ইতিহাস-ঐতিহ্য

রাজনীতির মহাগ্রন্থ ‘দ্য প্রিন্স’ কেন আজও প্রাসঙ্গিক?

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ২০১৩ সালে ম্যাকিয়াভেলির ক্ল্যাসিক দ্য প্রিন্স রচনার ৫০০ বছর পূর্ণ হয়। সে বছর পুলিত্জারজয়ী লেখক জারেড ডায়মন্ডকে নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে বলা হয়েছিল, প্রেসিডেন্ট ওবামাকে যদি কোনো বই পড়তে পরামর্শ দিতে বলা হয়; তাহলে তিনি কোন বইয়ের নাম নেবেন। জারেডের জবাব ছিল—নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির দ্য প্রিন্স।

জারেড ডায়মন্ড ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, ‘ম্যাকিয়াভেলিকে আজকাল অনৈতিক নিষ্ঠুর এক মস্তিষ্ক বলে সমালোচনা করা হয়, যিনি লক্ষ্য পূরণে যেকোনো পথ অবলম্বনকেই সমর্থন করেছেন। কিন্তু সত্যি কথা হলো তিনি ছিলেন বাস্তববাদী মানুষ, যিনি ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ও ব্যবহার দুটিই বুঝতেন।’ জারেড মনে করেন এ যুগের রাজনীতিকদের অবশ্যই প্রিন্স পড়া উচিত কারণ ম্যাকিয়াভেলি স্পষ্ট করে গেছেন, আমরা দুর্ভাগ্যের সামনে অসহায় নই।

ম্যাকিয়াভেলি তার উদ্দেশ্য গোপন করেননি। তিনি শাসকদের পথ দেখিয়েছেন কীভাবে এ দুনিয়ায় ক্ষমতা ধরে রাখতে হবে—কার্ল মার্ক্সের মতো দুনিয়াকে বদলানো তার উদ্দেশ্য নয়। দুনিয়াটা কেমন হওয়া উচিত সে রকম কোনো ইউটোপিয়ার বোঝাও তিনি মাথায় নেননি। ম্যাকিয়াভেলি প্রথম স্পষ্ট করে দিলেন রাজনীতি কোনো নৈতিকতার শাস্ত্র নয়। এ এক ভিন্ন কুরুক্ষেত্র। যুদ্ধই এখানে নিয়ম।

প্রকাশের পর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দ্য প্রিন্সকে নানাজন নানাভাবে মর্মোদ্ধার করেছেন। ১৫৩৯ সালে কার্ডিনাল রেজিনাল্ড পোল লিখেছিলেন, দ্য প্রিন্স খোদ শয়তানের হাতে লেখা। অবশ্য অষ্টাদশ শতকে এসে রুশো বললেন ভিন্ন কথা। তিনি বললেন, যুবরাজদের পরামর্শ দেয়ার ছদ্মবেশে ম্যাকিয়াভেলি প্রকৃতপক্ষে জনগণকে শিক্ষা দিয়েছেন যে কীভাবে প্রজাতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হবে। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অনেকে বলেছেন, ম্যাকিয়াভেলি এখন থাকলে নািস পার্টির সঙ্গে জুড়ে যেতেন। মানে প্রত্যেক যুগেই মানুষ নানাভাবে দ্য প্রিন্সকে মূল্যায়ন করেছে। সবাই নিজেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণভাবে এসব মূল্যায়ন করেছেন।

ফুকো যেমন দেখিয়েছেন আধুনিক যুগে এসে রাষ্ট্র সহিংসতাকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চোখের আড়ালে নিয়ে গেছে, যেটা মধ্য যুগে ছিল অনেকটাই প্রকাশ্যে। সহিংসতা কিন্তু কমেনি। তেমনি নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি ৫০০ বছর আগে যা বলে গেছেন তা পড়তে গেলে মনে হয় এ কী অনৈতিক, ভয়ানক সব কথা! কিন্তু বিশ্ব রাজনীতির দিকে তাকালে খুব একটা ভিন্নতা কিন্তু চোখে পড়ে না। অনেকে তো বলেন, ম্যাকিয়াভেলির আমলের চেয়ে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও মানুষের দুর্দশা আজকের দিনে কমেনি বরং বেড়েছে।

বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক জেমস জনসন বহু দিন শিক্ষার্থীদের দ্য প্রিন্স নিয়ে পড়িয়েছেন। তিনি বলেন, প্রিন্সে অনেক নিষ্ঠুর ধারণার দেখা পাওয়া যাবে। কাউকে আঘাত করলে এমনভাবে করতে হবে সে যেন আর প্রতিশোধ নেয়ার উপযুক্ত না থাকে। কিছু শত্রু পালন করতে হবে যেন দরকার মতো তাদের প্রকাশ্যে দমন করে অন্যদের ভয় দেখানোর ব্যবস্থা করা যায়। অন্যের ভূমি জবরদখল করে নেয়াটাও স্বাভাবিক ঘটনাই। এসব নীতির কথা শুনলে হয়তো আমরা শিউরে উঠব কিন্তু জনসনের প্রশ্ন, এসব নিষ্ঠুরতা করতে কি মানুষকে প্রিন্স পড়তে হয়? একেবারেই না, বরং প্রিন্স গত ৫০০ বছর ধরে রাজনীতি ও নৈতিকতার এসব অস্বস্তিকর প্রশ্নকে অগণিত পাঠকের সামনে উন্মুক্ত করেছে।

জনসন তার শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, এখনকার শিক্ষার্থীরা এ বইতে চমকে ওঠার মতো কিছু খুঁজে পান না। তার ম্যাকিয়াভেলিয়ান নীতিকে স্বাভাবিকই মনে করেন। তাদের মধ্যে বইটিতে উল্লেখিত কোনো কোনো নীতি বিষয়ে ক্ষোভ জাগাতে রীতিমতো পরিশ্রম করতে হয় তাকে।

