ইতিহাস-ঐতিহ্যমুক্তমত

যুদ্ধ ও প্রতিবেশের সাতকাহন

আয়শা জাহান : মধ্যযুগের ভারতের অন্যতম রাজশক্তি ছিল মোগল বাদশাহি। মধ্য এশিয়া থেকে এসে পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরুতে জহিরুদ্দিন মোহাম্মদ বাবর ভারতবর্ষে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। পরবর্তী সময়ে তদীয় পুত্র হুমায়ুন বহু উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যান। কিন্তু তার সন্তান সম্রাট আকবর মোগল শক্তিকে একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক-প্রশাসনিক শক্তিতে পরিণত করেন। দীর্ঘ চার দশকে বাদশাহ আকবর ভারতের বিভিন্ন দিকে যুদ্ধাভিযান ও রাজ্য বিস্তার করেছিলেন।

সম্প্রতি ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক প্রত্যয় নাথের পিএইচডি গবেষণা গ্রন্থরূপে প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থটির নাম ক্লাইমেট অব কনকোয়েস্ট: ওয়ার, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড এম্পায়ার ইন মোগল নর্থ ইন্ডিয়া (২০১৯, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস), যা মোগল সাম্রাজ্যের ওপর নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিহাস রচনার সফল একটি উদ্যোগ। বইটিতে তিনি মূলত পরিবেশ-জল-জমিন-মানব ভাবনার ধারণার আলোকে সাম্রাজ্য বিস্তারের ইতিহাস বয়ানের প্রচলিত কাঠামোকে নতুন পরিপ্রেক্ষিত থেকে উপস্থাপন করেছেন। যুদ্ধ ও যুদ্ধের স্থানিক পরিবেশের মাঝে রয়েছে নিগূঢ় লেনদেনের সম্পর্ক। ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য তথা অবস্থান, ভূগঠন, জলাভূমি, জলবায়ু (শুষ্ক ও আর্দ্র), বৃষ্টি, নদী, পাহাড়, স্থান-কাল পাত্রভেদে সংঘর্ষ-যুদ্ধ-আধিপত্য বিস্তার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। লেখক মোগলদের সঙ্গে ভারতীয় বিভিন্ন আঞ্চলিক শাসকদের যুদ্ধগুলোকে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, অনুকূল ও প্রতিকূল আবহাওয়া ইত্যাদি নানাবিধ ভাবনা থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। ইতিহাসকে জল-জমিনের কাব্যে দেখার এ নতুন প্রয়াস পাঠকদের সামনে আনা এবং গবেষক প্রত্যয় নাথের তুলে ধরা নতুন কাঠামোর সাহায্যে সম্রাট জাহাঙ্গীরের কালপর্বে (১৬০৫-২৭) মোগল আধিপত্য বিস্তার-আগ্রাসন-যুদ্ধের যিকঞ্চিৎ পাঠকদের সামনে তুলে ধরাই বর্তমান রচনার উদ্দেশ্য।

