অর্থনীতিআলোচিত

রেকর্ড উচ্চতায় বাংলাদেশে পরিবহন ব্যয়ের সূচক

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : গত এক দশকে দেশে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভোক্তা মূল্য সূচকের (সিপিআই) পরিবহন ও যোগাযোগ উপখাতের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গিয়েছে, গত এক দশকে সিপিআই পরিবহন ও যোগাযোগ সূচক বৃদ্ধির দিক থেকে শীর্ষস্থানীয় পর্যায়ে রয়েছে বাংলাদেশ। অস্থিতিশীল কয়েকটি অর্থনীতি ছাড়া আর কোনো দেশ এদিক থেকে বাংলাদেশকে পেছনে ফেলতে পারেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য বলছে, দেশটিতে গত এক দশকে সিপিআই পরিবহন ও যোগাযোগ সূচক বেড়েছে ৪০ পয়েন্টের সামান্য বেশি। ভারতে ২০১২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সিপিআই পরিবহন ও যোগাযোগ সূচক প্রায় ৫৫ পয়েন্ট বৃদ্ধির তথ্য দিয়েছে দেশটির পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয়। পাকিস্তানের পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, একই সময়ে দেশটিতে সিপিআই পরিবহন ও যোগাযোগ সূচক বেড়েছে প্রায় ৬০ পয়েন্ট। মালয়েশিয়ায় গত এক দশকে সিপিআই পরিবহন ও যোগাযোগ সূচক বেড়েছে প্রায় ১৫ পয়েন্ট।

অন্যদিকে দেশে গত এক দশকে সিপিআই পরিবহন ও যোগাযোগ সূচক ১৯১ পয়েন্ট বেড়েছে বলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে উঠে এসেছে। ২০১১ সালে বাংলাদেশে সিপিআই পরিবহন ও যোগাযোগ সূচকের অবস্থান ছিল ১২৭ পয়েন্ট। চলতি বছরের মার্চে এ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১৮ পয়েন্টে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরকে ভিত্তি হিসেবে ধরে সিপিআই প্রকাশ করে আসছে বিবিএস। ভিত্তি বছরে সূচকের মান ধরা হয় ১০০ পয়েন্ট।

এছাড়া বিশ্বের ১৯৬টি দেশের সিপিআই পরিবহন ও যোগাযোগ সূচক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক তথ্য সেবা প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং ইকোনমিকসও বলছে, এক দশকে সিপিআই পরিবহন ও যোগাযোগ সূচক বৃদ্ধির দিক থেকে শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের পরিবহন ব্যয় অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। একজন মানুষ যা আয় করে, তার ১০ শতাংশ পরিবহন খাতে ব্যয় হলে বলা হয় পরিবহন ব্যয় স্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু রাজধানী ঢাকাসহ দেশের শহরাঞ্চলে এ ব্যয় এরই মধ্যে ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। যানজট, পরিবহন খাতের অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশে পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে বলে মত দিয়েছেন তারা।

এক দশক আগেও ঢাকা-রাজশাহী রুটের নন-এসি বাসের একটি আসনের ভাড়া ছিল ৩০০ টাকার কম। বর্তমানে ঢাকা-রাজশাহীর মধ্যে ভ্রমণ করতে গিয়ে একজন যাত্রীকে গুনতে হচ্ছে ৬০০ টাকা। এক দশকের ব্যবধানে দেশের অন্যতম ব্যস্ত এ রুটে বাস ভাড়া বাড়ার হার প্রায় ১০০ শতাংশ।

২০১১ সালের দিকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত একটি মাঝারি ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যানের (১০ টন) স্বাভাবিক ভাড়া ছিল ৫-৬ হাজার টাকা। বাংলাদেশ পণ্য পরিবহন মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব তাজুল ইসলাম গতকাল বণিক বার্তাকে জানান, বর্তমানে এ রুটে মাঝারি ট্রাক/কাভার্ড ভ্যানের স্বাভাবিক ভাড়া ১২-১৩ হাজার টাকা। যদিও ব্যবসায়ীদের দাবি, ১৬ হাজার টাকার নিচে এ রুটে কোনো মাঝারি ট্রাক ভাড়া পাওয়া যায় না। সড়কপথের মতো গত এক দশকে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়েছে নৌপথেও। রিকশা-ভ্যান থেকে শুরু করে ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ড ভ্যান—মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের সব মাধ্যমেই বাংলাদেশে গত এক দশকে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।

গণপরিবহনের ভাড়া নির্ধারণ করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এ ভাড়ার হারের সঙ্গে মিল রেখে পণ্যবাহীসহ সব ধরনের স্থল পরিবহনের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ গত বছরের নভেম্বরে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে গণপরিবহনের ভাড়া ২৭ শতাংশ বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল বিআরটিএ।

অন্যদিকে নৌপথে পণ্য পরিবহনের ভাড়া নির্ধারণের দায়িত্ব বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ)। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ১০০ কিলোমিটার দূরত্বে ৩৫ শতাংশ ও ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের লঞ্চ ভাড়া প্রায় ৪৩ শতাংশ বাড়ায় সংস্থাটি। পণ্যবাহী নৌযানের ভাড়াও প্রায় সমহারে বাড়ে।

বাংলাদেশে পরিবহন ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধির জন্য সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকে দায়ী করেছেন দেশের সড়ক পরিবহন খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার। তিনি বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার যে প্রবণতা সেটা বাংলাদেশের সব খাতেই রয়েছে। পরিবহন খাত আলাদা কিছু নয়। এর বাইরে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সময় গণপরিবহনে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ ওঠে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে বিআরটিএ সবসময় কাজ করে যাচ্ছে। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে জরিমানাও করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বাড়ার পেছনে মোটাদাগে চারটি কারণের কথা বলছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে যানজট একটি বড় সমস্যা। পরিবহন বৃদ্ধির জন্য এ যানজট সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের চাহিদা বৃদ্ধি ও পরিবহন খাতের অনিয়ম-বিশৃঙ্খলার কারণেও দেশে পরিবহন খাতে ব্যয় বাড়ছে।

তিনি আরো বলেন, পরিবহন ব্যয় মানুষের আয়ের ১০ শতাংশের মধ্যে থাকলে সেটিকে সহনীয় ধরা হয়। বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে এ ব্যয় মানুষের আয়ের ২০ শতাংশের কাছাকাছি চলে এসেছে। তাই কোনোভাবেই বাংলাদেশের পরিবহন ব্যয়কে সহনীয় বলা যায় না।

পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব শুধু মানুষের দৈনন্দিন জীবনেই পড়ছে না, দেশের অর্থনীতিতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহসভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি আমদানি-রফতানি। পরিবহন ব্যয় বেশি হলে তার প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে আমদানি-রফতানিতে। একইভাবে কৃষিসহ স্থানীয় বাণিজ্যেও বিরূপ প্রভাব ফেলে, যার নেতিবাচক প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়ে বলে মনে করেন তিনি।

 

সূত্র: বণিক বার্তা

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button