আলোচিতশিক্ষা

বাড়তির বাজারে সহকারী শিক্ষকদের সংসার চালানো দায়!

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : সব মিলিয়ে ১৬ হাজার ২৫০ টাকা বেতন পান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকেরা। বেতন গ্রেডে তাদের অবস্থান ১৩তম। এই বেতনে এতদিন কোনোমতে চলে গেলেও বাড়তির বাজারে এখন তাদের সংসার চালানোই দায়। অনেক শিক্ষক চলছেন ধারদেনায়। ফলে ক্লাসে কম সময় দিয়ে দ্বিতীয় কোনো পেশাতে ঝুঁকছেন শিক্ষকেরা।

ঢাকা, নরসিংদী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ কয়েকটি জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কমপক্ষে ২০ জন সহকারী শিক্ষক বলেন. তাঁরা সবাই শিক্ষকতা পেশায় স্বল্প বেতন ও বেতন বৈষম্য নিয়ে হতাশ। সাম্প্রতিককালে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার পর এই হতাশা তাদের আরও বেড়েছে।

ঢাকায় শিক্ষকতা করেন এমন একজন বলেন, বেতনের টাকায় শহরে এখন দুই রুমের একটি বাসাও ভাড়া হয় না। এজন্য কামরাঙ্গীর চরে একটি রুমে বেড শেয়ার করে ভাড়া নিয়ে থাকি। পরিবারের বাকি সদস্যরা থাকেন গ্রামে।

এই শিক্ষক বলেন, প্রতিমাসে পাঁচ হাজার টাকা পাঠাতে হয় পরিবারের কাছে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন সেটিও সম্ভব হচ্ছে না। জিনিসপত্রের দামের পাশাপাশি যাতায়াতের খরচও বেড়েছে। ১৫ টাকার রাস্তার খরচ এখন হয়েছে ৫০ টাকা। কিন্তু আমাদের বেতন আগের মতোই রয়ে গেছে। আমরা সংসার চালাতে পারছি না।

ঢাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আরেকজন শিক্ষক হিসাব দিলেন— ৯ হাজার টাকা ভাড়ায় দুই রুমের একটি বাসায় পরিবার নিয়ে থাকেন তিনি। নিজের এক সন্তান পড়ে সপ্তম শ্রেণিতে। তার যাতায়াত খরচ দিতে হয় মাসে দুই হাজার টাকা। বাকি ৫ হাজার টাকায় সারামাসের চাল, ডাল আর তেলের খরচ মিটমাট করতে হয় তাদের। তাতে কুলিয়ে উঠছেন না বলে এখন বাধ্য হয়ে অনলাইনে খাবার বিক্রি করতে হচ্ছে ওই শিক্ষকের স্ত্রীকে।

কেবল শহরে নয়, গ্রামেও একই পরিস্থিতিতে রয়েছেন শিক্ষকেরা। দুনিয়াজুড়ে মূল্যস্ফীতির যে ঝড় বইছে তার প্রভাব পড়েছে গ্রামেও। শহরের মতো এতটা কঠিন না হলেও গ্রামেও ১৬ হাজার টাকায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন শিক্ষকেরা। অনেক শিক্ষক আয় বাড়াতে খুলেছেন প্রাইভেট ব্যাচ, অনেকে আবার করছেন ধারদেনা।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নেতা শামসুদ্দীন মাসুদ বলেন, ১৬ হাজার টাকায় একজন মানুষের পক্ষে একা খেয়ে-পরে জীবনধারণ করাই সম্ভব নয়। কর্তৃপক্ষ এটা জানে। কিন্তু জেনেও কিছু করছে না। আমরা শিক্ষকদের সম্মান দেই, কিন্তু টাকা দেই না। তাদেরও যে বেঁচে থাকার প্রয়োজন আছে, সেটা যেন আমরা ভুলেই গেছি।

তিনি বলেন, শিক্ষকদের শুধু সম্মান দিলেই হবে না, তাদের আর্থিক বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য আর্থিক নিরাপত্তা সবচেয়ে জরুরি বিষয়। এটি লাগবেই।

