অন্যান্য

পারস্য উপসাগরে ব্রিটিশদের এজেন্সি ব্যবস্থা ও বাণিজ্য

আলী আমজাদ : পারস্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রেসিডেন্সি শুরু করে উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে। কিন্তু এর আগে অন্তত দুশো বছর ধরে এ অঞ্চলে তারা বাণিজ্য করত। ১৬১৬ সালে তারা সর্বপ্রথম পারস্যের মাকরান উপকূলে এজেন্সি শুরু করে। এর তিন বছর আগে সুরাটে তারা এজেন্সি স্থাপন করেছিল। পরের বছর সিরাজ ও ইসফাহানে সাব-অর্ডিনেট ফ্যাক্টরি স্থাপন করা হয়। কয়েক বছর পর কোম্পানির পক্ষ থেকে শাহ আব্বাসকে পর্তুগিজ নৌবহরের সঙ্গে যুদ্ধে সাহায্য করে কোম্পানি। সে সাহায্যে খুশি হয়ে শাহ আব্বাস পারস্য উপকূলে ব্যবসার জন্য বন্দর স্থাপনের অনুমতি দেয়। কোম্পানিও শাহকে সম্মান দিয়ে এ বন্দরের নাম রাখে বন্দর আব্বাস।

পরের বছর পারস্যের ব্রিটিশ এজেন্ট তার কার্যালয় বন্দর আব্বাসে সরিয়ে নেন। পরবর্তী ১৪০ বছর এ বন্দর কোম্পানির সব ধরনের কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। ১৬৩৫ সালে এজেন্টের পক্ষ থেকে বসরায় একটি সাব-অর্ডিনেট ফ্যাক্টরি স্থাপন করা হয়। ১৬৪৩ সাল পর্যন্ত ফ্যাক্টরিটি কেবল ব্যবসার মৌসুমেই কাজ করত। এ সময় এটিকে স্থায়ীকরণ করা হয়। ১৬৫৭ সালে বসরার শাসক এ ফ্যাক্টরিকে অধিগ্রহণ করার আগ অবধি এটি ব্রিটিশদের দ্বারা পরিচালিত হতো। ৬৬ বছর পর ১৭২৩ সালে একজন রেসিডেন্টের তত্ত্বাবধানে পুনরায় এ ফ্যাক্টরি কাজ করা শুরু করে। ১৭৫৫ সালে পারস্যের এজেন্ট দক্ষিণ-পশ্চিম পারস্যের রিগ বন্দরে আরেকটি কারখানা স্থাপন করেন। কিন্তু পরের বছরই কারখানাটি ব্যর্থ প্রমাণিত হয়।

এছাড়া এখানে বেশকিছু বন্ধকি ও অন্যান্য কারবার চালু রেখেছিল কোম্পানি। ১৭৫৯ সালে ফরাসিদের সঙ্গে যুদ্ধের সময় ফরাসি বাহিনী উপসাগরীয় অঞ্চল দখল করে ব্রিটিশ রেসিডেন্সি বা এজেন্সির মূল কার্যালয় ধ্বংস করে দেয়। কোম্পানি পুনরায় তা স্থাপন করে কিন্তু ততদিনে বন্দরের অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে। ১৯৬৩ সালে কোম্পানি তাই পারস্যের এজেন্সি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু একই বছর একজন রেসিডেন্টের তত্ত্বাবধানে বুশেরে একটি ফ্যাক্টরি খোলা হয়। ১৭৭৮ সালে কোম্পানি বসরার এজেন্সির কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এরপর পারস্য ও উপসাগরীয় অঞ্চল একমাত্র বুশেরের রেসিডেন্টের অধীনে আসে। তিনি কেবল বোম্বের কর্তাদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য ছিলেন। উনিশ শতকে কোম্পানির নীতি পরিবর্তন করে এজেন্টকে রেসিডেন্টের অধীন করা হয়।

