আলোচিতরাজনীতি

আবুল মাল আবদুল মুহিত: এক বর্ণাঢ্য জীবনের সমাপ্তি

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : আবুল মাল আবদুল মুহিত–একাধারে একজন অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, লেখক ও ভাষাসৈনিক। মেধাবী শিক্ষার্থী থেকে আমলা ও রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা মুহিতের দখলে রয়েছে মোট ১২টি বাজেট উত্থাপনের রেকর্ড। এর মধ্যে টানা ১০টি বাজেট উত্থাপন করেছেন। শুক্রবার (২৯ এপ্রিল) দিবাগত রাত পৌনে ১টার দিকে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ৮৮ বছরের এক বর্ণাঢ্য জীবনের সমাপ্তি ঘটে।

এ বরেণ্য ব্যক্তির জন্ম ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেটে। পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম নেতা, তৎকালীন সিলেট জেলা মুসলিম লীগের কর্ণধার অ্যাডভোকেট আবু আহমদ আব্দুল হাফিজের দ্বিতীয় পুত্র তিনি। তার মা সৈয়দ শাহার বানু চৌধুরীও রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।

ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী মুহিত ১৯৫১ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে আইএ পরীক্ষায় প্রথম স্থান, ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ (অনার্স) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম এবং ১৯৫৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেন। তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হল সংসদের নির্বাচিত সহসভাপতি ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে জেল খেটেছেন। চাকরিরত অবস্থায় তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নসহ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমপিএ ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস (সিএসপি) এ যোগদানের পর মুহিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, কেন্দ্রীয় পাকিস্তান এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস সংস্থার কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব ছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। অর্থনৈতিক পরামর্শক হিসেবে ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে তৎকালীন পাকিস্তান দূতাবাসে যোগদান করেন। চাকরি করা অবস্থায় পাকিস্তান কর্মপরিকল্পনা কমিশনের প্রধান ও উপসচিব ছিলেন। ১৯৬৬ সালে তিনি পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য প্রতিবেদন আকারে তুলে ধরেন ও পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেসে পেশ করেন। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে এটিই ছিল এ বিষয়ে প্রথম প্রতিবেদন।

ওয়াশিংটন দূতাবাসের তিনি প্রথম কূটনীতিবিদ: যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ১৯৭১-এর জুন মাসে পাকিস্তানের পক্ষ পরিত্যাগ করে বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য প্রদর্শন করেন। তখন অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়াশিংটন দূতাবাসে ইকোনমিক কাউন্সেলরের দায়িত্ব পালেন করেন তিনি। অর্থনৈতিক কূটনীতিতে মুহিত সবিশেষ পারদর্শী।

১৯৭২ সালে ১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে আসেন মুহিত। আসার আগেই তার নিয়োগ হয়েছিল পরিকল্পনা সচিব হিসেবে। মুহিত পরিকল্পনা কমিশনের সচিব ডেজিগনেট হিসেবে কাজ করেন তিন মাস। এই সময় বঙ্গবন্ধু তাকে দু’টি কাজ দেন। একটি ছিল মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করার পরিকল্পনা, অন্যটি ছিল জেলা প্রশাসনের গণতন্ত্রায়ন। বলা হলো যে, মার্চ মাসের মাঝামাঝি মুহিতকে প্রতিবেদন ও সুপারিশ দিতে হবে। তিনি যথাসময়ে দু’টি প্রতিবেদনই পেশ করেন। ১৯৭২ সালের স্বাধীনতা দিবসের বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধু এই দু’টি কার্যক্রম ঘোষণাও করলেন। কিন্তু তার জীবদ্দশায় সেগুলো বাস্তবায়ন হলো না। এছাড়া এই সময়ে যেসব বিদেশি মিশন ত্রাণ ও পুনর্বাসন নিয়ে আলোচনায় আসত তাদের সঙ্গে আলোচনায় মুহিতকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

১৯৭২ সালে এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ মিশনে চলে যান। আমেরিকা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলে বাংলাদেশ মিশন হয়ে গেল বাংলাদেশ দূতাবাস। মুহিত সেখানে অর্থনৈতিক মিনিস্টার থাকেন দুই বছরের মতো। এই সময়ে ১৯৭২ সালে বেশ কিছুদিন তিনি ছিলেন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার।

