আলোচিতজাতীয়

ঈদে মহাসড়কের আতঙ্ক মোটরসাইকেল!

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : এবার ঈদ যাত্রায় সড়কে মোটরসাইকেলের দাপট বাড়বে। সেটা আগের বছরের তুলনায় তিন গুণ বেশি হতে পারে। তাতে প্রাণহানি বাড়ার আশঙ্কাও করা হচ্ছে। মোটরসাইকেলকে বাংলাদেশে গণপরিবহণ বিবেচনা করায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে, গত ঈদে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের ৪৩ শতাংশ ছিলেন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার। এবার সেটা আরো অনেক বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

কিন্তু বিআরটিএ মনে করছে নাগরিকদের কাছে চাহিদা আছে বলেই মোটরসাইকেল ব্যবহার বাড়ছে। ঈদে মোটরসাইকেলের কারণেই অনেক বেশি মানুষ গ্রামের বাড়ি যেতে পারবেন। বিআরটিএ এর নিয়ম নীতি মেনে চললেই দুর্ঘটনা অনেক কমে যাবে।

তবে যাত্রী কল্যাণ সমিতি ও বিশ্লেষকরা মনে করেন, গণপরিবহণ ব্যবস্থা সঠিকভাবে গড়ে না ওঠা যানজটের কারণেই মানুষ মোটরসাইকেল নির্ভর হয়ে পড়ছে। তাদের মতে মোটরসাইকেল গণপরিবহণ হতে পারে না। এর দায় সরকার এড়াতে পারে না।

বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে মার্চে সারা দেশে ৫৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৫৭৯ জন। এর মধ্যে শুধু মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাতেই মারা গেছেন ২২১ জন। শতকরা হিসেবে ৩৭.৫২ ভাগ মারা গেছেন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। চলতি মাসে এই অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে বলে জানিয়েছেন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘‘এরই মধ্যে ঈদের ট্রেন, বাস ও লঞ্চের টিকিট নিয়ে নৈরাজ্য আমরা দেখেছি। অনেক মানুষ গণপরিবহণে বাড়ি যেতে পারবেন না।

তারা বিকল্প হিসেবে মোটরসাইকেলকেই বেছে নেবেন। আর মোটরসাইকেল অন্য যে কোনো যানবাহনের চেয়ে শতকরা ৩০ ভাগ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। মহাসড়কে এই মোটরসাইকেল অন্য যানবাহনের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে।”

যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানিয়েছে, গত দুই বছরে ঢাকাসহ সারাদেশে নতুন ১০ লাখ মোটরসাইকেল যুক্ত হয়েছে। এখন রাস্তায় মোটরসাইকেলের সংখ্যা কমপক্ষে ৪০ লাখ। এর মধ্যে অন্তত ২৫ লাখ মোটরসাইকেল ঈদ যাত্রায় অংশ নেবে বলে তাদের আশঙ্কা।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘‘ঢাকা থেকে ঢাকার বাইরে মোটরসাইকেলের কমপক্ষে ১২ লাখ ট্রিপ হতে পারে ঈদে। ঢাকার বাইরে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় ৭০ লাখ ট্রিপ হতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে আরো ৪০ লাখ ইজি বাইক। ফলে এবার ঈদযাত্রা সবার জন্য আগের তুলনায় আরো ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা আছে।”

ঈদে যাওয়া আসা হিসেবে বাস, ট্রেন, লঞ্চ ও বিমানসহ সব ধরনের যানবাহন মিলে ৬০ কোটি ট্রিপ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারমধ্যে ৪০ কোটি ট্রিপ হবে সড়ক পথে। সড়ক পথের এই ট্রিপের ১০ শতাংশ হবে মোটরসাইকেলে।

মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘‘মহাসড়কে মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণহীন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা গেলে শতকরা ৫০ ভাগ দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব।”

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, ‘‘গণপরিবহণের অপর্যাপ্ততার কারণেই মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরতা বাড়াছে। মানুষ যানজট এড়াতেও মোটরসাইকেল ব্যবহার করে। কিন্তু এটা বাংলাদেশ ছাড়া বিশ্বের আর কোথাও গণপরিবহণ হিসেবে ব্যবহার হয়না। কারণ মোটরসাইকেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ৩০ ভাগ বেশি।”

তিনি বলেন, ‘‘জাপানে ২৫ লাখ মোটরসাইকেল কমিয়ে ১০ লাখ করা হয়েছে। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ায় মোটরসাইকেল কমিয়ে ফেলায় দুর্ঘটনা কমে গেছে। কিন্তু আমাদের দেশে উৎসাহিত করা হয়। রাইড শেয়ারিং-এ মোটরসাইকেলকে অনুমতি দেয়া হয়েছে, যা দুঃখজনক। ঈদের আগে এখন মোটরসাইকেল কেনায় ডিসকাউন্ট দেয়া হচ্ছে। কিস্তিতে দেয়া হয়৷ দেশতো মোটরসাইকেলে ভরে যাবে।”

ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালের চিকিৎসক ড. শুভ প্রসাদ দাস জানান, তারা সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত যেসব রোগী পান তাদের অধিকাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হন। তিনি বলেন, ‘‘জরিপে ৩৭ ভাগ বলা হলেও বাস্তব চিত্র এরচেয়ে আরো ভয়াবহ। এটা ৫০-৬০ ভাগ হবে। মোটরসাকেল দুর্ঘটনায় যাদের মাথায় আঘাত লাগে তাদের অধিকাংশকেই বাঁচানো যায় না।”

তিনি বলেন, তাদের হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত কমপক্ষে ২০০ জন ভর্তি হন৷ তাদের মধ্যে ৯০-১০০ জনের অপারেশন লাগে। বাকিদের প্লাস্টার করে ম্যানেজ করা যায়। তিনি জানান, ‘‘মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত যারা বেঁচে যান তাদের বড় একটি অংশ পঙ্গু হয়ে যায়। হাত-পা কেটে ফেলতে হয়।” এখন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত নারীদের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে বলে জানান তিনি।

বিআরটিএর রোড সেফটি বিভাগের পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাহবুব ই রাব্বানী অবশ্য দাবি করেন, ‘‘চাহিদা আছে বলেই মোটরসাইকেলের ব্যবহার বাড়ছে, এটা খারাপ কিছু নয়। এই ঈদে যারা গণপরিবহণে যেতে পারবেন না তারা মোটরসাইকেলে যাবেন, এটাইতো স্বাভাবিক। তা না হলে তারা কীভাবে যাবেন? আর মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং-এর অনুমতি আইনের আওতাই দেয়া হয়েছে।”

কিন্তু লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ ও হেলমেট ছাড়াই অনেকে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন ফলে দুর্ঘটনা বাড়ছে। এ ব্যাপারে তার জবাব হলো, ‘‘বিআরটিএ এর তো আইন আছে, নির্দেশনা আছে। সেগুলো মেনেই মোটরসাইকেল চালাতে হবে। আইনের বাইরে গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে৷ ট্রাফিক পুলিশ আছে।”

যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে গত ঈদুল ফিতরে সারাদেশে ৩১৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩২৩ জন নিহত, ৬২২ জন আহত হন। তার মধ্যে ১৪৪ টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৯ জন নিহত, ১৯৯ জন আহত হন। যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৪৫.২৮ শতাংশ৷ ওই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের ৪৩.০৩ শতাংশ এবং আহতের ৩১.৯৯ শতাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার। তাদের আশঙ্কা করোনার বিধিনিষেধ না থাকায় এবারের ঈদে মোটরসাইকেল যাত্রা তিন গুণ বেড়ে যাবে, দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়বে তিন গুণ।

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button