মুক্তমত

সাহিত্যের দর্পণে

মাহমুদুর রহমান : সাহিত্যের বীজ থাকে জীবনে। জীবন থেকে রসদ নিয়ে তৈরি হয় গল্প, চরিত্র। সময়ের ছাপ থাকে সেখানে। ফলে যে সময় কেরানিবৃত্তি ছড়িয়েছিল মানুষের মধ্যে, সে সময়ের সাহিত্যেও কেরানি চরিত্র এবং কেরানিজীবন উঠে এসেছে। বাংলায় কেরানিবৃত্তি এসেছিল ঔপনিবেশিক আমলে এবং একটা সময় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী কেরানিবৃত্তিকে সহজ ও কাঙ্ক্ষিত পেশা হিসেবে নিয়েছিল। জীবন ঘনিষ্ঠ সাহিত্যে কেরানি ও কেরানিদের জীবন উঠে এসেছে। বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব সাহিত্যিকের লেখায় কেরানিদের কথা এসেছে। এক্ষেত্রে কবিতা থেকে গদ্য কোনো ধারাই পিছিয়ে থাকেনি। রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্পে আমরা বাঙালির কেরানিজীবন দেখতে পাই। বিশ্ব সাহিত্যেও এমন গল্পের নজির কম নয়। সাহিত্যের চরিত্রদের পাশাপাশি বহু সাহিত্যিক জীবনের কোনো না কোনো পর্বে কেরানি ছিলেন। এ লেখায় সাহিত্যে ও সাহিত্যিকদের কেরানিজীবনে খানিক আলোকপাতের চেষ্টা করা হবে।

বাংলা সাহিত্যে কেরানিদের নিয়ে প্রথম লেখা হিসেবে ১৮৭৪ সালে প্রকাশিত ‘কেরাণী দর্পণ’ নাটকের নাম নেয়া যায়। বিদ্রুপ ও প্রতিবাদের পাশাপাশি এ নাটকে কেরানিদের জীবন, প্রতিদিনের কাজ, সুখ-দুঃখ সবই কমবেশি ফুটে উঠেছে। নাটকের শুরুটাই হয় এক কেরানির গার্হস্থ্য জীবনের চিত্র দিয়ে। পরিবারে কর্তা গোকুল বন্দ্যোপাধ্যায় একজন কেরানি, যার পরিবারে প্রতিদিন সকাল আসে কর্তার অফিসে যাওয়ার তাড়ার মধ্য দিয়ে। গিন্নি, ঝি, সবার ভোর-সকালের একমাত্র চিন্তা কর্তাকে ভালো করে খাইয়ে অফিসে পাঠানো। কিন্তু সেটা সম্ভব হয় না। কেননা তার চিন্তা যত দ্রুত সম্ভব অফিসে পৌঁছতে হবে। নাটকটি আমাদের দেখায় একজন কেরানির প্রতি সকালের একমাত্র চিন্তা সঠিক সময়ে অফিসে পৌঁছা এবং এ কারণে কোনেদিনই তার প্রাতরাশ ঠিকঠাক সম্পন্ন হয় না। অতঃপর গিন্নির হা-হুতাশ, ঝিয়ের সান্তনা—একজন কেরানি ও তার পরিবারের দিন এভাবেই শুরু হয়। এ বাস্তবতা কেবল একজন গোকুলের নয়, ভারতবর্ষের সেকালের কেরানিদের সবার।

