আলোচিতসারাদেশ

ই-গেট পার হওয়ার পরও যাত্রীকে আগের মতোই মুখোমুখি হতে হবে ইমিগ্রেশন পুলিশের!

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ই-পাসপোর্টের জন্য চালু হলো ই-গেট। ১১ মাস আগে উদ্বোধন হলেও এতদিন কিছু জটিলতায় তা ব্যবহার করা যায়নি। ৭ জুন বিমানবন্দরে ই-গেটের কার্যক্রম চালু করা হয়। এটি পার হতে একজন যাত্রীর ১৮-২০ সেকেন্ড লাগছে। তবে অনেকের মনে প্রশ্ন— ই-গেট পার হলেই কি ইমিগ্রেশন সম্পন্ন হবে?

বাংলাদেশে ইমিগ্রেশনের দায়িত্বে থাকা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ বলছে, ই-গেট পার হলেই যাত্রীর ইমিগ্রেশন সম্পন্ন হচ্ছে না। ই-গেট পার হওয়ার পর যাত্রীকে আগের মতোই ইমিগ্রেশন ডেস্কে গিয়ে ইমিগ্রেশন পুলিশের মুখোমুখি হতে হবে।

জানা গেছে, ইতোমধ্যে বিমানবন্দরে ১৫টি ই-গেট স্থাপন করা হয়েছে। এরমধ্যে ১২টি বহির্গমন এলাকায় এবং আগমনীতে ৩টি।

এছাড়া, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৬টি এবং ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৬টি ই-গেট স্থাপন করা হয়েছে।

ই-গেট কী?

আন্তর্জাতিক ভ্রমণে পরিচয়পত্র হলো পাসপোর্ট। শুরুতে হাতে লেখা পাসপোর্টের প্রচলন হলেও পরে এমআরপি ও পর্যায়ক্রমে আসে ইলেকট্রনিক তথা ই-পাসপোর্ট।

ই-পাসপোর্ট মূলত এমন এক বুকলেট, যার কভারে একটি ইলেকট্রনিক চিপ থাকে। এই চিপে পাসপোর্ট বহনকারীর তথ্য ও পাসপোর্ট জালিয়াতি থেকে সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকে।

এমআরপির ক্ষেত্রে ব্যক্তির ১০ আঙ্গুলের ছাপ সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না, যা ই-পাসপোর্টে আছে। এর মাইক্রোপ্রসেসরে একজন ব্যক্তির বায়োমেট্রিক ও বায়োগ্রাফিক ৪১টি তথ্য থাকে। এর মধ্যে ২৬টি তথ্য খালি চোখে দেখা যায়। ২টি বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে যা বিশেষ যন্ত্র ছাড়া পাঠ করা যায় না।

স্বয়ংক্রিয় বর্ডার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনায় একজন ব্যক্তির ই-পাসপোর্টের তথ্য পড়ার জন্য ই-গেট ব্যবহার করা হয়। এখানে মাইক্রোপ্রসেসরে থাকা বায়োমেট্রিক ও বায়োগ্রাফিক তথ্য যাচাই করে পাসপোর্টধারীকে শনাক্ত করা হয়।

ই-গেট দিয়ে শুধু পাসপোর্ট নয়, একই সঙ্গে ভিসাও যাচাই করা হয়। এতে যাত্রী নিজেই ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে পারেন। এমনকি এক দেশের ই-পাসপোর্টধারী অন্য দেশের ই-গেট ব্যবহার করেও ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে পারবেন। তবে এ সুবিধার জন্য আগে ইমিগ্রেশন পদ্ধতিকে অটোমেশনে আনতে হবে। আবার ই-গেটের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ভিসা ও পাসপোর্ট সংক্রান্ত নেটওয়ার্কের সংযোগও থাকতে হবে।

ইমিগ্রেশন থাকছে আগের মতোই

৭ জুন শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন, শাহজালালে ১৫টি ই-গেট আছে। ৬ জুন পরীক্ষামূলকভাবে কিছু যাত্রীকে ই-গেটের মাধ্যমে সফলভাবে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করানো হয়।

৭ জুন পুরোপুরি ই-গেট চালু হয়। এতে দেখা গেছে, ১৮-২০ সেকেন্ডেই ই-পাসপোর্টধারীর ভেরিফিকেশন শেষ হচ্ছে।

তবে এরপরও যে যাত্রীকে ইমিগ্রেশন ডেস্কে যেতে হবে তা প্রথমে জানায়নি কর্তৃপক্ষ। এতে বিভ্রান্তি ছড়ায়। অনেক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয় ‘১৮ সেকেন্ডে হচ্ছে ইমিগ্রেশন’। অনেকে আবার শিরোনামে লিখেছে, ‘একজন যাত্রী মাত্র ১৮ সেকেন্ডে নিজেই নিজের ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে পারছেন।’

বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের ইমিগ্রেশন পদ্ধতি এখনও স্বয়ংক্রিয় হয়নি। ই-গেটের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ভিসা ও পাসপোর্ট সংক্রান্ত নেটওয়ার্কের সংযোগ স্থাপনসহ অন্যান্য বিষয়গুলোও যুক্ত হয়নি।

তাই প্রশ্ন উঠেছে, ই-গেটের কাজ কী? ই-গেটের মূলত দুটি অংশ। একটি অংশ পাসপোর্ট আসল নাকি জাল তা সনাক্ত করা। অন্য অংশটি পাসপোর্টধারী ব্যক্তি নিজেই নিজের পাসপোর্ট বহন করছেন কিনা তা নিশ্চিত করবে।

পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের বিশেষ পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন) মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, ই-গেটের প্রথম অংশ যাত্রীর পাসপোর্ট স্ক্যান করবে। পাসপোর্টটি জাল না হলে প্রথম ফ্ল্যাপ ব্যারিয়ার খুলে যাবে। পরের গেটে থাকা ক্যামেরা যাত্রীর মুখ ও চোখ স্ক্যান করবে। পাসপোর্টের সঙ্গে যাত্রীর স্ক্যান করা ছবি মিলে গেলে পরের ফ্ল্যাপ ব্যারিয়ার খুলবে। কেউ অন্যের পাসপোর্ট নিয়ে এলে বা কারও বিরুদ্ধে আদালত বা সরকারের বিদেশযাত্রা সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ব্যারিয়ার খুলবে না।’

শাহরিয়ার আলম আরও বলেন, ই-গেট এখন ইমিগ্রেশন পুলিশকে যাত্রী সনাক্তের বিষয়টি নিশ্চিত করবে। পুরো ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হলে যাত্রীর ভিসাসহ অন্য তথ্যও যাচাই করতে হয়। সেগুলো যাচাই করতে ইমিগেশন ডেস্কে আসতে হবে যাত্রীকে।

ই-গেট চালুর আগে পাসপোর্ট চেক করার যন্ত্র ছিল ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে।

মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘আমাদের কাছে যন্ত্র আছে, যার মাধ্যমে ৫-৬ সেকেন্ডে পাসপোর্ট যাচাই করা যায়। তবে যাত্রীকে সরাসরি দেখে ছবির সঙ্গে মেলানো হতো। সন্দেহ হলে ডকুমেন্ট অ্যানালাইসিস সেন্টার আছে। সেখানেও যাচাই করা হতো। যাত্রীর শারীরিক বড় কোনও পরিবর্তন না হলে সনাক্ত করা কঠিন কিছু নয়। তবে ই-গেটের ক্ষেত্রে এসব নিয়ে আর অনিশ্চয়তা থাকবে না।’

শুধু বিদেশযাত্রা নয়, দেশে ফেরার ক্ষেত্রেও একইভাবে ই-গেট ব্যবহার করা যাবে এবং ইমিগ্রেশন ডেস্কে এসে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে হবে বলে জানান তিনি।

ই-গেট সবার জন্য নয়

ই-পাসপোর্টধারী সব যাত্রীই ই-গেট ব্যবহার করতে পারবেন না। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ একটি পরিপত্র জারি করেছিল। যেখানে নির্ধারণ করা হয়েছে কারা ই-গেট ব্যবহার করতে পারবেন।

ওই পরিপত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি ই-পাসপোর্টধারী কূটনীতিক, অফিসিয়াল ই-পাসপোর্টধারী সরকারি কর্মকর্তা, বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা (সিআইপি), সেরা করদাতা কার্ডপ্রাপ্ত ই-পাসপোর্টধারী ব্যক্তি, ই-পাসপোর্টধারী পাইলট ও ক্রুরা ই-গেট ব্যবহার করতে পারবেন।

বাংলাদেশি ছাড়া অন্য কোনও দেশের যাত্রী বাংলাদেশে ই-গেট ব্যবহার করতে পারবেন না। এছাড়া, ইমিগ্রেশন পুলিশও চাইলে নির্ধারণ করতে পারবেন কোন যাত্রী ই-গেট ব্যবহার করবেন, কে করবেন না।

বিশেষ পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন) মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘কেউ যাতে জাল ভিসা, ডকুমেন্ট দিয়ে দেশ ত্যাগ করতে না পারে সেজন্য সর্তক থাকতে হয়। যেসব দেশে যেতে ভিসা লাগে না, কিংবা ভিসা পাওয়া সহজ সেসব দেশের ক্ষেত্রে আমরা একেবারে ওপেন রাখতে পারবো না। তাহলে মানবপাচার বেড়ে যাবে। এজন্য ইমিগ্রেশনে প্রবেশের আগেই গন্তব্য দেখে ঠিক করবো কোন যাত্রীরা ই-গেট ব্যবহার করে যাবেন।

 

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button