অন্যান্য

সাম্রাজ্যের যুগে কাশ্মীরি শালের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

গ্লোবাল হিস্টরিজ : কাশ্মীরে তৈরি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি পরিধেয়—কাশ্মীরের পশমিনা শাল। দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত বস্ত্রটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিককালে ইউরোপীয় নারীদের জীবনেও যুক্ত হয়েছে নানা অনুষঙ্গে, আদৃত হয়েছে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে। পশমিনা শাল কাশ্মীরে তৈরি হওয়া একটি ফ্যাশনদুরস্ত পোশাক, ব্রিটিশ নারীত্বের পরিবর্তনশীল চরিত্রকে মূর্ত করতে হাজির হয়েছিল অনেক দিন আগে। প্রক্রিয়াটি শুধু ব্রিটেনের ঔপনিবেশিকতার ফলে ঘটেনি, বরং ব্রিটেন, ভারত ও ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের একটি ভিন্ন ফলাফল চিত্র হচ্ছে ব্রিটেনে কাশ্মীরি শালের বিপুল জনপ্রিয়তা।

পোশাক হিসেবে শালের নির্মাণ বহুমুখিতা এবং মানব দেহের সঙ্গে এর নৈকট্যপূর্ণ উপস্থিতির কথা বিবেচনা করে বলা যায় এটি একটি অত্যন্ত ব্যক্তিগত পছন্দের পরিচ্ছদ। ব্রিটিশ নারী ও অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান নারীদের কিছু চিঠিপত্র পরীক্ষা করে, কিছু ভ্রমণ জার্নাল পর্যালোচনা করে এবং সেই সঙ্গে ঊনবিংশ শতাব্দীর শিল্পকর্ম, সাহিত্যকর্ম ও মুদ্রণ সংস্কৃতি—এসব কিছু বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে প্রাচ্য এবং ব্রিটিশ নারীদের সঙ্গে এর সম্পৃক্ততার কারণে পশমিনা শাল মূলত একটি প্রতীকী পরিধেয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আরো লক্ষণীয়, কাশ্মীরি পশমিনা শালের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা একভাবে ঊনবিংশ শতাব্দীতে নারীর যৌনতা নিয়ে উদ্বেগ এবং সম্প্রসারিত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে শ্বেতাঙ্গদের আইডেন্টিটি অস্থিরতার ইতিহাসকে নির্দেশ করে।

