অন্যান্য

ঔপনিবেশিক আমলের ক্লাব সংস্কৃতি

মুহিত হাসান : ইংরেজ বেনিয়াদের কাছে পলাশীকাণ্ডের পর দখলীকৃত ভারতীয় উপমহাদেশ সম্পদ আহরণের জন্য যতখানি উত্কৃষ্ট গণ্য হতো, বসবাসের জন্য ঠিক ততটা ‘আকর্ষণীয়’ ছিল না। আঠারো শতক পার করে উনিশ শতকে এসে নিজেদের বিশ্রাম ও বিনোদনের উদ্দেশ্যে তাই সাহেব-সুবাদের উদ্যোগী হতে হয় ‘ক্লাব’ প্রতিষ্ঠায়। একঘেয়ে দিনযাপনের গ্লানি মেটাতে ক্লাব সংস্কৃতি ঔপনিবেশিক ভারতে ঘাঁটি গাড়া ইংরেজদের কাছে ‘দু দণ্ড শান্তি’ লাভ কিংবা ‘ছায়াবীথিতলে’ গিয়ে স্বস্তি পাওয়ার মতো ব্যাপারই ছিল বটে! তবে তা নিছক ক্লান্তি ভোলার জায়গা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং দিনে দিনে পরিণত হয়েছে উপনিবেশের বিদেশী ‘প্রভুদের’ জীবনধারার অপরিহার্য একটি উপাদানে।

ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজদের গড়া প্রথম ‘সার্থক’ ও পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ক্লাব কোনটি? নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেল, কলকাতার ‘দ্য বেঙ্গল ক্লাব’ই পুরো দক্ষিণ এশিয়ার পয়লা সামাজিক ক্লাব। ১৮২৭ সালে এর প্রতিষ্ঠা। ‘পয়লা’ সামাজিক ক্লাব বলার হেতু এই, এর আগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা আলাদা ক্লাব গঠন করলেও সব পক্ষকেই ‘মিলিবে-মেলাবে’—এমন অঙ্গীকার ছিল এটিরই প্রথম। বস্তুত, সামাজিক ক্লাব গঠনের মাধ্যমে ইংরেজ সমাজের নানা তরফের মিলমিশের সুযোগ ঘটুক—আর তাতে সাম্রাজ্য শাসনের বিষয়টিও পোক্ত হোক এবং অবসর সময়টুকুও ভালো কাটুক—এই যেন ছিল উদ্যোক্তাদের অন্তরের নিহিত উদ্দেশ্য। ক্লাবটির নাম গোড়ায় ছিল ‘ক্যালকাটা ইউনাইটেড সার্ভিস ক্লাব’। ১৮২৭-এ কলকাতার এসপ্লানেড এলাকার পশ্চিমে তৈরি হওয়া একটি ভবনে এ ক্লাবের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট ছিলেন লে. কর্নেল জে ফিঞ্চ। কেন এ ক্লাব তৈরির উদ্যোগ? এ সম্পর্কে তখন ফিঞ্চের মন্তব্য ছিল এমন, সমীহ জাগানোর মতো কোনো হোটেল বা কফি হাউজ কলকাতায় নেই। কাজেই সাহেব-সুবাদের জমায়েত করার জন্য বিকল্প স্থানের কথা ভাবতেই হতো। সেই বিকল্পই হলো এ বেঙ্গল ক্লাব। বেঙ্গল ক্লাবের দেখাদেখি ভারতের অন্যান্য এলাকায়ও তখন স্থানীয় ইংরেজরা নতুন নতুন ক্লাব গড়ে তোলার ব্যাপারে মনোযোগী হতে থাকে। তাদের উদ্যোগেই ১৮৩১ সালে প্রতিষ্ঠা পায় মাদ্রাজ (হালের চেন্নাই) ক্লাব, আর ১৮৩৩-এ তত্কালীন বোম্বের (আজকের মুম্বাই) বাইকুল্লায় তৈরি হয় আরেকটি বড় ক্লাব। মজার ব্যাপার এই, প্রায় সমসময়েই লন্ডনের পল মল স্ট্রিটেও ইংরেজদের জন্য একাধিক অভিজাত ক্লাব গড়ে ওঠার খবর পাওয়া যায়। এর আগে যে লন্ডনে ক্লাব সংস্কৃতি ছিল না, তা নয়। কিন্তু উপনিবেশে সাহেবদের ক্লাব গড়ে ওঠার পর্যায়ে নতুনভাবে তাদের স্বদেশেও ক্লাব তৈরির রমরমা দেখে খানিক অবাক হতে হয় বৈকি। আদতে ক্লাব সংস্কৃতি ও নতুন নতুন ক্লাব গড়ে ওঠার নেপথ্যে ছিল উপনিবেশে একচেটিয়া বাণিজ্যরাজ বিস্তারের কারণে হাতে আসা কাঁচা টাকার প্রভাব। সেই কাঁচা টাকা ঔপনিবেশিক ভারতের বড় শহরগুলোর অধিবাসী সাহেবদের হাতে যেমন এসেছিল, তেমনি পৌঁছে গিয়েছিল বিলেতে বসে সেই বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ইংরেজ ব্যবসায়ীদের হাতেও। ফলে এক প্রান্তের কলকাতা কি অন্য প্রান্তের লন্ডন—দুই পারেই সাহেবদের ক্লাব গড়ার প্রবণতা তুঙ্গে উঠেছিল। সাম্রাজ্য থেকে আহরিত পয়সার সদ্ব্যবহার বটে!