উল্লেখ্য, গবেষক প্রত্যয়ের আকর সূত্রগুলোয় স্থান পেয়েছে মোগল যুগের দরবারি ইতিহাসবিদদের লেখা গ্রন্থাদি, দরবারের দৈনন্দিন কার্যাবলির বিবরণসংবলিত দাপ্তরিক আমলনামা, সুবাহ থেকে পাঠানো সংবাদ, সেনাপতিদের আত্মজীবনী। এমনকি বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার সূত্রগুলোকেও তিনি ব্যবহার করেছেন। বাদশাহ জাহাঙ্গীরের কালপর্বের জন্য আত্মজীবনী তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরী কিংবা সুবা বাংলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎস মির্জা নাথানের লেখা বাহারীস্তান-ই-গায়বীর ওপর নির্ভরতার প্রমাণ গ্রন্থটিতে পাওয়া যায়। শেষোক্ত গ্রন্থটির লেখক বাংলায় জাহাঙ্গীরের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক হাতিয়ার—নওয়ারার একজন দক্ষ কর্মকর্তা। লেখকের বাবা ইহতিমাম খানকে ১৬০৮ সালে বাংলার মীর-ই-বহর নিযুক্ত করা হয়। লেখকের আসল নাম ছিল আলা-উদ-দীন-ইসফাহানী। মির্জা নাথান ছিল তার জনপ্রিয় নাম এবং গায়েবি তার ছদ্মনাম। লেখক নিজেকে ‘খান-ই-জাদ’ আখ্যায়িত করেন, কারণ সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রাসাদেই তিনি বড় হয়েছিলেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরকে তিনি সর্বদা প্রভু ও কিবলা বলে আখ্যা দেন। লেখক সম্রাট জাহাঙ্গীরের কালপর্বে সুবাহ বাংলায় ১৬০৮-এ ইসলাম খান চিশতির নিয়োগ থেকে ১৬২৫-এর ৩ জানুয়ারিতে বিদ্রোহী যুবরাজ শাহজাহানের দাক্ষিণাত্যে যাত্রাপর্বের ইতিহাস দিননামার ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন। চার দপ্তরে বিভক্ত গ্রন্থটির বিষয়বস্তু ছিল—প্রথম দপ্তর: সুবাদার ইসলাম খান চিশতির সময়কাল; দ্বিতীয়: সুবাদার কাশিম খানের শাসনকাল; তৃতীয়: সুবাদার ফতেহ জংয়ের সুবাদারি আমল ও চতুর্থ: বিদ্রোহী যুবরাজ শাহজাহানের বাংলায় অবস্থানকালীন ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা।

সম্রাট জাহাঙ্গীর পিতা বা পিতামহের তুলনায় চারিত্রিক দিকে ভোগী ও অলস হিসেবেই অধিক পরিচিত। ইতিহাসের বইগুলোয় আশেকে নূর জাহান হিসেবে পরিচিত বাদশাহ জাহাঙ্গীর জাগতিক ও জটিল মোগল প্রশাসন যন্ত্রে কিছুটা ম্রিয়মাণ দেখা যায়। এ সময় যুদ্ধের ময়দানে বাদশাহ নামদার অনুপস্থিত। জাহাঙ্গীর যেন সযত্নে এড়িয়ে চলছেন যুদ্ধের ময়দান। বাবর, হুমায়ুন অথবা পিতৃব্য জনক আকবরের মতো জাহাঙ্গীরকে সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে নেতৃত্ব দিতে দেখা যায় না। কিন্তু সাম্রাজ্য বিস্তার প্রক্রিয়া তো চলমান। এ সময় পূর্ব ভারতের বিশেষত সুবা বাংলা তখনো স্বাধীন ভুঁইয়াদের হাতে। এছাড়া বাংলা পার হয়ে পার্শ্ববর্তী উত্তর-পূর্ব ভারত বা বর্তমানে ‘নর্থ-ইস্ট ইন্ডিয়া’ নামে পরিচিত এলাকাটিও জয় করা হয়নি।

দাক্ষিণাত্যের কিংবা উত্তর-পশ্চিম সীমান্তবর্তী এলাকায় পিতা আকবরের সময় শুরু হওয়া প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া তখনো চলমান। ফলে জাহাঙ্গীর একেবারে শান্ত আশিক খোলসে নিজেকে আবদ্ধ রাখতে পারেননি। যুদ্ধাভিযান পাঠাতে হয়েছে বিশ্বস্ত, প্রিয় অথবা আস্থাভাজন সুবাদার ও সেনাপতিদের নেতৃত্বে। বর্তমান লেখায় যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি, সেনানায়কের বীরত্ব, যুদ্ধের দিননামার লম্বা ফিরিস্তি দেয়ার চেয়ে প্রত্যয় নাথের ক্লাইমেট অব কনকোয়েস্ট গ্রন্থে উপস্থাপিত ভাবনার আলোকে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রাজ্যগুলোয় সংগঠিত যুদ্ধগুলো পাঠকের সামনে উপস্থাপন করতে চাই।

