আলোচিতশিক্ষা

পূর্বাচলে ঢাবির ৫২ একর জমির ওপর নজর প্রভাবশালী মহলের

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ক্যাম্পাস গড়ে তোলার লক্ষ্যে পূর্বাচলে ৫২ একর জমি বরাদ্দ পেয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) কর্তৃপক্ষ। এ জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল ২০১৮ সালের জুনে। এরপর সময় পেরিয়েছে চার বছরের বেশি। এখনো বরাদ্দকৃত ওই জমি বুঝে পায়নি ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠটি। জমি বরাদ্দ বাবদ অর্থ পরিশোধ নিয়ে জটিলতার কারণে এখনো এ জমি বুঝিয়ে দেয়া হয়নি বলে জানিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী একটি মহল এখন প্রক্রিয়াগত এ বিলম্বের সুযোগ নিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ঢাবিকে দেয়া জমির বরাদ্দ বাতিল করতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে নানা তত্পরতাও চালাচ্ছে তারা।

শর্ত অনুযায়ী জমি বরাদ্দ বাবদ প্রাপ্য অর্থ এখনো ঢাবি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বুঝে পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে রাজউক। এ অর্থ হাতে পাওয়ার আগে জমি বুঝিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। এর বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, এজন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পরিশোধের সামর্থ্য নেই বিশ্ববিদ্যালয়ের। তাই সরকারের কাছে সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে।

এদিকে ২০১৭ সালের নভেম্বরে পূর্বাচলে একটি ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার জন্য ১০০ একর জমি বরাদ্দের অনুরোধ জানিয়ে রাজউককে একটি চিঠি দিয়েছিল ঢাবি কর্তৃপক্ষ। এর ভিত্তিতে রাজউকের ২০১৮ সালের অষ্টম বোর্ড সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ৫১ দশমিক ৯৯ একর জমি দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওই বছরের ২১ জুন ঢাবিকে সাময়িক নির্বাচনপত্র দেয়া হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, ঢাবিকে প্রতি কাঠা জমির জন্য ১৫ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হবে। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত জমি বরাদ্দ প্রক্রিয়ার অগ্রগতি ওই নির্বাচনপত্রেই আটকে রয়েছে। গত চার বছরে প্রক্রিয়াটি সামনে এগিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো।

পূর্বাচলে জমি বরাদ্দের বিষয়টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ঢাবি শিক্ষক সমিতির তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জমি বরাদ্দ প্রক্রিয়ার ধীরগতি ও অনিশ্চয়তা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো দেশের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তথা তাদের উদ্ভাবন ও গবেষণা সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে। ঢাবির ক্যাম্পাসটি ব্যস্ততম ও জনবহুল এলাকায় হওয়ায় এখানে অনেক ধরনের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব নয়। এজন্য কোলাহলমুক্ত পরিবেশে একটি উদ্ভাবন ও গবেষণাভিত্তিক ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে সরকারের কাছে পূর্বাচলে জমি বরাদ্দ চাওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মহতী এ উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে ২০১৮ সালে ৫২ একর জমি বরাদ্দ দেয় রাজউক। যদিও পরবর্তী সময়ে এ উদ্যোগকে নানা কারণে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি। উল্টো একটি মহল নিজেরা লাভবান হতে পূর্বাচলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জমির বরাদ্দ বাতিলের চেষ্টা করছে বলে জানতে পেরেছি, যা খুবই দুঃখজনক।

রাজউক ও ঢাবির আরো কিছু সূত্রও জমির বরাদ্দ বাতিল করানোর তত্পরতা চলছে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে। তারা জানান, একটি ব্যবসায়ী মহল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত জায়গাটিকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের অনুমোদনের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে। এজন্য তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দেয়া বরাদ্দ বাতিল করতে সরকারের উচ্চমহলে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারের উচ্চমহলকে বলা হচ্ছে, পূর্বাচলে গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাবে। এভাবে ভুল বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছে। আমরা আশা করি, সরকার তাদের ফাঁদে পা না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দ্রুত জমি বুঝে পেতে সহায়তা করবে।

পূর্বাচলে বরাদ্দ পাওয়া জমিকে ঘিরে এরই মধ্যে বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা করছে ঢাবি। পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ১২ নম্বর সেক্টরে বরাদ্দ পাওয়া ৫১ দশমিক ৯৯ একর জমিতে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল ফ্যাকাল্টিসহ অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিসম্পন্ন বেশ কয়েকটি বিজ্ঞান গবেষণাগার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। সেখানে উদ্ভাবন ও গবেষণাভিত্তিক ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে একটি উন্নয়ন প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পথেও হাঁটছে ঢাবি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, এর জন্য আগে জমি বুঝে পাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, আমাদের এখনকার যে ক্যাম্পাস, তা মূলত গড়ে উঠেছিল পঠন-পাঠনকে কেন্দ্র করে। এখন আমরা গবেষণায় জোর দিতে চাই। তার অংশ হিসেবেই নিবিড় গবেষণাকে কেন্দ্র করে পূর্বাচলে একটি ইনোভেশন অ্যান্ড রিসার্চ ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে চাই। বেশকিছু প্রকল্প পরিকল্পনা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এজন্য জমি বুঝে পাওয়াটা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জমি বুঝিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে রাউজক যে পরিমাণ অর্থের শর্ত দিয়েছে, তা পরিশোধ করা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে সম্ভব নয়। বিষয়টি আমরা আরো আগেই প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছি। এছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দেয়া হয়েছে। সেখানে আমরা বলেছি, আর্থিক বিষয়াদির সমাধান করে যেন দ্রুত জমি বুঝিয়ে দেয়া হয়।

ঢাবি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত নাথান কমিশনের প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়কে ৫৮০ একর জমি দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। ১৯২১ সালে প্রায় ৬০০ একর এলাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঢাবি। কিন্তু ওই সময় সব জমি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে রেজিস্ট্রেশন করে দেয়া হয়নি। পরে ১৯২৭ সালে একটি সরকারি কমিশন ২৫৭ একর অনুমোদনের প্রস্তাব করলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে শেষ পর্যন্ত ২৫২ একর জমি বুঝিয়ে দেয়া হয়। সরকারি কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ১৯৩৬ সালে ঢাবির তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক এএফ রহমান ও সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়া ইন কাউন্সিল এমএম স্টুয়ার্টের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়। চুক্তি অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়কে ২৫২ একর ৭০ শতাংশ জমি দেয়া হয়।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা বাড়ে। ১৯৪৭-পরবর্তী প্রতিটি কনভোকেশনে বিশ্ববিদ্যালয়কে আরো জমি দেয়ার দাবি জানানো হয়। ক্রমাগত দাবির মুখে ১৯৫০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে গঠন করা হয় বিচারপতি ফজলে আকবর কমিশন। কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়, ২৫৭ একর জমি ঢাবির জন্য অপ্রতুল। এতে বিশ্ববিদ্যালয়কে আরো ৬৩ একর জমি দেয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়। যদিও স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত ঢাবিকে আর কোনো জমিই বরাদ্দ দেয়া হয়নি। উল্টো জমির পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ২৫৪ একর।

 

সূত্র: বণিক বার্তা

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button