এ ক্লাবগুলো গঠনের উদ্যোগ নেয়া হতো কীভাবে? গবেষক বেঞ্জামিন বি কোহেন এর একটা বিবরণ দিয়েছেন। তা এমন: প্রথমে কয়েকজন সাহেব মিলে একটি সভা ডাকতেন। এ সভা অনেক সময় ডাকা হতো স্থানীয় ইংরেজি দৈনিকে বিজ্ঞাপন দিয়ে। সভার প্রতিপাদ্য থাকত এই—কেন একটি নতুন ক্লাব বর্তমান এলাকায় তৈরি করা জরুরি। সভায় সাধারণত প্রথমেই একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি হিসেবে বেছে নেয়া হতো। ক্লাবের সম্ভাব্য সভ্যদের মধ্য থেকে একজনকে ভোটাভুটি বা মৌখিকভাবে করা হতো সভাপতি। যারা ক্লাব গঠনের প্রাথমিক সভায় উপস্থিত থাকতেন, তারা আপনাআপনিই ‘ফাউন্ডিং মেম্বার’ হয়ে যেতেন। এরপর পালা ক্লাবের নিয়মকানুন তৈরির। এটা নিয়ে অবশ্য সে যুগে এক মজার ঘটনা ঘটত। অনেক সময় দেখা যেত, সদ্য তৈরি কোনো ক্লাবের জন্য নতুন নিয়মাবলি তৈরির দিকে সভ্যরা পা বাড়াননি। বরং পুরনো কোনো ক্লাবের নিয়মগুলো হুবহু ‘কপি-পেস্ট’ বা দু-একটি বদলসমেত বসিয়ে দিয়েছেন। আদি পর্বে কলকাতার দ্য বেঙ্গল ক্লাবের নিয়মাবলি যেমন আদৌ নতুনভাবে কিছু তৈরি করা হয়নি, এর তত্কালীন সভ্যরা লন্ডনের ওরিয়েন্টাল ক্লাবের নিয়মগুলোকেই কেবল আত্মসাৎ করে নিয়েছিলেন। তবে এ কাহিনীর ‘টুইস্ট’ অন্যত্র। তা হলো ওরিয়েন্টাল ক্লাবের ওই নিময়গুলোও আদতে তাদের নিজস্ব নয়। তা তারা লন্ডনে খানিক আগে তৈরি হওয়া ইউনাইটেড সার্ভিস ক্লাবের নিয়মকানুন থেকে নিয়ে খানিক অদল-বদল করে নিজেদের নিয়ম বলে চালিয়ে দিয়েছিল। অন্য ক্লাবের বিধান হুবহু নকল করা বা বসিয়ে দেয়ার এ রীতির পেছনে আলস্য ছিল, না অন্য কোনো কারণ ছিল তা বলা মুশকিল। কিন্তু এর ফলে ঔপনিবেশিক জামানায় গড়ে ওঠা ক্লাবগুলোর পরস্পরের মধ্যে মৌলিক কোনো তফাত থাকার সম্ভাবনা শুরুতেই খারিজ হয়ে গিয়েছিল। ফলে বেশির ভাগ ক্লাবের বৈশিষ্ট্য ও কার্যক্রম একতরফা ছকে আটকা পড়ে যায়। এক্ষেত্রে ক্লাবগুলোর সদস্যপদ প্রাপ্তির বিষয়টিই ধরা যাক। সে যুগের সব ইংরেজ ক্লাবেই নিয়মটা ছিল এক সুরে বাঁধা। অতি অবশ্যই ‘সাহেব’ হওয়ার বিষয়টি বাদ দিলে ওই সব ক্লাবে সদস্যপদ লাভের যোগ্যতা ছিল মূলত দুটি—এক. উঁচু পদের সরকারি কর্মকর্তা হওয়া, তা সামরিক হোক বা বেসামরিক ক্ষেত্রে; দুই. সরকারি চাকরি না থাকলে পয়সাঅলা হওয়া।

