বিনোদন

নায়ক ফারুকের অ্যাকাউন্ট শূন্য, করতে হয়েছে ধার-দেনাও!

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : এক বছরের বেশি সময় ধরে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন অভিনেতা, সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন পাঠান ফারুক। সেখানে তিনি লড়াই করছেন মরণব্যাধী ক্যান্সারের সঙ্গে। সহকর্মী এবং ছেলে-মেয়ে ছেড়ে বহুদিন ধরে পড়ে আছেন দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে হাসপাতালের বিছানায়। এই দীর্ঘ সময়ে ফারুকের চিকিৎসা বাবদ অনেক টাকা ব্যয় হয়েছে। চিকিৎসার জন্য বারিধারার দুটি ফ্ল্যাট গত জানুয়ারিতে বিক্রি করতে হয়েছে। ব্যাংক অ্যাকাউন্টও শূন্য। করতে হয়েছে ধার-দেনাও।

এখন কেমন আছেন বাংলা চলচ্চিত্রের মিয়া ভাই? দেশে ফিরবেনই বা কবে?

গত এক বছরের বেশি সময় ধরে অসুস্থ অভিনেতার একমাত্র ছায়াসঙ্গী তাঁর স্ত্রী ফারহানা পাঠান। এসব বিষয়ে তিনি সংবাদ মাধ্যমকে জানান, ফারুকের শারীরিক অবস্থার ক্রমেই উন্নতি হচ্ছে। অভিনেতা দুই মাসের বেশি সময় ধরে ভালোভাবে হাটাচলা করছেন, স্বাভাবিক খাবার খাচ্ছেন। অবসরে বই পড়েন। টিভি চালিয়ে দেশের খবর দেখেন।

কিন্তু কবে দেশে ফিরবেন কালজয়ী সিনেমা ‘সারেং বউ’য়ের নায়ক ফারুক। এ প্রশ্নের জবাবে তার স্ত্রী ফারহানা পাঠান বলেন, ‘আপনাদের মিয়া ভাই কবে দেশে ফিরবেন, সেটা এখনো ঠিক হয়নি। কারণ তিনি আগের চেয়ে সুস্থ হলেও তার কিছু শারীরিক জটিলতা এখনো রয়েছে। সর্বক্ষণ চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হচ্ছে। তাই তিনি পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত দেশে ফেরার পরিকল্পনা নেই।’

গত বছরের ৮ মার্চ থেকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন ফারুক। পেরিয়ে গেছে এক বছর তিন মাস। এই দীর্ঘ সময়ে ফারুকের চিকিৎসা বাবদ অনেক টাকা ব্যয় হয়েছে। এ বিষয়ে কিছুদিন আগে ফারুকের ছেলে রওশন পাঠান শরৎ সংবাদ মাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘আব্বুর চিকিৎসার জন্য আমাদের বারিধারার দুটি ফ্ল্যাট গত জানুয়ারিতে বিক্রি করতে হয়েছে। আব্বুর ব্যাংক অ্যাকাউন্টও শূন্য। ধার-দেনাও করতে হয়েছে।’

এর পরও তার বাবার চিকিৎসায় হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানান শরৎ। বলেন, ‘আব্বু বেশি দিন থাকলে আরও ধার-দেনা করা লাগতে পারে। তার সুস্থতার জন্য আমরা শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করব।’ শরৎ জানান, তার বাবার চিকিৎসার জন্য সরকারি সহযোগিতা পেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তবু যেটুকু সহযোগিতা পেয়েছেন তার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান নায়কপুত্র।

গত বছরের মার্চে নিয়মিত চেকআপের জন্য মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে গিয়েছিলেন ফারুক। সে সময় চেকআপের পর তার রক্তে ইনফেকশন ধরা পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। পরে জানা যায় তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বছরের ১৫ মার্চ তার খিঁচুনি উঠলে তাকে নেওয়া হয় আইসিইউতে। এর পাঁচ দিন পর হঠাৎ জ্ঞান হারালে তাকে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়।

ওই সময় এক মাস ছয় দিন একেবারে অচেতন ছিলেন ফারুক। চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছিলেন না। ফলে এপ্রিলের শুরুতে ছড়িয়ে পড়ে তার মৃত্যুর গুজব। সে সময় এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিনেতার ছেলে শরৎ বলেছিলেন, ‘বাবার মৃত্যুর খবর জানতে চেয়ে সাংবাদিক ও আত্মীয়রা বারবার ফোন করছেন। আমরা খুবই বিরক্ত। সবার কাছে অনুরোধ, না জেনে গুজব ছড়াবেন না।’