‘ক্যাসমিরি’ শব্দটি এসেছে ‘কাশ্মীর’-এর নাম থেকে, যেখানে এ বহুল আকাঙ্ক্ষিত পণ্যটি তৈরি হয়। বর্তমানে ‘ক্যাসমিরি’ বলতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মনে করা হয় একটি ভীষণ নরম ও ব্যয়বহুল উলকে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে যখন ‘ক্যাসমিরি’ শব্দটি অত্যন্ত নরম কোমল বুননের কাপড় হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছিল, তখন থেকেই নামটি জনপ্রিয়। এ নামের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সুরুচিসম্পন্ন আবরণটির আবেদন ও গ্রহণযোগ্যতারও বিবর্তন ঘটেছে সেই শুরু থেকে। পশ্চিমা দৃষ্টিকোণ থেকে, ‘শাল’ বলতে বোঝায় একটা পরিধেয়, সাধারণত নারীদের একখণ্ড আচ্ছাদন বা একপ্রস্থ বস্ত্র এবং ‘ক্যাসমিরি’ পরিণত হয়েছে একটি অত্যন্ত মোলায়েম বুননের মিহি মসৃণ কাপড়ে, যা কাঁধ থেকে ঝুলে থাকে, বর্তমানে যা একটি বিলাসবহুল ফ্যাশন।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে কাশ্মীরি শালের জন্য নির্দিষ্ট কোনো নাম ছিল না। কাপড়টি প্রধানত পরিচিত ছিল ‘ক্যাসমিরি শাল’, ‘তিব্বতি শাল’ ও ‘ইন্ডিয়ান শাল’ হিসেবে। তবে কাশ্মীরে উৎপাদিত এবং কাশ্মীর থেকে রফতানীকৃত এ অত্যন্ত উন্নতমানের শালকে সবাই একনামে ‘কাশ্মীরি শাল’ বলেই চেনেন। একাধিক নামের ব্যবহার এ সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে, ব্রিটিশ উপনিবেশকাল থেকেই কাশ্মীর বিভিন্ন ধরনের উন্নত মানের শাল উৎপন্ন ও রফতানি করত বিশ্বের নানা স্থানে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে, শাল ছিল ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে সাম্রাজ্যের প্রতিযোগিতার প্রতীক। যদিও কাশ্মীরি শাল পশ্চিম ইউরোপে পৌঁছে ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীতে, কিন্তু এ শাল সেখানে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে নেপোলিয়নের ফার্স্ট ফ্রেঞ্চ এম্পায়ারের কালে। প্রাথমিকভাবে শাল ছিল দক্ষিণ এশীয় পুরুষদের পরিধানের জন্য একটি সম্মানজনক পোশাক। ইউরোপে কাশ্মীরি শাল ফ্যাশনেবল পোশাক হিসেবে পরিচিতি লাভ করে, যখন নেপোলিয়ন ও তার সেনাবাহিনী মিসর থেকে অনেক কাশ্মীরি শাল নিয়ে আসে যুদ্ধের লুণ্ঠিত মালপত্র হিসেবে। ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে, ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে ফিরে যাওয়া অনেক ব্রিটিশ সেনা তাদের স্ত্রী, আত্মীয়দের জন্য কাশ্মীরি শাল নিয়ে যান উপহার হিসেবে। সেই থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের কাশ্মীরি শাল এবং শ্বেতাঙ্গ সাম্রাজ্যের গাউন যৌথভাবে নির্মাণ করেছে নতুন একটি ক্ল্যাসিক্যাল পোশাক ঐতিহ্য। নতুন অঞ্চল দখল করার আনন্দ হিসেবে নিজের দেশে অবস্থান করা ব্রিটিশ নারীরা আধুনিক ও সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রতীক হিসেবে পশমিনা শালকে গ্রহণ করে গৌরবের সঙ্গে। নিজের দেশে তাদের সাম্রাজ্যবাদী শক্তি প্রদর্শনের নিদর্শন হিসেবে ব্যবহার করতে আরম্ভ করে ভারতীয় পণ্য, কাশ্মীরি শাল। এ প্রবণতার সবচেয়ে সুস্পষ্টরূপ দেখা যায় ১৮৫১ সালের গ্রেট এক্সিবিশনে, যেখানে ব্রিটেন ও ফ্রান্স তাদের সাম্রাজ্যের অধিকার নিয়ে গর্ব প্রকাশ করে।

ব্রিটিশ নারী ও ব্রিটিশ জাতি, উভয়ের কাছেই কাশ্মীরি শাল নিজস্ব মহিমায় ফ্যাশনের এক দুর্দান্ত উপাদান হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়। ব্রিটিশ নারীদের কাছে কাশ্মীরি পশমিনা শালের জনপ্রিয়তা শুধু নারীর ব্যক্তিত্বের অনুভূতিই ছিল না, বরং সেই সঙ্গে এ শাল ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণকেও প্রকাশ করা। সেই সময় ব্রিটিশ নারীরা নিজেদের প্রতিপত্তি গড়ে তোলার জন্যেও কাশ্মীরি শালকে আঁকড়ে ধরেছেন শক্তভাবে। পরিচ্ছদটি ছিল সাম্রাজ্য, বিজয় ও ক্ষমতার অহংকারের বহিঃপ্রকাশ। তাই একটি কাশ্মীরি পশমিনা শাল পরিধান করা মানে ছিল একজন ব্যক্তির সম্পদ ও মর্যাদার প্রকাশ, আরেকটু বিশদভাবে বললে, মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারতে ব্রিটিশজাতির আধিপত্যের আনন্দ উদযাপন করা। সম্রাটের মাথার মুকুটে শোভা পাওয়া পালকের মতো কাশ্মীরি শাল তার পরিধানকারীকে সামাজিকভাবে পৃথক মর্যাদা দান করত। তাই এমন বিরল ক্ষমতাসম্পন্ন বস্তু, একটি কাশ্মীরি সালের মালিক হওয়া ছিল একজন নারীর জন্য প্রচণ্ড গৌরবের একটা ব্যাপার। এর মানে সেই নারীর একজন ধনী ও ক্ষমতাবান কোনো ব্রিটিশ পুরুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে।

