আলোচিতসারাদেশ

পূর্বাচল: ২০০ প্লট বরাদ্দ পেলে ৪০০ জন!

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : মূল অধিবাসী হিসেবে মো. সিরাজ মিয়া রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে তিন কাঠার একটি প্লট বরাদ্দ পান। ২০১৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তাকে সাময়িক বরাদ্দপত্র দেওয়া হয়। পরের বছর ২৪ জুলাই চূড়ান্ত বরাদ্দপত্রও গ্রহণ করেন তিনি। প্লটটির মালিক হওয়ার পর তিনি মাহতাব উসমানী নামে এক ব্যক্তিকে আম-মোক্তার নিয়োগ করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন পর সিরাজ মিয়া জানতে পারেন তার নামে থাকা প্লটটি ২০১৩ সালের ২০ মার্চ মো. শহর আলী নামে আরেক ব্যক্তিকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ওই ব্যক্তিও বরাদ্দপত্র পেয়ে নিয়মমাফিক কিস্তির টাকা পরিশোধ করেছেন।

ঢাকার এই নতুন শহরে নিজেদের একটি প্লট আছে এমন ভরসায় থাকা আরও কয়েকজন সিরাজের মতো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন।

রাজউক সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত রাজউকের কাছেই কমবেশি ২০০ প্লটের মালিক এ ধরনের দ্বৈত মালিকানাসংক্রান্ত জটিলতার অভিযোগ তুলেছেন। তারা জানান, একই প্লট দুই ব্যক্তিকে বরাদ্দ দেওয়ার ঘটনা মূলত ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বেশি ঘটেছে। এ ধরনের জটিলতায় পড়া ব্যক্তিদের বেশিরভাগই তিন ও পাঁচ কাঠা প্লটের মালিক। বড় আকারেরও কিছু প্লট রয়েছে।

দ্বৈত মালিকানার ঝামেলায় পড়া লোকজনের একটি বড় অংশ মূল অধিবাসী হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত কোটায় প্লট পেয়েছেন বলে জানা যায়।

রাজউক কর্মকর্তারা বলেন, দ্বৈত বরাদ্দের সমস্যা যে সময়ে হোক তা সমাধানের পথে হাঁটছে বর্তমান প্রশাসন। একই প্লটের দুজন মালিকানা দাবির পর কর্তৃপক্ষ প্রথম বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিকে বৈধ ঘোষণা করে দাপ্তরিক কাজকর্মের অনুমতি দিচ্ছে। আর পরে বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিকে হতাশ না করে খালি পাওয়া সাপেক্ষে তাকেও প্লট বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান (সচিব) এবিএম আমিন উল্লাহ নূরী বলেন, ‘দ্বৈত বরাদ্দের এমন কিছু ঝামেলার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। নথিপত্রে দেখা গেছে, ঝামেলাযুক্ত প্লটগুলো অনেক আগে বরাদ্দপত্র ইস্যু করা। আমরা তা সমাধানের লক্ষ্যে প্রথম বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তির বরাদ্দপত্র বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এরপর আমাদের হাতে থাকা খালি প্লট পাওয়া সাপেক্ষে অন্যজনকেও বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি সাময়িক অসুবিধা হলেও বিষয়টি সমাধান করা সম্ভব হবে।’

দ্বৈত বরাদ্দের ঘটনায় যারা জটিলতায় পড়েছেন তাদের মধ্যে শরিফুল আহসান লালের পরিবারও আছে। তার নামে পাঁচ কাঠার একটি প্লট বরাদ্দ দেয় রাজউক। যার আইডি নম্বর ১৬০২৭২, কোড নম্বর ০৯-৩১২বি-০১২। তিনি মারা যাওয়ার পর তার ওয়ারিশ হিসেবে তারিকুন বেগম, তানিম বিন শরীফ ও তায়েফ বিন শরীফের নামে সংশোধিত বরাদ্দপত্র জারি করার জন্য আবেদন করেন। আবেদনের পর রেকর্ড শাখা থেকে জানানো হয়, একই কোডে ওই প্লটটি অন্য ব্যক্তির নামে বরাদ্দ দেওয়া আছে।

মো. নাজিম উদ্দিন নামে আরেক ব্যক্তিও এ ধরনের জটিলতায় পড়েছেন। তিনি ২০০৩ সালের ২৪ মার্চ একটি প্লট বরাদ্দ পাওয়ার পর কিস্তিও পরিশোধ করেন। একই প্লট ২০০৪ সালের ২০ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা মো. সুজন মিয়ার নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরপর তিনিও কিস্তির টাকা পরিশোধ করে আম-মোক্তার নিয়োগ করেন। একপর্যায়ে দেখা দেয় মালিকানাসংক্রান্ত জটিলতা। থেমে যায় দাপ্তরিক সব কার্যক্রম।