ঔপনিবেশিক কালপর্বে ব্রিটিশরাজ কর্তৃক ইংরেজি শিক্ষা প্রসারের ফলে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে ওঠে—এ কথা সবার জানা। এর আগে ভারতে কেরানিবৃত্তি ছিল না এমন নয়। মোগল বাদশাহ থেকে আঞ্চলিক রাজা বা নবাবের দরবারে বহু কেরানি ছিল (যদিও তারা এ নামে সম্বোধিত হতেন না), কিন্তু সেকালে এ ধারার কর্মীদের সম্মান ছিল। ঔপনিবেশিক আমলে কাগজনির্ভর দাপ্তরিক কাজ বৃদ্ধি এবং প্রচুর শিক্ষিত মানুষের উদ্ভব হওয়ার পাশাপাশি ব্রিটিশদের উন্নাসিকতার কারণে কেরানিদের সম্মান দিনদিন কমেই গেছে। রোজকার নিয়ম বাঁধা কাজের পাশাপাশি ওপরওয়ালার হুমকি-ধমকি, অপমানে কেরানির আপন সত্ত্বা হারানোর উপক্রম হয়। পরিবারের পুরুষটির এ দশা দেখে গিন্নিরা তখন নানা আফসোস করতেন। ‘কেরাণী দর্পণ’ নাটকে গিন্নির আফসোসের একটি অংশ এমন—

এই আজকাল এমনি সব মনিব হয়েছেন যে অসুখ বিসুকের জন্যে যদি একটু দেরি হয়, কি কামাই হয়, তাহলে আর রক্ষা থাকে না। হুঁ বলতে গালাগালি দেয়, তাড়িয়ে দেয়, মাইনে কাটে, আর কেউ কেউ জুতোশুদ্দ নাথিটেও মারে;

সেকালে দেশীয় কেরানিদের মনিব হতো মূলত সাদা চামড়ার সাহেবরা। ইংরেজ-আইরিশ মনিবরা নিজ দেশের কেরানিদের নানা ছাড় দিলেও দেশীয় কর্মচারীদের অকারণে গালাগালি করতে দ্বিধা করত না। নাটকে যেমন আমরা দেখি গোকুলের অফিসের সুপারিনটেনডেন্ট সাহেব কেবল দেশীয় কর্মচারীদের বিলম্ব নিয়েই চিন্তিত। অফিসে আসতে বেণী, গোকুল, নিমাইদের বিলম্ব নিয়ে নানা হম্বিতম্বি করলেও মিস্টার কুপারের বিলম্ব নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। কুপার সাহেব যখন দেরির কারণ হিসেবে বলেন, ‘There is nothing urgent’—তখন সুপারিনটেনডেন্ট কোনো প্রতিবাদ করে না। কিন্তু গোকুলের আসতে দেরি হলে সে অভিযোগ করে। অথচ মিস্টার ফপের দেরি নিয়ে অভিযোগ তো দূর, তাকে তোষামোদ করা হয়। দেশীয়দের অপমানের অবস্থাটা এ জায়গায় দৃশ্যমান। নাটক থেকে খানিকটা উদ্ধৃত করা যায়—

গোকুল। Mr. Fop always comes late, he attends the Office at 11 o’ clock, and no words to him.

Supdt. Hold your tongue, you beast; Mr. is a Gentleman, he is not like you, he has other business to attend. (গোকুলের হস্ত ধরিয়া) Get out of the Office, you wretch.

নাটকের প্রথমার্ধে কেরানিদের এমন দুর্দশা দেখা যায়। এসব অবশ্য তাদের ঘরের মানুষ জানে না। তার পরও তারা বলে, এমন চাকরি না করাই ভালো। মানুষ কুলিগিরি করে খেলেও এর চেয়ে সম্মানের সঙ্গে থাকতে পারে। এমনকি আমরা দেখি গোকুল, প্রতাপ বা নিমাইদের দেরির কারণে অফিসে ঢুকতে না দিলেও তাদের সামনে দিয়ে কুলিদের ঢুকতে দেয়া হয়। কুলিরা সমস্বরে প্রতিবাদ করতে পারে। গতরে খাটা এসব শ্রমিক একদিন না এলে কাজ বন্ধ, নতুন শ্রমিক পাওয়াও কঠিন কিন্তু কেরানির অভাব হয় না। তাই গালাগালি শুনেও তাদের চাকরি করে যেতে হয়। এমনকি তাদের মুখের কথাতেই ভীতি প্রকাশ পায়। সুপারিনটেনডেন্টের কথার পরে গোকুল তাই বলে, ‘Excuse me Sir! I am a poor man, a family man, Sir! from tomorrow I must come early Sir!’

