আলোচিতজাতীয়

তেঁতুলতলা মাঠ ও পুলিশের বেআইনি কাজ

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ঢাকার কলাবাগান এলাকার তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষার আন্দোলন দমন করতে গিয়ে পুলিশ একাধিক বেআইনি কাজে জড়িয়ে পড়েছে। তারা ওই মাঠ দখল করে কলাবাগান থানার ভবন নির্মাণ করতে চায়।

সর্বশেষ রোববার পুলিশ মাঠ দখলের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী মা সৈয়দা রত্না ও তার কিশোর ছেলেকে বিনা ওয়ারেন্টে , বিনা মামলায় ১৩ ঘন্টা আটক রেখে প্রচলিত আইন ও সংবিধানের লঙ্ঘন করেছে। আর ১৭ বছরের ওই কিশোরকে আটক করে থানার লকআপে রেখে একই সঙ্গে শিশু আইনের লঙ্ঘন করেছে বলে আইন বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন।

এদিকে রোববার দিবাগত রাত ১২ টার পর যখন স্থানীয় লোকজনের চাপের মুখে তাদের থানা থেকে ছাড়া হয় তখন সৈয়দা রত্নাকে একটি মুচলেকা দিতে বাধ্য করা হয়। যার মূল কথা হলো মাঠ রক্ষায় তিনি শারীরিক বা ভার্চুয়ালি কোনো আন্দোলন করতে পারবেন না। আর পুলিশ যখন তাকে থানায় ডাকবে তখনই তাকে হাজির হতে হবে।

রোববার সকালে আটকের পর পুলিশ দাবি করেছিলো যে তিনি ও তার ছেলে সরকারি কাজে বাধা দিয়েছেন। কিন্তু এব্যাপারে সৈয়দা রত্নার কাছে জানতে চাইলে তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন,”আমি সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ভবনের দেয়াল নির্মাণের দৃশ্য ফেসবুকে লাইভ করছিলাম, পুলিশ তখন আমাকে আটক করে। আমার ছেলে তখন সেখানে ছিল না। একটু পরে সে আসে। তার হাতে ক্যামেরা থাকায় পুলিশ তাকেও আটক করে। থানায় নেয়ার পর আমাকে ছোট্ট একটি রুমে রাখা হয়। আর আমার ছেলেকে লকআপে ঢুকানো হয়। আমি বার বার বলছিলাম আমার ছেলেকে লকআপে না রেখে আমার কাছে রাখা হোক। কিন্তু পুলিশ আমরা কথা শোনেনি।”

১৩ ঘন্টা পর রাতে ছাড়ার আগে মুচলেকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন,”আমাকে একটি কাগজে সই করতে বলা হয়। তাতে আমাকে আন্দোলন বা ফেসবুক লাইভ না করার জন্য বলা হয়। আরো কিছু লেখা ছিলো কী না আমি খেয়াল করিনি। আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলাম।”

তিনি বলেন,”এই একটি মাত্র মাঠ আছে আমাদের এলাকায়। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই এটি খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। কিন্তু কয়েকমাস আগে পুলিশ মাঠের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া দেয় ভবন নির্মানের জন্য। তখন থেকেই আমরা প্রতিবাদ করে আসছি।”

গত জানুয়ারি মাসে কাঁটাতারে বেড়া দেয়ার পর শিশুরা ওই মাঠে খেলতে গেলে পুলিশ কয়েকটি শিশুকে কান ধরে ওঠবস করায়। সেই দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে তখন কয়েকজন পুলিশ কনেস্টবলকে সাসপেন্ড করা হয়। আর কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার আগ ধেকেই কলাবাগান থানার শতাধিক পুলিশ সেখানে দিন-রাত অবস্থান শুরু করে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন,”মা ও তার ছেলেকে আটক করা ছিলো বেআইনি। তাদের মামলা বা ওয়ারেন্ট ছাড়া আটক করা হয়েছে। আর অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরকে আটক করে চরম বেআইনি কাজ করেছে পুলিশ। এর ফলে সে ট্রমার মধ্য দিয়ে যাবে। আটকের পর থানায় আবার ১৩ ঘন্টা রাখা হয়েছে। তারা এখন এর বিরুদ্ধে আদালতে যেতে পারেন। পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন। পুলিশ এখন আইনের বাইরে গিয়ে পেশি শক্তির জোরে চলতে চায়। তারা তাই বেআইনি কাজ করছে।”