ষোড়শ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় কামরূপ, কুচ, অহমিয়া রাজ্যের দখল নেয়ার জন্য মোগল বাহিনী অভিযান চালায়। প্রত্যয় নাথের দৃষ্টিতে এ অভিযান পরিচালনায় অহমিয়ারা যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ বেশি রাখতে পারল নাকি মোগলরা বেশি পারল, সেটি নির্ভর করেছিল ওই এলাকার আবহাওয়া, জলবায়ু। পাহাড়ি জলবায়ু ও বর্ষা মৌসুমের সঙ্গে কারা ভালোভাবে খাপ খাওয়াতে পারল তার ওপর। সমরনায়ক কিংবা তার শক্তিশালী সেনাবাহিনীর চেয়ে প্রকৃতিই যেন মুখ্য; জয়-পরাজয় নির্ধারণ করছে নদী, অবিরাম বৃষ্টি-পাহাড়-পর্বত।

১৬০৮-১২ সালের মধ্যে বাংলার সুবাদার ইসলাম খান চিশতির উল্লেখযোগ্য অবদানের প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি রাজমহল ও ঢাকা এ বড় শহর দুটিকে একত্র করেছিলেন। আরো পূর্ব দিকে সিলেট একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। ভাটির বারোভুঁইয়াদের জয় করার পাশাপাশি ইসলাম খান চিশতি সিলেট অঞ্চলেও তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এসব জয়ের ফলে পালাক্রমে মোগলরা উদয়পুর ও ত্রিপুরা রাজ্য নিজেদের দখলে নিতে সক্ষম হয়েছিল। সিলেট জয় করার পর জাহাঙ্গীরের লক্ষ্য অহম রাজ্যের ওপর। সুবাদারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় অহম আক্রমণ। অহমিয়া রাজ্যকে আক্রমণ করতে গিয়ে মোগল সেনাবাহিনী বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল। সময়টা ছিল বর্ষাকাল এবং একটি বড় ধরনের বন্যা সংঘটিত হয়। মোগল বাহিনী এ পরিবেশের সঙ্গে অনভ্যস্ত ছিল। তাদের এক কঠিন পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয়েছিল। অবশেষে তারা একটি চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে নিজেদের হারের লজ্জা ঠেকাতে সক্ষম হয়।

বাংলার সুবাদার রাজা রামসিংহের নেতৃত্বে অহমিয়া রাজ্যের ওপর মোগলরা সর্বশেষ আক্রমণ চালায়। তবে আমাদের এটি বিস্মৃত হলে চলবে না যে অহমিয়ারা কেবল সম্রাট জাহাঙ্গীরের সেনাবাহিনীকেই এভাবে নাস্তানাবুদ করেনি। সুলতানি যুগে বাংলার একাধিক মুসলিম শাসক আসামের পাহাড়ি এলাকায় যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রতিকূল পরিবেশের কাছে হার মেনেছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ বখতিয়ারের তিব্বত অভিযানের কথা আমি পাঠককুলকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। বাগমতী নদী পার হওয়ার পর এ দুঃসাহসী সেনাপতির বাহিনী কিন্তু পাহাড়ি আক্রমণ, বর্ষা ও বন্যায় ভীষণ বিপদে পড়েছিল। কেবল ব্যর্থ অভিযানই নয়, এ ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বখতিয়ারকে মানসিকভাবেও পর্যুদস্ত করেছিল।