ইংরেজের দেশে ‘স্যার’ একটি সাধারণ সম্বোধন হলেও কেরানিদের মাধ্যমে এখানে স্যার সম্বোধনটি একটি নতুন মাত্রা পেয়েছে, যা প্রভুত্বের সমার্থক। আমাদের দেশের দাপ্তরিক কর্মচারীরা আজও স্যার বলে বলে পুরনো কেরানিগিরির ধারাটি অব্যাহত রেখেছেন। ভদ্রতা, গলা তুলে কথা না বলাই যেন কেরানিগিরির অলিখিত কোড অব কনডাক্ট হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে পারিবারিক অর্থনৈতিক জীবনে কৃচ্ছ্রসাধনই যেন একমাত্র কর্ম। এমনকি এদের অনেকেরই ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ দশায় জীবন কাটাতে হয়েছে। অবশ্য এ কথা সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। ঔপনিবেশিক আমলে কেরানিগিরির সূচনাপর্বে বহু কেরানি পয়সা কামিয়ে নিতে পারত। তবে গড়পড়তা কেরানিরা যাকে বলে সচ্ছল জীবনযাপন করতেন। তাদের টানাটানি হতো না, আবার বড় সঞ্চয়েরও সুযোগ ছিল না। কেরানি জীবনের এ তিনটি ভিন্ন ধাপের প্রতিটিই বাংলা সাহিত্যে কোনো না কোনোভাবে এসেছে। রবীন্দ্রনাথের বাঁশি (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ) কবিতা, প্রেমেন্দ্র মিত্রের ছোটগল্প শুধু কেরানী (১৯২৪ খ্রি.) ও নিমাই ভট্টাচার্যের কেরানী (১৯৬৩ খ্রি.) উপন্যাসে ভিন্ন ভিন্নভাবে কেরানিজীবন উঠে এসেছে।

রবীন্দ্রনাথের বাঁশি একটি প্রেমের কবিতা হওয়া সত্ত্বেও এখানে কেরানির খোঁজ মেলে। কবিতার সূচনা থেকে মূল চরিত্রের এক অদ্ভুত বোহেমিয়া এবং ঔদাসিন্য দেখা যায়। প্রথমত মনে হয় সে এক উদাসীন। কবিতার মূল চরিত্রের পরিচয় দিতে গিয়ে কবি লিখেছেন, ‘বেতন পঁচিশ টাকা, সদাগরি আপিসের কনিষ্ঠ কেরানি।’ রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট দেখিয়েছেন কেরানির জীবনের স্বল্প আয়ে প্রতি মুহূর্তে কৃচ্ছ সাধনের চেষ্টা চলে। একই রকম অবস্থা দেখা যায় প্রেমেন্দ্র মিত্রের শুধু কেরানী গল্পে। বলে রাখা ভালো গল্পটা একাধারে বাস্তব সত্য যেমন দেখায়, তেমনি পারিবারিক আবহের মিষ্টি একটি গল্প। তরুণ এক কেরানির চাকরিজীবন না দেখিয়েও তার সংসার এবং দাম্পত্যের মধ্য দিয়ে কেরানির জীবন দেখিয়েছেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। কেরানির জীবনেও প্রেম থাকে, ভালোবাসা থাকে।

