আলোচিতজাতীয়

কুমিল্লায় নির্বাচন কমিশনের ‘আত্মসমর্পণ’

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করায় বর্তমান নির্বাচন কমিশন কতটুকু সক্ষম তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে প্রথম অ্যাসিড টেস্টেই।

কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারকে বিধি লঙ্ঘনের ‘শাস্তি’ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এই প্রশ্ন উঠেছে।

কুমিল্লার স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, বাহার নির্বাচনি এলাকায় শেষ পর্যন্ত থেকে যাওয়ায় নির্বাচন প্রভাবমুক্ত হবে না। নির্বাচনের দিনটি তার নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। আর সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, ‘‘নির্বাচন কামিশন বাহারকে বের করতে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করেনি। নির্বাচন কমিশন চাইলে নির্বাচন বন্ধ করে দিতে পারতো।’’

নির্বাচন কমিশন ৮ জুন কুমিল্লা-৬ আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য আ ক ম কাহাউদ্দিন বাহারকে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয়। তিনি সিটি কর্পোরেশন এলাকার বাসিন্দা৷ তার বিরুদ্ধে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের একাধিক অভিযোগের প্রেক্ষিতে এই ব্যবস্থা নেয়া হয়। কিন্তু বাহার নির্বাচন কমিশনের আদেশকে কোনো পাত্তাই দেননি। নির্বাচন কমিশনের আদেশের বিরুদ্ধে তিনি অবশ্য উচ্চ আদালতে একটি রিট করেছেন। আদালত রুল দিলেও নির্বাচন কমিশনের আদেশকে স্থগিত করেনি বা অবৈধ বলেনি। আর নির্বাচন কমিশনও বাহারকে এলাকার বাইরে যেতে আদেশ ছাড়া আরা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

এই অবস্থায় রবিবার প্রধান নির্বাচন কশিমনার কাজী হাবিবুল আউয়াল তার অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘ইসির নির্দেশনা পাওয়ার পর একজন সংসদ সদস্য এটাকে অনার না করলে কমিশনের তেমন কিছু করার নেই। আমাদের এমন কোনো ক্ষমতা নেই যে কাউকে জোর করতে পারি। আমরা তো আর কাউকে কোলে করে নিয়ে যেতে পারি না।’’

কুমিল্লার নাগরিকরা যা বলছেন

সুজনের কুমিল্লা জেলা কমিটির সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান বলেন, ‘‘নির্বাচন কমিশন অসহায়ত্ব প্রকাশ করায় ভোটাররাও তাদের ওপর আস্থা ধরে রাখতে পারছে না। বাহার সাহেব নির্বাচনি প্রচারণায় যাননি সত্য। কিন্তু এলাকায় আছেন। কর্মীদের সাথে বৈঠক করছেন৷ তার তো প্রভাব আছে।’’ তার কথা, ‘‘হাইকোর্টে রিট করে তিনি শুনানি সাত দিন পরে নিয়ে গেছেন। সেই সুযোগ তিনি এখন গ্রহণ করছেন এলাকায় থেকে।’’

কুমিল্লার সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি আলী আকবর মাসুম বলেন, ‘‘এমপি সাহেব নির্বাচন কমিশনের কথা মানলেন না। আর নির্বাচন কমিশনও তাকে মানাতে পারলো না। ফলে কুমিল্লার মানুষের মনে এই নির্বাচন নিয়ে বড় ধরনের সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, এটা নতুন নির্বাচন কমিশনের প্রথম নির্বাচন। তারা এখানেই যদি না পারে তাহলে জাতীয় নির্বাচনে কী হবে?’’ তার প্রশ্ন, ‘‘নির্বাচনের আগেই কমিশন পারলো না তাহলে নির্বাচনের দিন কী পারবে? নির্বাচনের দিন কার নিয়ন্ত্রণ থাকবে কুমিল্লায়, বাহার সাহেব, না কমিশনের?’’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার প্রশ্ন তুলেছেন, ‘‘নির্বাচন কমিশন যদি কুমিল্লায় মাত্র একজন এমপিকে সামলাতে না পারেন, শৃঙ্খলা মানাতে না পারে, তাহলে জাতীয় নির্বাচনে ৩০০ এমপিকে কীভাবে সামলাবে? এর বাইরে পুলিশ , প্রশাসন আছে, রজনৈতিক দল আছে। তাদের চাপ তারা সামলাবে কীভাবে?’’ তিনি মনে করেন, ‘‘তারা যদি নিজেদের অসহায় বলেন, তাহলে তো বাস্তবেই নির্বাচন কমিশন অসহায়। এখন বড় প্রশ্ন হলো, কুমিল্লা সিটি নির্বাচন কার অধীনে হচ্ছে, বাহার সাহেব, না নির্বাচন কমিশনের?’’

