আলোচিতগাজীপুর

বিআরটি স্টেশনের নকশাগত দুর্বলতা: স্থায়ী রূপ নিতে পারে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানজট

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : বিদ্যমান সড়কের মাঝের সাত মিটার অংশে তৈরি করা হচ্ছে বিমানবন্দর-গাজীপুর বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি)। বিশেষায়িত এ লেনে শুধু বিআরটি কোম্পানির বাস চলবে। সাধারণ যানবাহন চলবে দুই পাশের ‘মিক্সড ট্রাফিক লেনে’। নকশা অনুযায়ী, প্রতিটি মিক্সড ট্রাফিক লেনের গড় প্রশস্ততা সাত মিটার। বিআরটি স্টেশন এলাকাগুলোয় এ প্রশস্ততা কমে দাঁড়াবে ছয় মিটারে।

অর্থাৎ বিআরটি রুট-সংলগ্ন সড়কে সাধারণ যানবাহন চলার জন্য সাত মিটার জায়গা থাকলেও স্টেশন এলাকায় তা কমে দাঁড়াবে ছয় মিটারে। নির্মাণাধীন বিআরটি করিডোরের ১৬ কিলোমিটার মাটির সমান্তরাল (অ্যাটগ্রেড) অংশে স্টেশন রয়েছে ১৯টি। চলতে গিয়ে এর প্রায় প্রত্যেকটিতেই বাধাপ্রাপ্ত হবে সাধারণ যানবাহন। এরই মধ্যে বিআরটির স্টেশনগুলো দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। স্টেশন এলাকায় সাধারণ যানবাহন চলার পথ সরু হয়ে যাওয়ায় দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে যানজটও। নকশাগত এ দুর্বলতার কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ জাতীয় মহাসড়কে (এন-৩) যানজট স্থায়ী রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের হিসাবে ঢাকা-মনমনসিংহ মহাসড়কে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার যানবাহন চলাচল করে। গাজীপুর দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এখানে চলাচলকারী যানবাহনের একটি বড় অংশ হলো পণ্যবাহী ভারী যান। আবার ময়মনসিংহ, সিলেট, রংপুর ও রাজশাহী অঞ্চলের মানুষ ঢাকায় আসার ক্ষেত্রেও মহাসড়কটি ব্যবহার করে। ফলে পণ্যবাহী ভারী যানের পাশাপাশি মহাসড়কটিতে যাত্রীবাহী বড় বাসের আধিক্য সবসময় দেখা যায়। অতিরিক্ত গাড়ির চাপে এমনিতেই দিন-রাতের একটা বড় সময় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিমানবন্দর-গাজীপুর অংশে যানজট লেগে থাকে। বিআরটির নির্মাণকাজ এ যানজটকে আরো প্রকট করে তুলেছে। স্টেশনের নকশাগত দুর্বলতার কারণে বিআরটির কাজ শেষ হওয়ার পরেও এ যানজট থেকে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

স্টেশন এলাকায় সাধারণ যানবাহন চলাচলের পথ সরু হয়ে যাওয়ায় তা মহাসড়কটিতে স্থায়ীভাবে যানজট তৈরি করবে বলে মন্তব্য করেছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, বিআরটি স্টেশনে সড়ক সরু হয়ে যাওয়ায় দুই ধরনের সমস্যায় পড়বে সাধারণ যানবাহন। প্রথমত, সাত মিটার প্রশস্ত সড়ক থেকে যখন যানবাহনগুলো স্টেশন এলাকায় ছয় মিটার প্রশস্ত সড়কে আসবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেগুলো একটি বাধার মুখে পড়বে। গতি ধীর হয়ে যাবে। গাড়ির চাপ বেশি হলে এ ধীরগতি একসময় যানজটে পরিণত হবে। দ্বিতীয়ত, সড়কটি সরু করা হয়েছে খুব অল্প জায়গা নিয়ে। নিয়ম হলো সড়ক কোথাও সরু করতে হলে তা একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হয়, যেন যানবাহনগুলো ধীরে ধীরে সরু অংশে প্রবেশ করতে পারে। প্রকৌশলীদের ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘মার্জিং লেন’। এ মার্জিং লেন অপর্যাপ্ত হওয়ার কারণেও দেখা দেবে যানজট।