একদিন ছেলেটি ট্রামের পয়সা বাঁচিয়ে হেঁটে এল। সেই পয়সায় রাস্তার মোড়ে একটি গোড়ের মালা কিনলে। ঘরে এসে হঠাৎ মেয়েটির খোঁপায় জড়িয়ে দিয়ে বললে, ‘বলো দেখি কেমন গন্ধ?’ মেয়েটি বিস্মিত আনন্দে মালা দেখতে দেখতে একটু ক্ষুণ্ন স্বরে বললে, ‘কেন আবার তুমি বাজে পয়সা খরচ করতে গেলে বলোত?’ ছেলেটি বললে, ‘বাজে পয়সা খরচ বুঝি! ট্রামের পয়সা আজ বাঁচিয়ে তাইতে কিনেছি—কেরানির দাম্পত্যের পাশাপাশি কৃচ্ছ্র সাধনের এমন বর্ণনাই দিয়েছেন প্রেমেন্দ্র। এর প্রায় ৪০ বছর পর নিমাই ভট্টাচার্যও তার উপন্যাসে কেরানির দাম্পত্যের প্রায় একই বর্ণনা দেন। তার উপন্যাসের চরিত্র সোমনাথ সরকারও তরুণ কেরানি। স্ত্রী গঙ্গার সঙ্গে তার সচ্ছল সংসার। সোমনাথের সংসারে অভাবের কোনো চিত্র নেই বরং উত্তম পুরুষে রচিত এ উপন্যাসে সোমনাথের বয়ানে লেখক আমাদের জানান যে কেরানিগিরি করেও বিস্তর পয়সা কামানো সম্ভব। সোমনাথের পূর্বপুরুষই কামিয়েছে ঢের।

কিন্তু সোমনাথ অঢেল কামাতে পারেনি। প্রেমেন্দ্র মিত্রের শুধু কেরানীও পারেনি। আর পারেনি বলেই ছেলেটির স্ত্রী সূতিকা রোগে আক্রান্ত হলে তিলে তিলে শেষ হয়েছিল সবকিছু। কেরানির পক্ষে বিস্তর অর্থ সঞ্চয়ে রাখা সম্ভব হয় না। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় ‘সদাগরি আপিসের কনিষ্ঠ কেরানি’টি কিনু গোয়ালার গলিতে লোনা ধরা দেয়ালের এক সস্তা ঘরে বসবাস করে। হরিপদের চাকরি সম্পর্কে এটুকু জানার আগেই আমরা দেখি অবিবাহিত এ কেরানি রেলস্টেশনে সন্ধ্যা কাটিয়ে ঘরের আলোর খরচ বাঁচায়। তার খাওয়া জোটে টিউশনির বাড়িতে। এমনই জীবন কেরানির।

নিমাই ভট্টাচার্যের বইটি ক্ষুদ্রায়তন উপন্যাস হলেও সেখানে সোমনাথ ও তার পারিপার্শ্বিকতার মধ্য দিয়ে কেবল একজন কেরানির বাইরে গিয়ে বৃহত্তর কেরানি সমাজ ও তাদের সঙ্গে জড়িত সব শ্রেণীর মানুষের জীবন দেখানো সম্ভব হয়েছে। এ লেখায় সবকিছুর উল্লেখ অপ্রয়োজনীয় এবং স্থানাভাবও একটি কারণ। তবে ‘কেরাণী দর্পণ’, ‘শুধু কেরানী’ এবং ‘কেরানী’তে আমরা উনিশ ও বিশ শতকের কেরানিদের জীবনাচরণ দেখতে পাই। কিছু সাধারণ বিষয় তিনটি রচনাতেই পাওয়া যায়। যেমন কেরানিগিরির যতই সমালোচনা করা হোক, এ পেশা গ্রহণ করার মতো লোকের অভাব নেই। কারণ তারা চাষবাস জানে না, ব্যবসা করার সাহস নেই। এছাড়া এদের মধ্যে সৃষ্টিশীলতা নেই। সোমনাথ চালাক-চতুর মানুষ, রসজ্ঞ হলেও তার পরিণতি শেষ অবধি ভালো হয় না। কেরাণী দর্পণ-এর কেরানিরা এক দফা প্রতিবাদ করলেও শেষ অবধি দেখি গোকুলের দুরবস্থা। সোমনাথের স্ত্রীর পলায়ন, ‘শুধু কেরানী’ গল্পে মেয়েটির মৃত্যু আর বাঁশি কবিতার হরিপদ তার মরবিড ফিলোসফি নিয়ে ঢাকাই শাড়ি পরা মেয়েটিকে ঘরে আনার সাহসই পেল না। প্রচলিত আছে বাংলার কেরানিদের সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা, সাহসের অভাব।