ভারতের হিসাব অনুসারে উপসাগরীয় অঞ্চলে কোম্পানির সব কাজই ছিল অর্থনৈতিক। কোম্পানি যেহেতু ধীরে ধীরে রাজনৈতিক নানা বিষয়ে যুক্ত হতে শুরু করে, রেসিডেন্ট ও এজেন্টরাও এ কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হয়। ১৭৭৩ সালে গৃহীত নীতি অনুসারে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক বিষয়ে যুক্ত ব্যক্তিদের কোনো ব্যক্তিগত ব্যবসা করার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আনা হয়। যদিও বুশায়ারের রেসিডেন্ট উপসাগরীয় অঞ্চলে কোম্পানির ব্যবসা পরিচালনা করতেন, রাজনৈতিক নানা উত্থান-পতন ও পট পরিবর্তনের কারণে ১৮২২ সালে কোম্পানি উপসাগরীয় অঞ্চলকেও রেগুলেটরি অ্যাক্টের অধীনে আনে।

আঠার শতকের শেষ ও উনিশ শতকের শুরুর দিকে শারজার কাসিমী পরিবার হরমুজের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত। উপসাগরীয় অঞ্চলের জাহাজ থেকে পাওয়া করই ছিল এদের আয়ের অন্যতম মূল উৎস। ভুল বোঝাবুঝি ও কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমতা প্রদর্শনের উদ্দেশ্য থেকে ব্রিটিশরা কর দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ১৮১৯-২০ সালের শীতকাল থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্রিটিশ আধিপত্য তৈরি হয়। তারা কাওয়াসিম বা কাসিমী পরিবারের বিরুদ্ধে নৌ-সেনা প্রেরণ করে। এ অভিযানগুলোর পরে ব্রিটিশরা একটি চুক্তি সম্পাদন করে। ১৮২০ সালের এ চুক্তি জেনারেল ট্রিটি অব ১৮২০ নামে পরিচিত। এ চুক্তির নানা বিষয় নিয়ন্ত্রণ, দেখভাল ইত্যাদির ক্ষেত্রে ব্রিটিশদের নিজস্ব প্রতিনিধির প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তারা উপসাগরীয় নিম্নাঞ্চলে এজেন্টের একটি পদ সৃষ্টি করে। দুই বছর পরে পোস্টটি বুশেরে সরিয়ে নেয়া হয়। ১৮৫০ সালের পর থেকে পলিটিক্যাল রেসিডেন্ট ইন দ্য পারসিয়ান গাল্ফ (পিআরপিজি) উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্কের সূত্র ছিলেন।

এ সময় থেকে রেসিডেন্টের দায়িত্ব ও অন্যান্য বিষয় পুরোপুরি রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। রেসিডেন্টের কাজের সহযোগিতার জন্য ব্রিটিশদের পক্ষ থেকে একটি নৌ-বাহিনী তৈরি করা হয়। এদের কাজ ছিল জলপথের নানা বিষয় তদারক করা। উপসাগরীয় বাহিনী বা গালফ স্কোয়াড্রনে পাঁচ থেকে সাতটি যুদ্ধজাহাজ ও দুই থেকে চারটি গানবোট থাকত। স্কোয়াড্রনটি পারস্য উপসাগরের একজন সিনিয়র নেভাল অফিসারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতো। এই নেভাল অফিসার গাল্ফ-রেসিডেন্ট ও বোম্বের ইস্ট ইন্ডিজ স্টেশনের কমান্ডান ইন চিফের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য ছিলেন। ১৮২৩ সাল পর্যন্ত স্ট্রেইট অব হরমুজে এ স্কোয়াড্রনের একাধিক অস্থায়ী হেডকোয়ার্টার ছিল। ওই বছর কিশম দ্বীপের বাসিদুতে একটি স্থায়ী হেডকোয়ার্টার করা হয়। ১৯১১ সালে তা নেয়া হয় হেনজানে।

প্রাথমিকভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের রেসিডেন্ট বোম্বের পলিটিক্যাল ডিপার্টমেন্ট থেকে সরাসরি নির্দেশ নিয়ে কাজ করতেন। ১৮৭৩ সাল পর্যন্ত এভাবেই কাজ করেছে তারা। এখানে কাজ করার জন্য রেসিডেন্টকে মাস্কাট, শারজা, বাহরাইন, কুয়েত এবং পরবর্তী সময়ে দোহা ও দুবাইয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে হয়েছে। এ বিস্তৃত অঞ্চলে এজেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে কাজ হতো। ১৮২০ সালের সাধারণ চুক্তি করার পর ১৫০ বছর ধরে নতুন নতুন চুক্তির অধীনে এ অঞ্চলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তার কর্মপরিচালনা করেছে। এর মধ্যে নৌপথের চুক্তির বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রথম মেরিটাইম চুক্তিটি ১৮৩৫ সালে আবুধাবি, দুবাই, আজমান ও আল কাসিমী সাম্রাজ্যের মধ্যে করা হয়।

