আলোচিতসারাদেশ

অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা: স্বপ্ন ছুঁতে অনিশ্চিত যাত্রায় হাজারো মানুষ

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : আরেকটু ভালো থাকার আশায় বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিবছর হাজারো মানুষ ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। এদের একটা বড় অংশ পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশের মাটিতে পা রাখেন। অনেকের পা ফেলা হয় না, প্রাণ যায় মাঝ সমুদ্রে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর দিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। এর আগে তালিকায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানেও ছিল বাংলাদেশ।

গবেষণায় দেখা গেছে, ২৬ থেকে ৪০ বছর বয়সী মানুষ সবচেয়ে বেশি ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করছেন। গত কয়েক বছরে ইউরোপ ও লিবিয়া থেকে ফেরত আসা ২ হাজার ২৮৪ জনের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মাদারীপুর, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, ঢাকা, নোয়াখালী, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লা জেলা থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। এভাবে ইউরোপে যেতে একেকজন তিন থেকে ১৫ লাখ টাকা খরচ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে

সরকার ২০১২ সালে ‘মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন’ করে। এ আইনে ২০১২ থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত ৬ হাজার ৫২০টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় দেখা গেছে, তের হাজারেরও বেশি মানুষ পাচারের শিকার। এতে মোট আসামির সংখ্যা ৩১ হাজারেরও বেশি। কিন্তু ৬ হাজার ৫২০টি মামলার মধ্যে গত ১০ বছরে মাত্র ৭২৮টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৫০টি মামলায় ৯৬ জনের সাজা হয়েছে। প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মামলা এখনো চলমান। অর্থাৎ, মামলা নিষ্পত্তির হার ১১ শতাংশ। আর সাজা হয়েছে দুই শতাংশেরও কম।

এমন বাস্তবতায় আজ পালিত হবে আন্তর্জাতিক মানবপাচারবিরোধী দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো- ‘প্রযুক্তির ব্যবহার ও অপব্যবহার।’ এ উপলক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জাতীয় পরামর্শসভার অয়োজন করা হয়েছে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও কয়েকজন রাষ্ট্রদূত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেবেন।

এদিকে মানবপাচার নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানবপাচার রোধে ন্যূনতম যা করা প্রয়োজন, তা পুরোপুরি করতে পারেনি বাংলাদেশ। তবে এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও শাস্তি প্রদানে সরকারের প্রচেষ্টা বেড়েছে। এ ঘটনায় একজনের সংসদ সদস্য পদ বাতিল করা হয়েছে। মানবপাচারের বিচারে ২০২১ সালের আগস্টে সাতটি ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়েছে। এছাড়া জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যে সরকার আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) শ্রম কনভেনশনের প্রটোকল অনুসমর্থন করেছে। তবে বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে ন্যূনতম মানদ- প্রতিপালন করতে পারেনি বাংলাদেশ।

ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে লোক পাঠানো কিংবা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নারী ও শিশু পাচার- সব ক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার বেড়েছে। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম জানিয়েছে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নারী ও শিশু পাচার দমনে কাজ করতে গিয়ে তারা একটি গবেষণা করেছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের সহায়তায় পরিচালিত ওই গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পাচারকারীরা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সংকটে থাকা পরিবারের শিশু-কিশোরীদের পাচারের জন্য টার্গেট করছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে পাচারের ক্ষেত্রে ফেসবুক, টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগের নানা মাধ্যম অনেক বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে চাকরি দেওয়া কিংবা নায়িকা-মডেল বানানোর লোভ দেখিয়ে তাদের পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে যত মানুষ ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছেন, বাংলাদেশ এখন সেই তালিকায় তৃতীয়। ২০২২ সালের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ১২ হাজার ৬৩৬ জন বাংলাদেশি এভাবে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। আর গত একযুগে অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন প্রায় ৬৫ হাজার বাংলাদেশি। এই পাচারের ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষত ফেসবুকে লিবিয়া টু ইতালি নামে একাধিক গ্রুপ রয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে ১৮টি রুটে লোকজন ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। ইউরোপের সীমান্তে কাজ করা সংগঠন ফ্রন্টেক্স বলছে, পৃথিবীর যে দেশ থেকেই আসুক, ইউরোপে ঢুকতে হলে শেষ পর্যন্ত মোট ৯টি পথ আছে। বাংলাদেশিরা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার পর সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে ‘সেন্ট্রাল মেডিটেরিয়ান রুট’। এই পথে প্রায় ৩৮ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে ঢুকেছেন।

ভারতে নারী পাচারের বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে গত বছর, বাংলাদেশি এক তরুণীকে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর। এ ঘটনায় ভারতের পুলিশ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে, যার মধ্যে রয়েছেন ঢাকার মগবাজারের বাসিন্দা রিফাদুল ইসলাম ওরফে টিকটক হৃদয়। এদিকে ঘটনার পর পুলিশ ও র‌্যাব নারীপাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে দুটি চক্রের ১২ জনকে গ্রেপ্তার করে। শুধু এই দুই চক্র পাঁচ বছরে প্রায় দুই হাজার নারীকে ভারতে পাচার করেছে বলে পুলিশ ও র‌্যাব দাবি করেছে। তবে বাংলাদেশ থেকে কী পরিমাণ নারী ও শিশু ভারতে পাচার হয় তার কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ভারতে পাচার হওয়া প্রায় ২ হাজার নারীকে গত ১০ বছরে আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম পাচারের শিকার ৬৭৫ জন নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছে, ১৬ থেকে ২০ বছরের কিশোরীরা সবচেয়ে বেশি পাচারের শিকার। এরপরেই আছে ১১ থেকে ১৫ বছরের কিশোরী।

মানবপাচার রোধ নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, অবৈধভাবে অভিবাসী হতে গিয়ে উদ্ধার হওয়া ১৮৬ জন বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে আনা হবে। তিনি যুব সম্প্রদায়কে এত টাকা খরচ না করে দেশে উদ্যোক্তা হয়ে কিছু করার আহ্বান জানান।

মোমেন বলেন, অবৈধভাবে অভিবাসী হতে দেশের ভাবমূর্তি প্রচ-ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইউরোপে অবৈধভাবে গিয়ে বৈধ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button