সুপ্রিম কোর্টের আকেজন আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন,”পুলিশ সংবিধান ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন ছাড়াও সরসরি ফৌদজারি অপরাধ করেছে। এই ঘটনায় জড়িত পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করা উচিত। আমরা মামলা করি না বলে পুলিশ বার বার অপরাধ করতে সাহস পায়। পুলিশ কোনো মুচলেকা রাখতে পারে না। মুচলেকা রেখেও তারা একটি অপরাধ করেছে। আর এই মুচলেকা প্রমাণ করে পুলিশ তাদের মানসিক নির্যাতন করেছে।”

তার মতে,”বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু সনদে স্বাক্ষরকারী একটি দেশ। এখন সরকারের উচিত হবে দায়ী পুলিশ সদস্যদের শাস্তির আওতায় আনা। তা যদি করা না হয় তাহলে প্রমাণ হবে বাংলাদেশ ওই সনদে স্বাক্ষর করেও তা মানছেনা।”

আর মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন,”পুলিশ নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনসহ নানা বেআইনি কাজ দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে। তার কোনো প্রতিকার নেই। তাই আজকের এই পরিস্থিতি।” এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি করেন তিনি।

এদিকে এ বিষয়ে জানতে কলাবাগান থানার ওসিকে বার বার ফোন করে ও মেসেজ পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ওই এলাকার ডেপুটি পুলিশ কমিশনারকেও পাওয়া যায়নি। তকে অতিরিক্ত ডেপুটি পুলিশ কমিশনার শাহেন শাহকে পাওয়া গেলেও তিনি বলেন,”এব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। সব ওসি সাহেব জানেন। তাকে জিজ্ঞেস করুন।” তাকে ফোনে বার বার চেষ্টা করেও পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানালে তিনি বলেন,” চেষ্টা করে যান, এক সময় না এক সময় পাবেন।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সোমবার সকালে এক অনুষ্ঠানে মা এবং ছেলেকে আটকের ব্যাপারে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন,”তারা (মা-ছেলে) লাইভ ভিডিওতে এসে কিছু অসঙ্গতিপূর্ণ তথ্য প্রচার করছিলেন। সে জন্য তাদের বারবার নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এক পর্যায়ে যখন থামাতে পারেনি তখন তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়েছিল এবং জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরো বলেন,”ঢাকার জেলা প্রশাসক মাঠের জায়গাটি খাস জমি বলে চিহ্নিত করে বরাদ্দ দিয়েছে কলাবাগান থানাকে। সব প্রক্রিয়া শেষে যখন ভবন নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হয় তখন খেলার মাঠ রাখার দাবিতে অনেকে কথা বলেছেন। আমরা মনে করি খেলার মাঠে বাচ্চারা খেলাধুলা করবে এটাই স্বাভাবিক। খেলার মাঠের ব্যবস্থা যেমন করতে হবে আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও থানার জন্য জায়গাটা জরুরি। জায়গাটায় কী করা যায়, এটা আমরা পরে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।”

তবে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন,”কলাবাগানের ওই ১৮ নাম্বার ওয়ার্ডে তিনটি খেলার মাঠ থাকার কথা। আছে মাত্র একটি। ওটি দখল করতে গিয়ে পুলিশ ১৭ ধরনের আইন লঙ্ঘন করেছে। তেঁতুলতলা মাঠটি ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। এটা কোনো পতিত খাস জমি নয়। ড্যাপসহ আরো অনেক নগর পরিকল্পনায় ওটাকে খেলার মাঠ হিসেবে দেখানো হয়েছে। আর আদালতের রায় আছে দীর্ঘদিন ধরে যদি কোনো খোলা জায়গা মাঠ হিসেবে ব্যবহার হয় সেই ব্যবহার প্রাধান্য পাবে।”

এদিকে বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন ওই মাঠ রক্ষায় সেচ্চার হয়েছে। তারা মা ও ছেলেকে ১৩ ঘন্টা আটক রাখার বিচার দাবি করেছেন। বিকেলে তারা মাঠের সামনে মানব বন্ধন করে বলেছেন তারা মাঠের জায়গায় কোনোভাবেই থানা ভবন হতে দেবেন না। তারা প্রয়োজনে ঢাকাসহ পুরো দেশের মানুষকে সংগঠিত করবেন মাঠ দখলের বিরুদ্ধে।

সকালে তারা এক সংবাদ সম্মেলনে মাঠ রক্ষার আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করেন । সেখানে বেলার নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন,”মুচলেকার ভাষা হচ্ছে মাঠ রক্ষার আন্দোলন করা যাবে না। আমরা বলি গণতন্ত্র। আবার বলি মাঠ রক্ষার আন্দোলন করা যাবেনা। তাহলে কী নিয়ে আন্দোলন করক তার একটা তালিকা আমাদের দিয়ে দেয়া হোক।”

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button