তা খরচ কেমন পড়ত ইংরেজদের এসব ‘অভিজাত’ ক্লাবের সদস্য হতে গেলে? দ্য বেঙ্গল ক্লাব যখন সদ্য খুলেছে, তখন এতে সদস্যপদের জন্য প্রথমেই জমা দিতে হতো তখনকার পুরো ২৫০ রুপি! উল্লেখ্য, তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন সহকারী ম্যাজিস্ট্রেটের মাসিক বেতন ছিল এর কাছাকছি। এত পয়সা দিয়ে সদস্য হওয়ার কারণেই সম্ভবত অনেকে ক্লাবের জিনিসপাতিকে নিজের ভেবে ভ্রম করতেন! তাই উনিশ শতকেই মাদ্রাজ ক্লাবের নিয়মাবলিতে বেশ কড়া ভাষায়ই লেখা হয়, ‘কোনো সদস্য দয়া করে ক্লাব থেকে কোনো জিনিস নিয়ে যেতে পারবেন না; তা খবরের কাগজ হোক, প্যামফ্লেট হোক, বই হোক বা কোনো খুচরো নিবন্ধ হোক—এর সবই প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি।’ এটা অবশ্য খুব সাদামাটা ও সংগত নিয়ম বলেই যে কারো মনে হবে। তবে উনিশ শতকের একাধিক ইংরেজ ক্লাবে আরেকটি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল, যা যুগপৎ অভিনব ও হাস্যকর। তা হলো ক্লাবের বারান্দায় স্থানীয় মুনশিদের নিয়ে নিজের সুবিধার্থে সাহেবরা পড়াশোনা করতে পারবেন না।

উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক ভারতে ইংরেজদের হাত ধরে ক্লাব সংস্কৃতির গড়ে ওঠা আদতে শাসকশ্রেণীর আভিজাত্যেরই আরেক রকম প্রকাশ। নিজেদের স্থানীয় বা ‘নেটিভ’দের থেকে আলাদা করতে ইংরেজ সাহেবদের স্বতন্ত্র ‘পাবলিক স্পেস’ গড়ার বিকল্প ছিল না। ক্লাবগুলো ঔপনিবেশিক শাসনযন্ত্রের দুই শাখা—সামরিক ও বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তাদেরও একসঙ্গে মেশা ও আলাপ-আলোচনায় নিজেদের ঐক্য সংহত করার ব্যাপারেও ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল, এমনটা বললে অত্যুক্তি হয় না। পাশাপাশি অভিজাত ক্লাবগুলো যেন উপনিবেশ থেকে ভিনদেশী শাসকের নির্দয়ভাবে আহরিত অর্থবিত্তেরও প্রদর্শনশালা হিসেবে গণ্য হতে পারে। সমাজে অবৈধ পন্থায় লুণ্ঠিত কাঁচা অর্থের সমাগম ঘটলে ক্লাবগুলোর বাহারও বাড়ে, এ তো আজকেরও চিত্র। সে যুগে এর থেকে ব্যতিক্রম কিছু নিশ্চয়ই ঘটেনি।

লেখক: মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button