অহম বা বর্তমান নর্থ-ইস্ট ইন্ডিয়ার আসাম রাজ্যের ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দের একটি ঘটনা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়। এ সময় শেখ কামাল ও মুকাররম খানের নেতৃত্বে মোগল বাহিনী আহমের কামরূপ এলাকাটি আক্রমণ করে। রাজা পরীক্ষিতকে বন্দি করেন এবং চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য আহ্বান জানান। অহম রাজা মোগলদের সঙ্গে সন্ধি করেন। তিনি মোগল সেনাপতি শেখ কামালকে দুটি হাতি ও ৮০ হাজার রুপি দেন। এছাড়া রাজা সুবাদারকে খুশি করার জন্য ১ লাখ রুপি, ১০০ হাতি ও ১০০ ঘোড়া দেন এবং এক কন্যাকে সুবাদারের স্ত্রী হিসেবে পাঠান। এছাড়া তিনি সম্রাটকে ৩ লাখ রুপি, ৩০০ হাতি, ৩০০ ঘোড়া ও আরো এক কন্যাকে প্রদান করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন এবং তিনি তার সাম্রাজ্যে অধিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পান।

সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬১৭ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলে ইতিমাদ-উদ-দৌলার পুত্র এবং নূর জাহানের ভ্রাতা ইব্রাহিম খান ফতেহ জংকে বাংলার সুবাদার হিসেবে নিয়োগ দেন। ইব্রাহিম খানের সুবাদারিকালে চট্টগ্রাম জয়ের চেষ্টা করা হলেও তা সফল হয়নি। এ সুবাদারের সবচেয়ে বড় সামরিক সাফল্য ছিল ত্রিপুরা বিজয়। উল্লেখ্য, সুবা বাংলার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ভুলুয়া জয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এটি চট্টগ্রাম ও আরাকানের সঙ্গে লাগোয়া। ঢাকা কিংবা রাজমহলের মতো বড় বড় শহর জয়ের পাশাপাশি দূরবর্তী ছোট শহর বা বসতির দখল রাখা গুরুত্বপূর্ণ। অবস্থানগত কারণে কখনো কখনো এ ছোট ছোট জয় পরবর্তী বড় বড় যুদ্ধ বিজয়ে সাহায্য করে। যেমনটি করেছিল ভুলুয়া জয়। এটি সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে এমনকি পরবর্তী সময়েও বাংলার পূর্ব ও দক্ষিণ সীমানা অতিক্রম করে রাজ্য বিস্তার প্রক্রিয়ায় তথা মোগল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছে—ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই। পরবর্তী সময়ে জায়গাটি আরাকানিদের বিপক্ষে মোগল সৈন্যদের একটি ঘাঁটি হিসেবে কাজ করেছে। একটি যুদ্ধের পেছনে সৈন্যদের যাতায়াতের জন্য শহরের মধ্যে সংযোগ স্থাপন, যাতায়াত ও ঘাঁটি ব্যবস্থা যদি ধারাবাহিকভাবে সজ্জিত না থাকে, তবে বিরোধী পক্ষকে বিতাড়িত করা সহজ হয় না। যুদ্ধের ময়দানে বারুদ, খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহের প্রক্রিয়ায় এ রকম স্থানের অবস্থানগত দখল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম বিজয়েও এলাকাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্ট হিসেবে কাজ করেছে।

ময়দানে চলছে যুদ্ধ। কিন্তু প্রকৃতি-প্রতিবেশও সেখানে আরেকটি পক্ষ। জাহাঙ্গীরের কিংবা আকবরের যুদ্ধ যেমন স্থানীয় রাজশক্তির সঙ্গে, তেমনি সেটি স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গেও। আবার যুদ্ধ তো জমিন দখলের লড়াই, কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার। ইতিহাসের পাতায় যুদ্ধ বারবার হাজির হওয়া এক চিরন্তন সত্য। তা না হলে কানের কাছে ন্যাটোর ফিসফিসানির আশঙ্কায় পিটার দ্য গ্রেটের উত্তরসূরিরা যুদ্ধ করে! যুদ্ধ হয় রুশ-ইউক্রেনে, আটা-তেলের দাম বাড়ে আমার-আপনার বাজার তালিকায়। এর মধ্যে পাওয়া যায় আধিপত্য বিস্তারের নতুন মাত্রা। নতুন কথন। নতুন শঙ্কা।

 

আয়শা জাহান: গবেষক ও শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button