তিনি বলেন, বিআরটির স্টেশন এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কটি এখন যে অবস্থায় আছে, স্টেশনের পাশে মিক্সড ট্রাফিক লেনের জন্য যতটা জায়গা রাখা দরকার, ততটা রাখা হয়নি। এ মহাসড়কে দূরপাল্লার বাস চলে, পণ্যবাহী ভারী গাড়ি চলে। যদি ভবিষ্যতে স্টেশন এলাকাগুলো এভাবেই সরু রাখা হয়, তাহলে বিআরটি করিডোর এলাকায় যানজট স্থায়ী রূপ নেবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। যানজটের পাশাপাশি করিডোরটি পথচারীদের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি করবে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিমানবন্দর-গাজীপুর অংশে যানজট স্থায়ী রূপ নিলে তা ছড়িয়ে পড়বে আরো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে। বিআরটি করিডোরের আব্দুল্লাহপুরে এসে মিলেছে ঢাকা-আশুলিয়া মহাসড়ক। ভোগড়া মোড়ে এক দিকে মিলেছে ঢাকা-টঙ্গাইল জাতীয় মহাসড়ক। আরেক দিক থেকে এসে মিলেছে ঢাকা সিটি বাইপাস। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ তিন মহাসড়কের সক্ষমতাও কমিয়ে দেবে বিমানবন্দর-গাজীপুর বিআরটি করিডোরের যানজট।

বিআরটি প্রকল্পের একাধিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, স্টেশন এলাকাগুলো সরু হবে, এটা জেনেই করিডোরটির নকশা করা হয়েছে। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেছেন, এটি করা হয়েছে মূলত প্রকল্পটি অনুমোদনের স্বার্থে। অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না, খরচ কম হবে তাই এমন নকশা করার কথা জানিয়েছেন তারা। যদিও এখন স্টেশন এলাকাগুলোয় ‘মিক্সড ট্রাফিক লেন’-এর প্রশ্বস্ততা বাড়ানোর জন্য নতুন করে জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

বাস্তবায়নাধীন বিআরটি প্রকল্পটিকে সরকারের সবচেয়ে ‘খারাপ’ প্রকল্প হিসেবে অভিহিত করেছেন আরেক পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক। প্রকল্পটি সম্পর্কে তিনি বলেন, বিআরটি করার জন্য যে পরিমাণ ‘রাইট অফ ওয়ে’ প্রয়োজন, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে তা নেই। যদি প্রয়োজনীয় রাইট অফ না থাকে, তাহলে জমি অধিগ্রহণ করে এটা পর্যাপ্ত করতে হয়। সেটাও করা হয়নি। এ করিডোরের ওপরে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নির্ভর করে। এ রাস্তা থাকার কারণেই কিন্তু গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। বিআরটি করিডোর তৈরির পরে পাশে যে সড়কটি রাখা হচ্ছে, সেটাতে সবসময় ভারী গাড়ি চলাচল করবে। এ রাস্তার সক্ষমতা বাড়ানোর বদলে স্টেশন এলাকাগুলোয় আরো সংকীর্ণ করে ফেলা হয়েছে। ফুটপাতও সরু করা হয়েছে। বিআরটি প্রকল্পটি ভৌগোলিকভাবে অবিবেচনাপ্রসূত হয়েছে। এটি অপারেশনালি সফল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ যেখানে বিআরটি হওয়ার কথা সেখানে হয়নি।

গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট (বিআরটি বিমানবন্দর-গাজীপুর) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সরকারের তিনটি সংস্থা। ছয়টি ফ্লাইওভার দিয়ে সাড়ে চার কিলোমিটার উড়াল অংশ বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। এ অংশে স্টেশনের সংখ্যা ছয়টি। মাটির সমান্তরালে ১৬ কিলোমিটার অংশ বাস্তবায়ন করছে সওজ অধিদপ্তর, যেখানে ১৯টি স্টেশন রয়েছে। আর বাস ডিপোসহ আনুষঙ্গিক বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরি করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। তিন সংস্থার কাজ সমন্বয় করে ঢাকায় বিআরটি নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ঢাকা বিআরটি কোম্পানি লিমিটেড।

মাটির সমান্তরালের স্টেশন এলাকাগুলোয় সাধারণ যানবাহন চলাচলের পথ সরু হয়ে যাওয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সফিকুল ইসলাম বলেন, স্টেশন এলাকায় মিক্সড ট্রাফিক লেন প্রশ্বস্ত করার পরিকল্পনা শুরু থেকেই আমাদের রয়েছে। কিছু স্থানে এরই মধ্যে জায়গা বাড়িয়ে নেয়া হয়েছে। আবার কিছু জায়গায় মিক্সড ট্রাফিক লেনটি কিছুটা ফুটপাতের দিকে বাড়িয়ে নেয়া হয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় নতুন করে ভূমি অধিগ্রহণ করতে হয়েছে। আবার কোথাও এখনো ভূমি অধিগ্রহণের কাজ চলমান। প্রয়োজনীয় প্রাক্কলনগুলো আমরা করে ফেলেছি। এখন শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে জমি অধিগ্রহণের কাজ বাকি।

তবে স্টেশন এলাকায় সাধারণ যানবাহন চলার পথ সরু হয়ে যাওয়ায় তা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে স্থায়ী যানজটের কারণ হয়ে উঠতে পারে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

 

সূত্র: বণিক বার্তা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button