মান ও স্বাদের এ প্রদর্শন অন্যভাবে সমাজের মানুষের ভেতর শ্রেণীকরণ করতে আরম্ভ করে ধীরে ধীরে। যেমন একই সামাজিক স্তরে অবস্থান করার পরেও ভারতীয় এ শালগুলোর কারণে মানুষের ভেতর আরেক ধরনের শ্রেণীবিন্যাস তৈরি করতে পারত নারীরা। ইয়র্কশায়ারের একজন সম্ভ্রান্ত মহিলা অ্যান লিস্টার, নিজের ডায়েরিতে দুঃখ প্রকাশের মতো কিছু কথা লিখেছিল কারণ তার বন্ধু এমা একটি খাঁটি কাশ্মীরি শাল সংগ্রহ করতে পারেনি। লিস্টার লিখেছেন, ‘এমার গায়ে একটি শাল ছিল, সেটি কাশ্মীরি শালের নকল। শালটিকে দেখে আমার কাছে বরং কোনো সস্তা বাণিজ্যিক পণ্য বলে মনে হয়েছে…।’ লিস্টারের এ মন্তব্য থেকে বোঝা যায় একটি কাশ্মীরি শাল তখন কীভাবে একজন মানুষের আর্থিক সক্ষমতা ও সামাজিক অবস্থান প্রকাশে শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে কাজ করত।

ভারত থেকে শাল আমদানি করা কয়েকটি কোম্পানির রেকর্ড থেকে জানা যায় ১৮৬২ সালে তারা সবচেয়ে বেশি পরিমাণ ভারতীয় শাল আমদানি করেছে ব্রিটেনে। ১৮৭০-এর দশকে ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধের কারণে কাশ্মীরি শাল ব্রিটেনে তার জনপ্রিয়তার হারাতে শুরু করে। কারণ এ যুদ্ধের কারণে ফরাসি বাণিজ্য পথ বাধাগ্রস্ত হয় এবং ব্রিটিশ সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে কাশ্মীরের অর্থনৈতিক সমস্যা আরো প্রকট আকার ধারণ করে। তার পরও ১৮৮০-এর দশকে ব্রিটিশ ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোয় ক্রেতাদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে কাশ্মীরি শাল পাওয়া যেত। ব্রিটেনের বাজারে এ বিদেশী বস্ত্রের জনপ্রিয়তা উল্লেখ করার মতো। সেকালে নিজের জন্য একটি খাঁটি কাশ্মীরি শাল সংগ্রহ করতে পারা এক মারাত্মক চ্যালেঞ্জ ছিল অধিকাংশ ব্রিটিশ নারীর জন্য।

১৮৩৯ সালের ২৪ জানুয়ারি ফরাসি কাউন্টেস ডি বোর্ক তার ইংরেজ বন্ধু অ্যান লিস্টারকে একটি ভারতীয় শাল উপহারের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠিতে লেখেন:

প্রিয় মিসেস লিস্টার,

আপনার পাঠানো শালটি, অনেক মানুষের মন জয় করে নিয়েছে—আমি আগে কখনো এত উষ্ণ কিছু পরিনি, এতটা মিশে যাইনি কোনো বস্ত্রের সঙ্গে। শালটি পশমের মতো নরম। প্রথম দেখায় অনেক মানুষ মনে করেছে এটি আসলে নতুন আবিষ্কার হওয়া কোনো প্রাণীর চামড়া।

ডি বোর্ক তার লেখায় বর্ণনা করেছেন কীভাবে তার নতুন পাওয়া উপহারটি ফরাসি সমাজে সাফল্য-প্রশংসা অর্জন করেছে। ভারতীয় পশমিনা সালের সঙ্গে ‘বিজয়’ শব্দটি এ অর্থে জড়িয়ে ছিল যে এটি জাগতিক ভোগাবাদী সমাজ, রোমান্টিক প্রলোভন এবং সেই সঙ্গে আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদের সব স্তরে একটি বস্ত্রের জয়জয়কারকে প্রকাশ করে। লিস্টার এবং ডি বোর্কের মতো কিছু বন্ধুত্ব ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে মানসিক এবং সাংস্কৃতিক যোগসূত্র তৈরি করেছে এবং লিস্টারের পাঠানো উপহার একটি বিরল কাশ্মীরি শাল দুই দেশের প্রাচ্য কল্পনায় অনুকূল মাধুর্য ঢেলেছে। তাই ইউরোপীয় নারীদের শরীরে একটি কাশ্মীর শাল জড়ানো মানে তাদের মনের ভেতর বৈশ্বিক মঞ্চের এক শক্তিশালী জাতির অংশীদার হওয়ার অনুভূতি উপলব্ধি করতে পারার সমতুল্য।