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, ‘‘বাহারকে নির্বাচনি এলাকার বাইরে পাঠাতে নির্বাচন কশিন যথেষ্ট ব্যবস্থা নেয়নি। তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করেনি। বাহার যদি না যান, তাহলে কমিশন চাইলে নির্বাচন স্থগিত করে দিতে পারতো। সেটা করেনি। আমরা কমিশনে যখন ছিলাম, তখন কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচনে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমকে এই প্রক্রিয়ায় এলাকার বাইরে পাঠাতে সক্ষম হয়েছিলাম। তিনি সেখানে গিয়ে দরবার বসিয়েছিলেন। তাকে বলেছিলাম, আপনি সরে না গেলে নির্বাচন স্থগিত করে দেবো। তিনি সরে যেতে বাধ্য হন৷ তখন তো এই সরকারই ছিল।’’

তার কথা, ‘‘নির্বাচন কমিশন তার অসহায়ত্বের কথা বলে নিজেরাই সারেন্ডার করেছে। কিন্তু অসহায়ত্ব প্রকাশ করার কিছু নেই৷ সব রুলস, রেগুলেশন আছে। আদালত নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। ২০০৮ থেকে ২০১২ পর্যন্ত অনেক নজীর আছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘অসহায়ত্ব প্রকাশ করে আজকে তারা সারেন্ডার করলো, কালকে করবে, পরশু করবে। তারা একজন এমপিকেই সরাতে পারে না, তাহলে জাতীয় নির্বাচন করবে কীভাবে?’’

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব মো. আসাদুজ্জামান দাবি করেন, ‘‘নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি আমাদের আছে। ভোট কেন্দ্রের ভিতরে ও বাইরে নিরাপত্তার কোনো অভাব হবে না।’’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘নির্বাচন কমিশন স্থানীয় এমপি বাহার সাহেবকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয়নি, অনুরোধ করেছিল। তিনি একজন মাননীয় সংসদ সদস্য, তাকে কেন নির্বাচন কমিশন নির্দেশ দেবে। আর নির্বাচন স্থগিত করা যেতো কিনা সেটা কমিশনের বিবেচ্য বিষয়। তারা যা ভালো মনে করেছেন, তাই করেছেন।’’

প্রার্থীদের ৪০ ভাগই মামলার আসামি

কুল্লিার প্রার্থীরা বিশেষ করে মেয়র প্রার্থীর নিজেরাই পরপস্পরের বিরুদ্ধে কালো টাকা ছাড়ানোর অভিযোগ করেছেন। কুমিল্লার সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি আলী আকবর মাসুম বলেন, ‘‘মেয়র পদের মতো শীর্ষ পদের প্রার্থীদের কেউ কেউ মাদকসহ গুরুতর মামলার আসামি। আর এবার কালো টাকার ছড়াছড়ি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে নির্বাচনে কী হবে তা নিয়ে নানা সন্দেহ আছে।’’

সুশাসনের জন নাগরিক (সুজন) বলছে, কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে যারা মেয়র এবং কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছেন তাদের মধ্যে মেয়র প্রার্থীদের ৬০ শতাংশ এবং কাউন্সিলর প্রার্থীদের প্রায় ৩০ শতাংশের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। হত্যা ও মাদকসহ গুরুতর অপরাধের মামলার আসামি তারা। মেয়র প্রার্থীদের ২০ শতাংশের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা আছে।

সুজনের জেলা কমিটির সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান বলেন, ‘‘প্রার্থীরা নির্বাচন কশিমনে যে হলফনামা দিয়েছে, সেখান থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে। এটা নির্বাচন কমিশনের দেখার ব্যাপার। আমরা ভোটারদের সতর্ক করেছি যাতে তারা ভালো প্রার্থী পছন্দ করতে পারেন।’’

প্রসঙ্গত, আগামী বুধবার কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের তৃতীয় নির্বাচন। নির্বাচনে মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী (বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত) মনিরুল হক সাক্কু এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী আরফানুল হক রিফাতের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার কথা। সাক্কু এর আগে দুই বারের নির্বাচিত মেয়র। আর আলোচিত-সমালোচিত সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের ‘আশীর্বাদপুষ্ট’ হলেন আরফানুল হক রিফাত।

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button