অবশ্য এ কথা অনেকেই ভুল প্রমাণ করেছেন। তারাও সাহিত্যেরই মানুষ। কেউ কেউ শিল্পী। বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রেঙ্গুনে রেলের কেরানিগিরি করেছেন। তার সাহস, বোহেমিয়া কোনোটিরই অভাব ছিল না। রবীন্দ্রসংগীতের বিখ্যাত শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাস এক জীবনে ইন্স্যুরেন্স অফিসের কেরানি ছিলেন। ১৯৩৫ সালে হিন্দুস্তান ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে ৫০ টাকা বেতনে কেরানির কাজ করেছেন। শংকর নামে পরিচিত মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায় জুট ব্রোকারের অফিসে কেরানির কাজ করেছেন। বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনের বহু সাহিত্যিক এক জীবনে কখনো না কখনো কেরানির কাজ করেছেন। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ প্রথম জীবনে চট্টগ্রামে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে কেরানির চাকরি করেছেন। সীমানা পেরিয়ে গেলে চার্লস ডিকেন্স ‘টুইডি অ্যান্ড প্রিডিউক্স’ নামে ল ফার্মে কেরানিগিরি করেছেন। আইরিশ সাহিত্যিক ও চিন্তক জর্জ বার্নার্ড শ’ ১৮৭১ সালে ডাবলিনে জমি কেনাবেচার একটি প্রতিষ্ঠানে জুনিয়র ক্লার্ক (রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘কনিষ্ঠ কেরানি’) হিসেবে চাকরি নেন। কাফকার জীবনেও ল ফার্মে কেরানিগির রেকর্ড আছে। লয়েড ব্যাংক অব লন্ডনে আট বছর কেরানির চাকরি করেছেন টিএস এলিয়ট। ফরাসি ঔপন্যাসিক এমিল জোলা ছিলেন শুল্ক বিভাগের কেরানি।

বাংলা ও বাংলার বাইরের এ সাহিত্যিকরা তাদের সাহিত্যকর্মের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। বলা যায় কেরানিকূলের সম্মান তারা বাঁচিয়েছিলেন। সম্মান বাঁচানোর কথাই যখন এল, প্রশ্ন ওঠে দুর্নামটা কোথায়? কিংবা দুর্নামটা পৃথিবীব্যাপী একই রকম কিনা? প্রথম প্রশ্নের উত্তর আসলে এ লেখায় আগেই দেয়া হয়েছে। শেষেরটির উত্তর হলো, কেরানি চরিত্র এবং তাদের রূপ পৃথিবীব্যাপী একই রকম। এ প্রসঙ্গে রুশ লেখক আন্তন চেখভের ‘কেরানির মৃত্যু’ স্মরণ করা যায়। ইভান দমিত্রিচ চেরভিয়াকভ নামে যে কেরানির কথা চেখভ লিখেছেন তিনি একজন ‘নামকরা কেরানি’। কিন্তু নামকরা হলেও এমনই তার কেরানি-মানস যে নাটক দেখতে গিয়ে হাঁচি দিয়ে সামনে ওপরওয়ালাকে দেখতে পেয়ে বারবার ক্ষমা চাইতে হয়। ক্ষমা চাওয়ার এ প্রবণতা তার মধ্যে বহুদিনের কেরানি-মানস থেকে জন্মেছে। ঠিক পদলেহি নয় কিন্তু কেরানিদের বরাবরই কুঁকড়ে থাকতে হয়, গল্পের এটিই কথা। চেখভের গল্পটি প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্পটির মতোই স্বল্পায়তন কিন্তু মিত্র যে করুণ রস দিয়েছেন, চেখভ সেখানে গল্পটা স্যাটায়ারের মাধ্যমে বলেছেন। ইভান দমিত্রিচের কুণ্ঠিত ভাবের সঙ্গে সৈয়দ শামসুল হকের ‘কেরানিও দৌড়েছিল’র কেরানির সদাবিব্রত ভাবটির মিল পাওয়া যায়।