উইলিয়াম মেকপিস থ্যাকারের উপন্যাস ভ্যানিটি ফেয়ার-এর একটি অন্যতম নীরব উপাদান ছিল ব্রিটিশ নারীদের মনস্তত্ত্বে সাংস্কৃতিক বৈশিষ্টের স্থানান্তরিত হওয়ার ঘটনা। এ উপন্যাসে থ্যাকারে অনুসন্ধান করেছেন ভারতীয় শালের বহুমুখী অর্থ এবং নারীর চারিত্রিক ও মানসিক গুণাবলির সঙ্গে শালের সংযোগ। উপন্যাসের নায়িকা বেকি শার্প ও অ্যামেলিয়া সেডলি, দুজনেই গভীর ইচ্ছা এবং আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে তাদের পছন্দের বস্ত্রের জন্য। এখানে মনে রাখতে হবে যে থ্যাকারে নিজে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ছিলেন এবং তার একজন অর্ধভারতীয় সৎ বোন এবং ভাতিজি ছিল, যে কথা তিনি পরিচিত লন্ডন সমাজে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন। ভ্যানিটি ফেয়ার লেখা হয় নেপোলিয়নিক যুদ্ধের সময়, এমন একটি সময় যখন ভারতে ব্রিটিশ সংস্কৃতির প্রভাব গভীর হচ্ছে। যদিও উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৪৭ সালে, যখন ভারতে ব্রিটিশ শক্তি এবং ব্রিটিশ আইডেন্টিটি একসঙ্গে মিশে গিয়েছিল।

প্রাথমিক কালের বেশির ভাগ ভিক্টোরিয়ান সাহিত্যের মতো এ উপন্যাসেও একটি শাল উপহার দেয়া মানে ছিল রোমান্টিক ইঙ্গিত। উদাহরণস্বরূপ, উপন্যাসের নায়িকা অ্যামেলিয়া সেডলি বৈধব্যকালে তার বন্ধু ও অনুরাগী উইলিয়াম ডবিনের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা পেত, ডবিন তখন ভারতে থাকে। একটি দৃশ্যে ডবিন তার পরিবারকে উপহার পাঠায় ‘…দুটি ভারতীয় শাল, সাদা শালটি সেডলির জন্য এবং খেজুর পাতা ছাপের কালো শালটি তার মায়ের জন্য’—একেকটি শালের মূল্য ছিল অন্তত ৫০ গিনি, মিসেস সেডলি জানতেন এ কথা। গির্জায় যাওয়ার সময় সেডলি শালটি গায়ে চাপাতেন এবং তিনি বান্ধবীদের কাছে অভিনন্দিত হয়েছেন, এমন চমত্কার একটি উপহার পাওয়ার কারণে।

উইলিয়াম মেকপিস থ্যাকারে বা এলিজাবেথ গ্যাসকেলের মতো ব্রিটিশ লেখকদের লেখায় কাশ্মীরি শালকে ব্যবহার করা হয়েছে একজন ব্যক্তির চরিত্র, এমনকি সমগ্র ব্রিটিশ সমাজের বিশেষ দিককে ইঙ্গিত করে। শালের এ আখ্যান প্রায় পুরোটাই সঞ্চালিত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে, যে আখ্যানে পর্যাপ্ত উপাদান পাওয়া যায় কীভাবে ব্রিটিশ ভোক্তারা বিদেশী পণ্যকে গ্রহণ করেছে এবং সেই সঙ্গে তাদের জাতির সাম্রাজ্যিক ভূমিকাকেও আত্মিকভাবে উপলব্ধি করেছে। ভূতপূর্ব একটি সাধারণ শাল তার জন্মের বিশদ বিবরণ দিয়ে উপন্যাসের বর্ণনাকারী লেখকের কাছে নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেয় এভাবে:

আমি ছিলাম ইসলামাবাদের তাঁতে উৎপন্ন হওয়া সবচেয়ে দামি শালগুলোর একটি। আমি পূর্ব ও পশ্চিমের অনেক একক দুঃসাহসিক ঘটনার সাক্ষী। হারেম, প্রাসাদ ও স্নানাগারের ঈর্ষান্বিত বাসিন্দাও হয়েছি আমি। সুলতান, রাজপ্রতিনিধি, ওমরাহ ও খানদের কুঞ্চিত ভ্রূতে প্রশান্তি এনে দিয়েছি। সুলতানা, রাজকুমারী, খানম ও দেবদাসীদের কোমর বেষ্টন করে থেকেছি বহুকাল। অনেক হাতের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়েছি আমি; উপভোগ করেছি মহান মহিমা, কিন্তু হায় পরিশেষে গ্রাস করেছি কেবল অসীম গ্লানি ও আবর্জনা। যতক্ষণ পর্যন্ত না হে নিয়তি! শেষ পর্যন্ত যখন আমি ছেঁড়া টুকরো হলাম, নোংরা, ছিন্নভিন্ন এবং অর্ধনগ্ন দরবেশের মতো রিক্ত হলাম, ঠিক তখন একটি ন্যাকড়া ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি হয়ে যাই আমি ও আমার পরিণতি।

পাঠকের কাছে প্রাক্তন সাধারণ শালের এ আত্মপরিচয় বিশ্লেষণ করে বিদ্যমান প্রাচ্যবাদী বক্রোক্তি এবং সেই সঙ্গে কামুকতা, সত্যতা ও ক্ষমতার মধ্যকার উত্তেজনাও। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে কাশ্মীরি শাল ইন্দো-পারস্যে সাংস্কৃতির অন্যতম মর্যাদাসম্পন্ন প্রতীক হিসেবে বিরাজ করেছে, ঠিক যেমনটা ছিল ইউরোপে। একই সঙ্গে একটি পণ্য, একটি ফ্যাশন আইটেম, ব্রিটেনের ক্রমবর্ধমান সাম্রাজ্যিক শক্তির নিদর্শন এবং নারীদের লৈঙ্গিক পরিচয় নির্দেশক বস্ত্র ও অর্থনৈতিক অবস্থার প্রতীক—কাশ্মীরি শাল, ভিক্টোরিয়ান সংস্কৃতিতে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। একটি শালের অসংখ্য নকল সংস্করণ এবং শাল পরিধানকারীর ভেতর মর্যাদা জাহির করার অনুকরণ প্রবণতা একটি আসল কাশ্মীরি শাল এবং পরিধানকারী একজন খাঁটি নারী শনাক্ত করার কাজকে জটিল করে তুলেছিল। একই সঙ্গে ভারতের প্রাচীন ইতিহাস এবং সুবিশাল সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞ ব্রিটিশ সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আচ্ছন্ন করে ফেলার পক্ষে হুমকি হয়ে দাঁড়ায় এবং সেই সঙ্গে ব্রিটিশ সংস্কৃতি বিকৃতকরণেরও সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল তখন। কাঙ্ক্ষিত কাশ্মীরি শাল ও প্রাচ্যের বহিরাগতদের মধ্যকার সম্পর্ক জানান দেয় যে নারীদের কাছে একটি শাল কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং একই সঙ্গে সমাজ কীভাবে বিচার করত শাল পরিধানকারী নারীদের। ব্রিটিশ নারীরা সামাজিক ও যৌন নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে শালকে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিল, ঠিক যেমনটি ব্রিটেন চেয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের বৃহত্তর আধিপত্য জাহির করতে। এ পারস্পরিক ক্রিয়া বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাপী আন্তঃসংযোগ, পণ্য বাণিজ্য, সাম্রাজ্যবাদের বিস্তার এবং নারী-বর্ণবাদী দেহকে ঘিরে প্রবাহিত হওয়ার ইতিহাস। প্রথম দেখায়, কাশ্মীরি শাল একটি সুন্দর ও কাঙ্ক্ষিত বস্তু বলে মনে হয়, কিন্তু ভিক্টোরিয়ানদের কাছে তাদের সাম্রাজ্যকে ভেতর থেকে কলুষিত করার জন্য এ একই চিত্তাকর্ষক গুণগুলোকে হুমকি বলে মনে হয়েছিল।

লেখক : গ্লোবাল হিস্টরিজ, আ স্টুডেন্ট জার্নালে প্রকাশিত ক্যাথরিন কার্বেরির একটি প্রবন্ধ অবলম্বনে।

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button