গাজীপুর

কালীগঞ্জে চড় মারায় প্রবাসীর স্ত্রীকে হত্যা, বাড়িতে লুট: রহস্য উদঘাটন করলো পিবিআই

নিজস্ব সংবাদদাতা : প্রায় দুই বছর আগে কালীগঞ্জের চৈতরপাড়া এলাকায় চড় মারার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এবং পূর্ব শত্রুতার জের থেকেই খুন করা হয়েছিল প্রবাসীর স্ত্রী নাজমা বেগমকে (৪০)। এরপর তার বাড়ি থেকে ১ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে পালিয়ে যায় আসামিরা। পরে লুন্ঠিত টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় আসামিরা। ঘটনায় জড়িত সকলেই নিহতের প্রতিবেশী ও স্বজন। দীর্ঘদিন তদন্তের পর পনির (৪০) নামে এক আসামিকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের জট খুলে হত্যার রহস্য উদঘাটন করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর গাজীপুর জেলা শাখার সদস্যরা।

বৃহস্পতিবার (৪ আগষ্ট) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ সকল তথ্য জানায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

গ্রেপ্তার পনির‌ বালীগাঁও এলাকার মৃত ইউনুছ আলীর ছেলে।

নিহত নাজমা বেগম পশ্চিম চৈতরপাড়া এলাকার সৌদি প্রবাসী মোমেন মির্জার স্ত্রী।

পিবিআই জানায়, ২০২০ সালের ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার‌ দিকে নাজমা বেগমের ছেলে স্বপন মির্জা চৈতারপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইসলামিক ওয়াজ মাহফিলে যায়। এর প্রায় এক ঘন্টা পর আনুমানিক রাত সাড়ে ৮টার দিকে স্বপন মির্জা বাড়িতে ফিরে ঘরের খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে দেখে তার মা নাজমা বেগম খাটের উত্তর পাশে শোকেজের সামনে মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। পরে তার ডাক-চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে নাজমা বেগমকে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সে সময় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রেফার্ড করেন। পরে স্বপন মির্জা তার আত্মীয়-স্বজনের সহায়তায় নাজমা বেগমকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলে পথে রাত আনুমানিক ১০টার‌ দিকে তার মৃত্যু হয়। এ সংবাদে কালীগঞ্জ থানা পুলিশ ওইদিন গভীর রাতে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। সে সময় পুলিশসহ সকলে ধারণা করে অজ্ঞাত আসামিরা নাজমা বেগমের মাথায় আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় পরদিন ২৬ ডিসেম্বর নিহত নাজমা বেগমের ছেলে স্বপন মির্জা বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে কালীগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে {মামলা নাম্বার ১৬(১২)২০}।

পিবিআই আরো জানান, কালীগঞ্জ থানা পুলিশ প্রায় ৩ মাস মামলার তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেও হত্যাকাণ্ডের কোনো রহস্য উদঘাটন করতে না পারায় পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলা তদন্তের‌ দায়িত্ব পায় পিবিআই গাজীপুর জেলা শাখা। তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে পিবিআই’র পুলিশ পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম মামলা তদন্তের এক পর্যায়ে ৩ আগষ্ট ভোর রাতে বালীগাঁও গ্রামের পনির‌কে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে।

গ্রেপ্তার পনিরের বরাত দিয়ে পিবিআই জানায়, পনিরের স্ত্রী চৈতরপাড়া এলাকার মৃত আলিম উদ্দিনের মেয়ে মানছুরা বেগম (৩৫) সৌদি আরবে চাকরি করতেন। নিহত নাজমা বেগমের স্বামী মোমেন মির্জাও সৌদি প্রবাসী ছিলেন। পনিরের স্ত্রী বিদেশ থেকে পনিরের কাছে টাকা পাঠাতেন। ওই টাকা পনির তার প্রতিবেশী ও নিকট আত্মীয় নাজমা বেগমের কাছে জমা রাখতো। এতে করে উভয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরী হয়। ঘটনার কিছুদিন আগে টাকা-পয়সা লেনদেনকে কেন্দ্র করে পনিরের সঙ্গে নাজমার মনোমালিন্য শুরু হয়। ঘটনার এক সপ্তাহ আগে নাজমা পনিরের ছেলে সোহেলকে নিয়ে ওয়াজ মাহফিলে যেতে চাইলে পনির নিষেধ করে। এতে দু’জনের মধ্যে বাক-বিতন্ডা হয়। এক পর্যায়ে লোকজনের সামনে পনিরকে চড় মারে নাজমা বেগম। এতে পনির চরম অপমানিত বোধ করে। এছাড়াও নাজমার প্রতিবেশী ভাইপো চৈতারপাড়া এলাকার আব্দুল রশিদ মীর্জার ছেলে আব্দুল গাফফার মীর্জা(২৮) এবং গাফফার মির্জার শশুড় একই এলাকার মৃত সাফিজ উদ্দিনের ছেলে মোঃ মোস্তুফার (৪৮) সঙ্গে জমি নিয়ে এবং নাজমার কাছ থেকে ধার চেয়ে টাকা না পাওয়ায় মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। এ জের থেকেই আসামিরা সকলে একত্রিত হয়ে পরিকল্পনা করে, যেহেতু নাজমা তার ছেলেকে নিয়ে বাড়িতে থাকে তাই যে কোনো উপায়ে তাকে হত্যা করে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়ে প্রতিশোধ নিতে হবে এবং নাজমার বাড়িতে থাকা নগদ টাকা লুট করে নিতে হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনার দিন সন্ধ্যার পর নাজমার ছেলেকে কৌশলে পাশের স্কুল মাঠে ওয়াজ মাহফিলে পাঠিয়ে দিয়ে আসামিরা নাজমার বাড়িতে প্রবেশ করে। সে সময় পনির একটি লাঠি নিয়ে বাড়ির প্রবেশ মুখে পাহারা দিতে থাকে এবং অপর দুইজন আসামি ঘরের ভেতর প্রবেশ করে গ্যাসের পরিত্যক্ত পাইপ দিয়ে এলোপাতাড়ি নাজমার মাথায় আঘাত করতে থাকে। নাজমা চিৎকার করতে চাইলে আসামিরা তার মুখ চেপে ধরলে নাজমার শরীর নিস্তেজ হয়ে‌ যায়। পরে আসামিরা নাজমার শোকেজের উপর থাকা চাবি নিয়ে শোকেজ খুলে নগদ এক লাখ টাকা নিয়ে চলে যায়। অতঃপর আসামিরা লুন্ঠিত টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়।

পিবিআই’র গাজীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মাকছুদের রহমান বলেন, ঘটনায় জড়িত সকল আসামি পরস্পর আত্মীয় ও প্রতিবেশী। টাকা পয়সা লেনদেন ও জায়গা জমি, সীমানা ইত্যাদি নিয়ে নাজমার সাথে পূর্ব শত্রুতা ছিলো। পূর্ব পরিকল্পিতভাবে আসামিরা নাজমার মাথায় আঘাত করে হত্যা করে। আসামি পনির সহযোগী আসামিদের এ মামলার ঘটনায় ভূমিকা বর্ণনা করে ৩ আগষ্ট আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

 

আরো জানতে…….

কালীগঞ্জে প্রবাসীর স্ত্রীকে হত্যার পর বাড়িতে লুট!

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button