এ চুক্তিগুলোর মধ্য দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে এক ধরনের সহযোগিতামূলক বাণিজ্যের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। ১৮২০ সালে ইংরেজদের অভিযানগুলোর পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চলে জবরদস্তির বাইরে গিয়ে এক ধরনের চুক্তির মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ কোম্পানি ও স্থানীয় ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে কাজ হতে থাকে। স্থানীয় নিয়ম ও প্রথাগত বাণিজ্যের মধ্যে প্রবেশ করার কারণে কোম্পানি ও স্থানীয় ব্যবসায়ী উভয়ের স্বার্থরক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল। এ কারণে বলা হয় প্যাক্স ব্রিটানিকা এমন একটি ‘সিস্টেমে’ পরিণত হয়, যার কৃতিত্ব পুরোপুরিই ব্রিটিশ কোম্পানির। অবশ্য এর পেছনে ব্রিটিশ লেখকদেরও এক রকম অবদান রয়েছে। পারস্য উপসাগরে ব্যবসা ও নিজেদের বাণিজ্য বিস্তারের বর্ণনা তারাই করেছেন। কোম্পানির লেখদের পরে যারাও এ নিয়ে লিখেছেন তারাও কোম্পানির লেখার ওপর নির্ভর করেছেন।

ব্যবসার ক্ষেত্রে এজেন্ট ও রেসিডেন্ট ব্যবস্থাটির শুরুও ব্রিটিশদের মাধ্যমে হয়। মজার ব্যাপার উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্রিটিশ এজেন্টদের বড় অংশই ছিল ভারতীয়, পারসিক কিংবা আরব। বুশের, সিরাজ ও অন্যান্য অঞ্চলে বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র বা কর্মপরিচালনা করা হতো। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বাহরাইন ও মাস্কাট। ১৬১৩ সালে বাহরাইনের গুরুত্ব অনুভব করে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। মূলত সুরাটের এজেন্ট লন্ডনে লিখে জানিয়েছিলেন যে বাহরাইনের সঙ্গে বাণিজ্যের মাধ্যমে লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু যেমনটা আগেই বলা হয়েছে, আঠার শতকের আগে সক্রিয়ভাবে এখানে বাণিজ্য শুরু করা হয়নি। এরপর বন্দর আব্বাসে বাণিজ্যের কেন্দ্র করা হয়। কিন্তু আঠার শতকের মধ্যবর্তী সময়ের অস্থরিতার মধ্যে বন্দর সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সে সময় বাণিজ্যের কেন্দ্র হয় বাহরাইন।

বাহরাইনে প্রথম পর্যায়ে ভারতীয় এজেন্টদের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করানোর চেষ্টা করে কোম্পানি। ভারতে সে সময়ে ব্যবসায়ীদের একটা বড় অংশ ছিল হিন্দু। প্রথম পর্যায়ে তাদেরই এজেন্ট করা হয়। রেসিডেন্টের অধীনে তারা কাজ করতেন কিন্তু ব্যবসা ও মুনাফার সঙ্গে ক্ষমতা যেহেতু জড়িত, বাহরাইন ও উপসাগরীয় অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা সেখানে শেয়ার চাইতে শুরু করে। উপসাগরীয় অঞ্চলের শেখরা উনিশ শতকের ত্রিশের দশক থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্য হুমকি হয়ে উঠতে থাকলে বোম্বে থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বাহরাইন ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এরপর থেকে মুসলিম ব্যবসায়ীদের কোম্পানির এজেন্ট করা হবে।

উনিশ শতকের শেষ দশক থেকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পারস্যে তাদের ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে বেশকিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বিশেষত প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইউরোপের নিজস্ব বিরোধ। তারা এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারস্যে পলিটিক্যাল এজেন্ট নিয়োগ দেয়। বাহরাইন থেকেই এ বদলের সূচনা হয়। ধীরে ধীরে বাহরাইন ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নেটিভ এজেন্সি ব্যবস্থা সমাপ্ত হয়।

আলী আমজাদ: লেখক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button