শামসুদ্দীন মাসুদ আরও বলেন, আপনি যদি কোনো একটি পেশার মানুষকে জীবনযাপনের মতো প্রয়োজনীয় টাকা-পয়সা না দেন, চাইলেও তিনি তার পেশায় পর্যাপ্ত সময় দিতে পারবেন না। দ্বিতীয় পেশা খুঁজতে বাধ্য হবেন। তাই শিক্ষকদেরকে ‘অভুক্ত’ রাখার যে সংস্কৃতি, সেখানে বদল আনতে হবে। তা না হলে শিক্ষার ভিত কখনো মজবুত করতে পারবেন না।

প্রাথমিক শিক্ষক ঐক্য পরিষদের শিক্ষক নেতা মো. আনিসুর রহমান বলেন, প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হয় ২৯ হাজার টাকা। ওদের দেশের পত্রিকায় পড়েছি। অথচ একই পদে আমরা পাই ১৬ হাজার টাকা। শিক্ষার জন্য আমরা প্রাণ উৎসর্গ করে দেবো, তবে সেটা খেতে না পেয়ে নয়। বরং আমরা পড়িয়ে, শিখিয়ে জাতির ভবিষ্যতে প্রজন্ম তৈরি করার মাধ্যমে জীবন উৎসর্গ করতে চাই। তার জন্য আমাদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি জরুরি।

কম বেতন ও বাড়তির বাজার নিয়ে শিক্ষকদের এই অভিযোগের পক্ষে অবশ্য সাক্ষ্য দেয় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দেওয়া মার্চ মাসের ভোক্তা মূল্য সূচকের (সিপিআই) হালনাগাদ প্রতিবেদনও।

বিবিএসের নতুন তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতেই মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৬ শতাংশ অতিক্রম করেছে। চলতি অর্থবছরে পর পর তিন মাস গ্রামে ৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে মূল্যস্ফীতি। যদিও চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে রাখার ঘোষণা দিয়েছিল সরকার।

বিবিএস ঢাকার ১২টি বাজারসহ দেশের ১৪০টি বাজার থেকে পণ্য দামের তথ্য সংগ্রহ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে তারা বলছে— চাল, আটা, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, আলু, বেগুন, ঢেঁড়স ও পেঁপের মতো সবজির দামও বেড়েছে। খাদ্য বহির্ভূত খাতে প্রসাধন সামগ্রী, জুতা, পরিধেয় বস্ত্র, বাড়ি ভাড়া, আসবাবপত্র, গৃহস্থালি পণ্য, চিকিৎসাসেবা, পরিবহন, শিক্ষা উপকরণ এবং বিবিধ সেবাখাতেও মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে।

তবে শিক্ষকরা বলছেন, প্রকৃত মূল্যস্ফীতি এই পরিসংখ্যানের চেয়েও ঢের বেশি। তাছাড়া বেতনের অর্ধেকেরও বেশি তাদেরকে খরচ করতে হয় বাসা ভাড়াতেই। ফলে মূল্যস্ফীতি তাদের কাছে মরার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিক্ষকরা বলছেন, ২০২০ সালের শুরুতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সোয়া ৪ লাখ শিক্ষকের বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়। সেবার ৩ লাখ ৭৫ হাজার সহকারী শিক্ষককে বর্তমানের ১৩তম গ্রেডে নেওয়া হয়। এর আগে ১৫তম ও ১৬তম গ্রেডে থাকার সময় তারা বেতন পেতেন আরও কম। ২০১২ সালে পর অনেক আন্দোলনের ফল হিসেবে ২০২০ সালে শেষ পর্যন্ত তাদের বেতন বাড়ানো হয়। তবে সেটিকেও তারা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলছেন।

ওই একই সময় সরকারি প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকদের বেতন ১১তম গ্রেডে নির্ধারণ করা হয়। ১৯৭৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণের পর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের মাঝে বেতনের কোনো ব্যবধান ছিল না। তবে প্রধান শিক্ষকরা কার্যভার ভাতা হিসেবে ১০ টাকা বেশি পেতেন। তখন শিক্ষকদের বেতন ছিল ১৩৫ টাকা।

 

সূত্র: সারাবাংলা

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button