী বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু দূষণমুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এখনো উল্লেখযোগ্য কাজই শুরু হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন নদী বিশেষজ্ঞরা। রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন বলেন, এক বছরের মধ্যে দূষণ রোধ করতে হলে প্রতিদিনই নদী রক্ষা কমিশনের তা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা। কিন্তু সে রকম কিছু দেখা যাচ্ছে না। মাসভিত্তিক কিংবা ছয় মাসেও নদ-নদীর কতটুকু দখলমুক্ত হয়েছে, সে-সংক্রান্ত কোনো প্রতিবেদন দিতে পারেনি নদী রক্ষা কমিশন।

নদ-নদী দূষণমুক্ত কার্যক্রমের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেয়ার পর চলতি বছরের জুনে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি সভা করি। সেখানে ঘোষণা করি, ২০২৩ সালে মার্চের মধ্যেই ঢাকার চার নদ-নদী আমরা দূষণমুক্ত করব। বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকীতে এটা হবে আমাদের বিশেষ অর্জন।’

নদী দূষণমুক্ত করার উদ্যোগটি মাঠ পর্যায়ে সেভাবে সফলতা পাচ্ছে না উল্লেখ করে চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা প্রতিটি নদী পরিদর্শন করেছি। সেখানে কোথায় কোথায় দূষণ আছে সেগুলো দেখেছি। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের জানিয়েছি। নদীর অন্য অভিভাবকদেরও বলেছি। সিটি করপোরেশন, বিআইডব্লিউটিএ, পরিবেশ অধিদপ্তরের সহযোগিতা চেয়েছি। বলার মতো শুধু সাভার পৌরসভা থেকে কিছু সহযোগিতা পেয়েছি। আর কেউ তেমন একটা সাড়া দেয়নি।’

নদী দূষণ রোধে এক বছরের ঘোষণাকে আবেগী উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরিফ জামিল। তিনি বলেন, নদী দূষণমুক্ত করার আগে নদীর অস্তিত্ব রক্ষা করতে হবে। এখনো ঢাকার চারপাশের নদ-নদীতে দখল রয়েছে। নদীগুলো এখন খালে পরিণত হয়েছে। দখল উচ্ছেদ না করে দূষণমুক্ত করা তাও আবার এক বছরের মধ্যে, এটি আসলে রাজনৈতিক বক্তব্য ছাড়া কিছু নয়।

তিনি বলেন, সত্যিকার অর্থেই যদি নদী রক্ষা কমিশন নদী দূষণমুক্ত করতে চায়, তাহলে তাদের আইনটি সংস্কার করতে হবে। নদী রক্ষা কমিশনকে শক্তিশালী করতে হবে। এগুলো না করে ঘোষণা দেয়া, বৈঠক করা এগুলো আসলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়।

অ্যাকশন প্ল্যান ছাড়াই এক বছরে নদী দূষণমুক্ত করার ঘোষণা বাস্তবসম্মত নয় উল্লেখ করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনকে সামনে রেখে মূলত নদী রক্ষা কমিশন থেকে এমন ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। অপরিকল্পিত ঘোষণা বাস্তবায়ন হবে না এটাই তো স্বাভাবিক।’

তিনি বলেন, ‘নদী দূষণমুক্ত করার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সহযোগিতা না পাওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। নদী রক্ষা কমিশনকে উচ্চ আদালত নির্দেশ দিয়েছেন নদী দূষণমুক্ত করতে মাস্টার প্ল্যান করে জমা দেয়ার জন্য। কমিশন তো নিজের কাজটিই করছে না, অন্যকে দোষ দিচ্ছে কীভাবে।’

নদী দূষণ রোধে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) যথার্থ সহযোগিতা করছে না বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান। এ অভিযোগের সত্যতা নেই উল্লেখ করে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক বলেন, ‘আমরা নদীর প্রবাহ ও নৌপথ নিয়ে কাজ করলেও দূষণমুক্ত করতে ভূমিকা রাখি। কিছুদিন পরই তুরাগ দূষণমুক্ত করব। নদী রক্ষা কমিশনকে সহযোগিতা করার জন্যই আমরা সবসময়ই প্রস্তুত। তবে আমাদের আওতাবহির্ভূত কোনো কাজের ক্ষেত্রে এটি সম্ভব হবে না।’

নদী ও প্রাণ-প্রকৃতি নিরাপত্তার সামাজিক প্রতিষ্ঠান নোঙর। প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি সুমন শামস বলেন, সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল খননের উদ্যোগ নিয়েছে। অনেকবার বলার পরও নদী রক্ষা কমিশনের কর্মকর্তাদের এখানে পরিদর্শনে আনতে পারেনি। ঢাকার নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দূষণের শিকার বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ। এ নদীগুলো নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন নদী রক্ষা কমিশনের নেই। শিল্পপ্রতিষ্ঠান কর্তৃক দূষণের বিরুদ্ধেও কোনো উদ্যোগ তাদের নেই। অথচ সদিচ্ছা থাকলে ঢাকার চারপাশের নদ-নদীগুলো দূষণমুক্ত রাখা সম্ভব।

 

সূত্র: বণিক বার্তা

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button