ঠিক এক বছরের মাথায় চলতি বছরের ১০ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় গুজব ওঠে, ফারুক মারা গেছেন। এ বিষয়ে রীতিমতো একটি পোস্টার শেয়ার করা হয় ফেসবুকে। সেখানে লেখা হয়, ‘শোক সংবাদ, চিত্রনায়ক ও ঢাকা-১৭ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক পাঠান আর নেই। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।’

দ্বিতীয় দফার এ গুজবের অবসান ঘটান চিত্রনায়ক জায়েদ খান। তিনি অভিনেতা ফারুকের সঙ্গে তোলা একটি ছবি নিজের ফেসবুকে পোস্ট করে লেখেন, ‘আমাদের সবার প্রিয় মিয়া ভাই সুস্থ আছেন, ভালো আছেন। কেউ দয়া করে গুজব ছড়াবেন না। সবাই তার জন্য দোয়া করবেন।’

এছাড়া সিঙ্গাপুর থেকে অভিনেতা ফারুকের স্ত্রী ফারহানা পাঠানও মুখ খোলেন। তিনি দেশের সংবাদমাধ্যমকে জানান, ‘ফারুককে এখন হাসপাতালের সাধারণ কেবিনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তার অবস্থা অনেক ভালো। তাকে নিয়ে কোনো ধরনের গুজব না ছড়াতে সবার প্রতি অনুরোধ করা হলো।’

এর আগে ২০২০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে গিয়েছিলেন ফারুক। বিশ্বজুড়ে তখন চলছিল করোনাভাইরাসের তাণ্ডব। লকডাউনের কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে সব দেশের ফ্লাইট ছিল বন্ধ। ফলে কার্গো বিমানের এক বিশেষ ফ্লাইটে সে সময় সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়েছিল ফারুককে।

ওই বছরের মাঝামাঝি করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন সাংসদ-অভিনেতা। এক মাসেরও বেশি ধরে তিনি প্রথমে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসাপাতালে এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা করান। এরপর তার করোনা নেগেটিভ হয়। তবে শারীরিক জটিলতা যাচ্ছিল না। তাই বাধ্য হয়েই যেতে হয়েছিল সিঙ্গাপুরে। সে সময় সুস্থ হয়ে দেশে ফেরেন ‘মিয়া ভাই’।

তারও আগে ২০১২ সালের জুলাইয়ে এক মাস ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ফারুক। সে সময় তিনি কিডনির রোগে ভুগছিলেন। ব্যাংককে কয়েক মাস চিকিৎসা করিয়ে ২০১৩ সালের ৩০ আগস্ট ভর্তি হন সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে। সেখানে কয়েক মাস চিকিৎসা শেষে ২০১৪ সালের ৭ জানুয়ারি তিনি দেশে ফিরে আসেন।

ফারুকের প্রকৃত নাম আকবর হোসেন পাঠান দুলু। ১৯৪৮ সালের ১৮ আগস্ট মানিকগঞ্জের ঘিওরে তার জন্ম। চলচ্চিত্রে এসেছিলেন ১৯৭১ সালে এইচ আকবর পরিচালিত ‘জলছবি’ সিনেমার মাধ্যমে। অভিনয় করেছেন শতাধিক চলচ্চিত্রে। উল্লেখযোগ্য সিনেমা ‘লাঠিয়াল’, ‘সুজন সখী’, ‘নয়নমনি’, ‘সারেং বৌ’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সাহেব’, ‘আলোর মিছিল’, ‘মিয়া ভাই’।

এর মধ্যে ‘লাঠিয়াল’ সিনেমাটিতে অভিনয়ের জন্য ১৯৭৫ সালে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন ফারুক। ২০১৬ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আসরে তাকে দেওয়া হয় আজীবন সম্মাননা। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি সবচেয়ে সফল ও সেরা নায়কদের একজন হিসেবে স্বীকৃত।

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসন থেকে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ফারুক। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ক্ষমতাসীন এই দলটির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ১৯৬৬ সালে ছাত্রনেতা হিসেবে যোগ দেন ছয় দফা আন্দোলনে। সে সময় তার নামে ৩৭টি মামলা হয়। এরপর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন ফারুক।

 

সূত্র: ঢাকাটাইমস

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button