আলোচিতজাতীয়সারাদেশ

জমির মূল্য নির্ধারণ কমিটি নিয়ে প্রশ্ন

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : রেজিস্ট্রেশন খরচ ফাঁকি দিতে জমির প্রকৃত ক্রয়-বিক্রয় মূল্য কম দেখানোর প্রবণতা রয়েছে দেশে। সাধারণ ক্রেতা বা দুর্নীতিবাজ, কালো টাকার মালিক কেউই এ ক্ষেত্রে কম যান না। ফলে ক্রয়-বিক্রয়কৃত জমি থেকে বছরে বিপুল অংকের রাজস্ব হারায় সরকার। তবে এ অর্থের সঠিক হিসাব নেই। জমির মৌজা রেট কম-বেশি করা নিয়ে লুকোচুরি বন্ধের পদক্ষেপ নিতে ২৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বৈঠকে সুপারিশ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। ভূমি থেকে রাজস্ব ফাঁকি রোধ করতে জমির প্রকৃত মৌজা রেট নির্ধারণের জন্য বিধিমালা সংশোধন করে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের জমির মূল্য নির্ধারণ কমিটিতে রাখার প্রস্তাব দিয়েছে এ কমিটি।

এ প্রসঙ্গে বুধবার ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মাক্ছুদুর রহমান পাটওয়ারী বলেন, ২০১০ সালের বিধিমালায় জমির সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ কমিটিতে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সভাপতি ছিলেন। কিন্তু ২০১২ সালের বিধিমালায় ডিসিকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন যাদের হাতে জমির মৌজা রেট নির্ধারণের দায়িত্ব, তারা জমির বাস্তব মূল্য সম্পর্কে ঠিকমতো জ্ঞান রাখেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বলেন, শ্রেণি অনুযায়ী বড় বড় মৌজার উন্নত-অনুন্নত জমি আলাদা করে নতুন নতুন মৌজা তৈরি করতে হবে। এতে জমির প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ সম্ভব হবে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ওই বৈঠকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জমির মূল্য নির্ধারণ কমিটি যথাযথভাবে কাজ করছে না। বিদ্যমান বিধিমালা সংশোধন করে কমিটিতে ডিসিকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে পরামর্শ দেন তিনি। বৈঠকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব প্রদীপ কুমার দাস বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে সরকারি ভূমির প্রতিনিধিত্ব করেন ডিসি। জমির মৌজা রেট নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রতিনিধি নেই। জনগণের স্বার্থে বিধি পরিবর্তন করে ‘জমির সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ কমিটিতে’ ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি রাখার বিষয়ে মত দেন তিনি।

সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুল হাসান বলেন, মৌজা রেট নির্ধারণের ক্ষেত্রে একই শ্রেণির জমির শ্রেণিবিন্যাসের কারণে দামের পার্থক্য দেখা যায়। জমির মূল্য নির্ধারণ শুধু গাণিতিক হিসাবে নয়, জমির শ্রেণির অবস্থান হিসেবে হবে। এ

ক্ষেত্রে জমির শ্রেণি বা অবস্থান সাব-রেজিস্ট্রার বা জেলা রেজিস্ট্রার জানেন না। ফলে তাদের পক্ষে জমির প্রকৃত মৌজা রেট নির্ধারণ সম্ভব হয় না। তিনি আরও বলেন, মাঠপর্যায়ে কী সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে সে বিষয়ে আইজিআর আপিল্যাট অথরিটির জানার কথা নয়। বাস্তবে যারা জমির শ্রেণি বা অবস্থান জানেন তাদের নিয়েই অর্থাৎ জমির স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে জমির মৌজা রেট নির্ধারণ কমিটি গঠন করা উচিত।

সভায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার বলেন, জমির মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মৌজার দলিলের কপি নিয়ে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে সর্বনিম্ন বাজারদর অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র হচ্ছে, জমির রেজিস্ট্রেশন খরচ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে জমির প্রকৃত ক্রয় বা বিক্রয়ের দাম সঠিকভাবে দেখানো হয় না। এ ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অবলম্বন করা হলে প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব হবে না। এ কারণে জমির মূল্য নির্ধারণ কমিটি পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন এবং জমি নিয়ে যেসব দপ্তর কাজ করে তাদের প্রতিনিধি কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

সভাপতির বক্তব্যে কমিটির সভাপতি এইচএন আশিকুর রহমান বলেন, মৌজা রেটের ক্ষেত্রে রাস্তার পাশের জমি শুধু লাইনের সীমারেখার কারণে মূল্যের ভিন্নতা দেখা যায়। বাণিজ্যিক জায়গার ক্ষেত্রে মূল্যের ভিন্নতাও দেখা যায়। পুরো দেশকে পর্যালোচনা করে ভূমির মৌজা রেট পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত। তিনি আরও বলেন, জমির শ্রেণি, অবস্থান, কতটুকু বাণিজ্যিক বা বাণিজ্যিক নয়- এসব বিষয়ে যাদের স্বচ্ছ ধারণা আছে তাদের মৌজা রেট নির্ধারণ কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে মৌজা রেটের তিনগুণ পরিমাণ ক্ষতিপূরণ প্রদানের ফলে কম দামের জমি অধিক দামে বিক্রি দেখিয়ে দলিল করায় জমি অধিগ্রহণে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। এই বিশৃঙ্খলা জমির মূল্য নির্ধারণে গঠিত বিদ্যমান কমিটি সমাধান করতে পারছে না। তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সম্পত্তির সর্বনিম্ন বাজারমূল্য নির্ধারণ বিধিমালা ২০১০ ও ২০১২-এর মধ্যে যেটি অধিক কার্যকর, সেটি আবার চালু করার উদ্যোগ গ্রহণের পরামর্শ দেন।

আশিকুর রহমান বলেন, ভূমি হচ্ছে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন এবং ভূমি রেজিস্ট্রেশন হচ্ছে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এ ক্ষেত্রে ভূমি প্রশাসনের সঙ্গে আইন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার সৃষ্টি হচ্ছে। ভূমি রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালনা করতে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। আইজিআর অফিসের কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, এ অফিসের কার্যক্রম হচ্ছে সাব-রেজিস্ট্রারের পদায়ন ও বদলি। এ অফিসে যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয় তারা তেমন কোনো কাজ করছেন না বলে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি। এ জন্য আইজিআর অফিসের কার্যক্রম বন্ধ করে সরাসরি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে জমির মৌজা রেটসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে পরামর্শ দেন তিনি।

বৈঠকে আরও ছিলেন কমিটির সদস্য জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, আবুল হাসান মাহমুদ আলী, আ স ম ফিরোজ, হাফিজ আহমদ মজুমদার, পনির উদ্দিন আহমেদ, ফেরদৌসী ইসলাম ও মোকাব্বির খান।

 

সূত্র: আমাদের সময়

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button