১৯৭২-৭৩ সালে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের সদস্য হলে সেপ্টেম্বরে মুহিত হলেন বিশ্বব্যাংকে বাংলাদেশের পক্ষে ভারত বাংলাদেশ শ্রীলংকা গ্রুপের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক, যেখানে ভারতের প্রতিনিধি ছিলেন নির্বাহী পরিচালক।

১৯৭৩ সালে সেপ্টেম্বরে সপরিবারে ঢাকায় ফিরে আসেন। পরিবারের জন্য এই ছিল স্বাধীন বালাদেশে প্রথম পদার্পণ। ঢাকায় থাকেন জুন পর্যন্ত।

১৯৭৪ সালে মে মাসে ওয়াশিংটনে ফিরে গিয়েই হুকুম পেলেন যে, তাকে ইসলামী মন্ত্রী সম্মেলনে যেতে হবে কুয়ালালামপুর এবং তারপর ঢাকায় যেতে হবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ঢাকা ভ্রমণকালে। ভুট্টোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় তাকে বাংলাদেশ ডেলিগেশনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ সময় তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পদ ভাগাভাগির বিষয়ে প্রতিবেদন ও সুপারিশ প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৪-এর ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৭ সালের মে পর্যন্ত মুহিত ছিলেন ম্যানিলায় অবস্থিত এডিবিতে বাংলাদেশ ও ভারতের পক্ষে এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর।

১৯৭৭ সালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বহিঃসম্পদ বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সালে আবুল মাল আবদুল মুহিত সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন। এরপর তিনি ফোর্ড ফাউন্ডেশনের অর্থনীতি এবং উন্নয়ন বিভাগের একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন সংস্থা বা ইফাদেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

সাবেক অর্থমন্ত্রী বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ, আইডিবি এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯৮২ সালের মার্চ মাসে জেনারেল এরশাদের স্বল্পমেয়াদি নির্দলীয় সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতে মুহিত অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৩ মে থেকে হলেন সবেতন মন্ত্রী। ১৯৮৪ সালের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত মন্ত্রীত্বে ছিলেন ২০ মাস। এর মধ্যে দু’টি বাজেট পেশ করেছিলেন। মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করার সময় অনেক দ্বিধাবোধ ছিল তার। সামরিক সরকারের একজন হতে খুব আপত্তি ছিল। তাই অনেক রিজার্ভেশনসহ তখন মন্ত্রী হন।

১৯৮২-১৯৮৩ সালে অর্থমন্ত্রী মুহিতের প্রথম বাজেট পেশ করেন। তখন রাজস্ব আয় ছিল মোট ২৭১০ কোটি টাকা আর মোট সরকারি ব্যয় ছিল ৪৪১১ কোটি টাকা।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের মনোনয়নে সিলেট-১ আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে প্রার্থী হন। ওই নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আবুল মাল আবদুল মুহিত। পরে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে প্রথম যে বাজেটটি মুহিত ২০০৯ সালের ১১ জুন (৩৯তম) সংসদে উত্থাপন করেন, তার আকার ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। এই বাজেটটির মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো দেশের বাজেটের আকার ছাড়িয়ে যায় ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এরপর তিনি ২০১৩ সালে (৪৩তম) ২০১৩-১৪ অর্থ বছরের জন্য ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাজেট চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকার ঘোষণা করেন।

লেখক হিসেবেও আবুল মাল আবদুল মুহিত সমান পারদর্শী। প্রশাসনিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্থ ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে তার ৩৫টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনে (বাপা) তিনি একজন পথিকৃত এবং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ১৯৬৬ সালে মুহিতকে তমঘা ই খিদমত পদকে ভূষিত করে। ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ভিজিটিং ফেলো ছিলেন তিনি। ২০১৫ সালের ১৬ জুন তার নামে রাখা হয় সিলেট জেলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সের নাম। স্বাধীনতা যুদ্ধে অনন্য ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৬ সালে তিনি ‘স্বাধীনতা পদক’ পান।

স্ত্রী সৈয়দ সাবিয়া মুহিত একজন ডিজাইনার। তাদের তিন সন্তানের মধ্যে প্রথম কন্যা সামিনা মুহিত ব্যাংকার ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞ। বড় ছেলে সাহেদ মুহিত বাস্তুকলাবিদ এবং ছোট ছেলে সামির মুহিত শিক্ষকতা করেন।

গত বছর জুলাইয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সে সময় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি।

শুক্রবার সমাপ্তি ঘটে এ বর্ণাঢ্য জীবনের। তার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রী, এমপি এবং বিশিষ্টজনেরা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button