কেরানিদের নিয়ে এ ধরনের গল্প বলা বা দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি অনেকে সমালোচনা করেন। শ্রেণীবৈষম্যের কারণে লেখকরা এমন দৃষ্টি দিয়ে থাকেন বলে অনেকের মত। কিন্তু মূলত তারা ওই শ্রেণীকে নয় বরং ওই পেশায় থাকা লোকদের মানসিকতার সমালোচনা বা বিদ্রুপ করেছেন। ইএম ফরস্টারের হাওয়ার্ডস এন্ড (১৯১০)-এ লিওনার্ড বাস্ট নামে যে চরিত্রের দেখা পাই তার সঙ্গে দমিত্রিচ, সোমনাথ, গোকুলদের মিল আছে। অর্থাৎ ব্রিটেন, রাশিয়া থেকে অবিভক্ত বাংলা এমনকি বর্তমান বাংলাদেশের কেরানিদেরও ভেদ নেই। এদের মধ্যে একমাত্র রবীন্দ্রনাথের হরিপদ ভিন্ন। মরবিড হলেও সে মিডিওকোর নয়। ক্ষয়ে যাওয়ার আগেই সে নিজেকে সবকিছু থেকে বিচ্যুত করেছিল। আদতে কেরানিরা এমন হয় না। দিনের পর দিন তারা মিডিওকোর জীবনযাপন করে যায়। তাদের সঙ্গে তাদের পরিবারও সে জীবনযাপনে বাধ্য হয়। এ প্রসঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেরানির বউ ছোটগল্পটির কথা উল্লেখ করা যায়। কেরানি রাসবিহারীর কারণে তার স্ত্রীর জীবন কীভাবে ঘেরাটোপে কাটে তা তিনি দেখিয়েছেন। গল্পটি মূলত কেরানির স্ত্রী তথা নারীকে নিয়ে রচিত কিন্তু সেখানে অল্প কয়েকটি লাইনে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একজন কেরানির মানসিকতা দেখিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘রাসবিহারীর সাইজ মাঝারি, চেহারা মাঝারি, বিদ্যা মাঝারি, বুদ্ধি মাঝারি। যাকে বলে মধ্যবর্তী, তাই।’ এখানে রাসবিহারী বা কেরানিকে অপমান করা হয়নি বরং তাদের অবস্থা ও গণ্ডি বোঝানো হয়েছে।

বর্তমান লেখায় এক জীবনে কেরানি থাকা যে লেখকদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তারা কেরানিগিরি ছেড়েছিলেন, লেখা হয়েছিল মূল পেশা। কিন্তু এমন অনেক বই রয়েছে যেগুলো খোদ কেরানিরা লিখেছিলেন। ১৮৭৮ সালের বই The Loosed Interval: A Holiday Handbook and Out-of-Harness Annual ব্যাংকের কেরানি কর্তৃক; The Story of a London Clerk: A Faithful Narrative Faithfully Told কোনো এক কেরানি কর্তৃক বেনামে লেখা হয়। আর্নল্ড বেনেটের ১৮৯৮ সালের A Man from the North কেরানি জীবনের কথাই বলে। তিনি নিজে একজন কেরানি ছিলেন। প্রতিটি বইতে কেরানির জীবনের নিস্তরঙ্গতা এবং সংগ্রামের প্রমাণ পাওয়া যায়। The Story of a London Clerk-এর চরিত্র অসমন্ড ওরমসবির ভাষায়—‘কবির মানস আর রঙিন চশমা দিয়ে দেখা জীবনের তুলনায় বাস্তবের সাধারণ জীবন বড় ভিন্ন; জীবনের সত্যিকার রূপ দেখা যায় জীবনের রোজকার দায়িত্বে।’

বস্তুত, আকবর বাদশার সঙ্গে হরিপদ কেরানির (বাঁশি) বহু ভেদ থাকলেও জগেজাড়া কেরানি-জীবনে কোনো ভেদ নেই।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button