ভুক্তভোগীরা রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প সেলে যোগাযোগ করার পর সেখান থেকে বলা হয়, কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথম ব্যক্তির প্লটের বরাদ্দ বহাল থাকবে। আর দ্বিতীয় ব্যক্তিকেও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খালি প্লট থাকা সাপেক্ষে বরাদ্দ দেওয়া হবে।

পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে দপ্তর ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিদিনই দ্বৈত বরাদ্দের ভোগান্তি নিয়ে লোকজন আসছেন। কর্মকর্তাদের কাছে একই প্লট একাধিক ব্যক্তির নামে বরাদ্দের মতো অভিযোগ যা আসছে তা একেবারে কম নয়। এখন পর্যন্ত রাজউকের কাছেই কমবেশি ২০০ প্লটের ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ এসেছে।

রাউজক সূত্র জানায়, ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও গাজীপুরের কালীগঞ্জের ৬ হাজার ১৫০ একর জমিতে বাস্তবায়ন শুরু হয় পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প। তিন দফা সময় বাড়িয়ে ২০১০ সালের মধ্যে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা ছিল। এরপর আরও দুই দফা সময় বাড়িয়ে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। তাও সম্ভব হয়নি। এরপর ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করে একপর্যায়ে ২০২১ সালের জুনে শেষ করার কথা বলা হয়। এ মেয়াদও এক বছর বাড়িয়ে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত করা হয়।

এ প্রকল্পে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ২৫ হাজার ১৬টি আবাসিক প্লট রয়েছে। এসব প্লট সবই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্লটের মালিকানা কাগজপত্রেও দেওয়া হয়েছে। ফলে একই প্লট দুই ব্যক্তির নামে গেছে। এটি মূলত এমআইএস শাখা ও পূর্বাচল নতুন শহরের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের উদাসীনতা ও অনিয়মের কারণে ঘটেছে বলে দাবি করেছে রাজউকের একটি সূত্র। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, এখন আর এমনটি হওয়ার সুযোগ নেই। এমআইএস শাখা তথ্যভান্ডার আধুনিক করা হয়েছে। ফলে একই প্লট দুবার বরাদ্দ পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে।

কর্মকর্তারা জানান, রাজউকের পূর্বাচলে এখন নতুন করে কিছু প্লট খালি হচ্ছে। রাজউকে যারা প্লট বরাদ্দ পান তাদের কয়েকটি শর্ত মেনে স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা দিতে হয়। শর্তের মধ্যে স্বামী/স্ত্রী বা পোষ্য কারও নামে আগে থেকে রাজউকের প্লট বা ফ্ল্যাট থাকলে নতুন করে কেউ পাবেন না। কিন্তু অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি বরাদ্দ নীতিমালার শর্ত ভঙ্গ করে স্বামী ও স্ত্রী দুজন মিলে একাধিক প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। রাজউকের এমআইএস (যেখানে তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়) শাখার দুর্বলতার কারণে ইতিমধ্যে বিপুলসংখ্যক প্লট এভাবে হাতছাড়া হয়েছিল। একপর্যায়ে সংস্থাটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম বোর্ডসভা করে এ ধরনের জোড়া প্লটের অনিয়মের বিষয়ে শক্ত অবস্থানে গেছে। যেখানে জোড়া প্লট আছে তা বাতিল করা শুরু হয়েছে। অনেকেই আবার তা শুনে দুটি প্লটের একটি নিজেদের সুবিধামতো ছেড়ে দিচ্ছে। বেআইনিভাবে নেওয়া প্লট বাতিল করা গেলে কর্তৃপক্ষের হাতে যে পরিমাণ প্লট আসবে তাতে দ্বৈত বরাদ্দ নিয়ে যে জটিলতা দেখা দিয়েছে তা সমাধান করা যাবে। বরাদ্দগ্রহীতা বা স্বামী-স্ত্রী মিলে একাধিক বরাদ্দগ্রহীতার প্রথম বরাদ্দটি রেখে দ্বিতীয়টি সমর্পণের জন্য গণবিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়েছিল। কিছু সাড়াও মিলেছে। আর যারা এ আহ্বানে যারা সাড়া দিচ্ছে না তাদেরটা কর্তৃপক্ষ বোর্ড সভায় উত্থাপন করে বাতিল করে দিচ্ছে। এভাবে যত প্লট রাজউকের হাতে আসছে তা দ্বৈত বরাদ্দের দ্বিতীয় মালিকদের নতুন করে আইডি দিয়ে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

 

আরো জানতে…

দুর্নীতির মাধ্যমে ৬৩টি প্লট হাতিয়ে নিয়ে দুদকের জালে নাগরীর চেয়ারম্যানসহ তাঁর স্বজনরা!

 

এলএ শাখার সহযোগীতায় ‘পূর্বাচলে প্রায় সাড়ে ৫শ কোটি টাকা মূল্যের প্লট’ হাতিয়ে নেয়ার পায়তারা!

 

 

সূত্র: দেশ রূপান্তর

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button