জনসনের মতে, প্রকাশনার সময় দ্য প্রিন্স ছিল একটি অভিনব ঘটনা, প্রথা ভাঙা রচনা। সে সময় রাজরাজড়াদের জন্য রচিত এমন গ্রন্থগুলো হতো ভাষার অলংকারে তেলতেলে, খ্রিস্টীয় ধর্মমত অনুসারে নির্ধারিত হতো নৈতিকতা। কিন্তু দ্য প্রিন্স প্রকাশের মাধ্যমে সে ঐতিহ্য ভেঙে দেন ম্যাকিয়াভেলি। তিনি নিয়ে আসেন ইতিহাসের হাতুড়ি। আর তা দিয়ে পিটিয়ে পোক্ত করেন তার যত মতামত। স্পষ্ট করেই বলেন, বর্তমান বাস্তবতা অস্বীকার করে যিনি কোনো আদর্শের জন্য জন্য বেঁচে থাকেন, তাহলে তিনি একসময় আবিষ্কার করবেন যে তাকে শিক্ষা দেয়া হয়েছে নিজেকে বরবাদ করার।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক স্টেইন রিংগেন দ্য প্রিন্সের প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব তুলে ধরেছেন একটু ভিন্নভাবে। তিনি বলছেন, স্পষ্টতই দেখা যাবে দুনিয়ায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ক্ষয় ধরেছে। যুক্তরাষ্ট্র কিংবা যুক্তরাজ্যের মতো দেশেও শাসনযন্ত্র ঠিকভাবে কাজ করছে না, দুর্বল হয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানও। রাজনীতিবিমুখতাও বাড়ছে সমানতালে। অন্যদিকে উত্থান হয়েছে রাশিয়া ও চীনের মতো একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার। উন্নয়ন ও শক্তিশালী নেতৃত্বের কিংবদন্তি তৈরি হয়েছে এসব দেশকে ঘিরে। গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও এমন স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে দ্য প্রিন্সকে স্মরণ করে স্টেইন লিখছেন, ‘আপনি যখন দ্য প্রিন্স পড়বেন তখন এটা মনে করিয়ে দেবে যে একটা ভালো সরকারের প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে কার্যকর সরকার। আমাদের আজকের দিনে বুঝতে হবে যে এটা গণতান্ত্রিক সরকার থেকে শুরু করে যেকোনো সরকার ব্যবস্থার জন্যই সত্য। কারণ গণতন্ত্রের উদ্দেশ্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা নয় বরং একটা কার্যকর ও নিরাপদ সরকার তৈরি করা।’

বহুল আলোচিত একটা কথা আছে এ রকম—ভারতের জন্য যিনি চাণক্য, ইউরোপের জ্ঞানচর্চায় তিনি ম্যাকিয়াভেলি। সরকার কিংবা ক্ষমতা মোটেই কোনো নৈতিক বিষয় নয়, বরং সবটাই কৌশল। যুদ্ধ কিংবা রাজনীতিতে ভালো-মন্দ কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়, জয়টাই মুখ্য। এ যেন নিটশের সেই বিখ্যাত বইয়ের শিরোনাম—বিয়ন্ড গুড অ্যান্ড ইভল। সবকিছুই বিজয়ের লক্ষ্যে চালিত—এজন্য চাই পিঠে ছুরি মারা কিংবা ছলনা সবকিছুই জায়েজ! দুনিয়াটা এমনই। জোর গলায় আমার অস্বীকারই বা করি কীভাবে?

১৫১৩ সালে ম্যাকিয়াভেলি ফ্লোরেন্সের অভিজাত বংশ মেডিসির এক যুবরাজের জন্য লিখেছিলেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য প্রিন্স। এটাই তার সবচেয়ে আলোচিত কাজ। তবে এর বাইরে তিনি শাসকদের উদ্দেশ করে আরো একটি রাজনৈতিক রচনা লিখেছিলেন যার নাম ডিসকোর্সেস।

দ্য প্রিন্স কি আজও প্রাসঙ্গিক—এমন প্রশ্ন মাঝেসাঝেই ওঠে। এ প্রশ্নের জবাব সরাসরি হ্যাঁ কিংবা না দিয়ে দেয়াটা কঠিন। রাজনীতিতে যদি নীতি দেখতে চান তাহলে নিঃসন্দেহে প্রিন্স এক কেলেঙ্কারি। আর মুখে কেউ অস্বীকার করবেন না যে রাজনীতিতে নৈতিকতা প্রয়োজন। কিন্তু মুশকিল হলো অনৈতিক চর্চা ছাড়া রাজনীতির কোনো অস্তিত্ব নেই। এটা নিদারুণ সত্য আর এ কারণেই ম্যাকিয়াভেলিকে অর্ধ সহস্রাব্দ পরেও মানুষ আগ্রহ নিয়ে পড়ে।

ম্যাকিয়াভেলি বলেন, মৈত্রি মানে মিত্র, এখানে বন্ধুত্ব জরুরি নয়। প্রতিপক্ষ কেবলই প্রতিপক্ষ, তাকে শত্রু গণ্য করতে হবে এমন নয়। রাজনীতিটা করতে হবে দাবা খেলার মতো করে। কৌশলে একেবারে স্বার্থপর হতে হবে। সুনাম আছে শক্তি নেই—এমন শাসকের সঙ্গে মৈত্রী করা বিপদের। এতে সুনাম আসতে পারে কিন্তু বিপদে প্রতিরক্ষা তৈরি হবে না।

ইউরোপের প্রাচীন ইতিহাস ও সাহিত্যে ছিল ম্যাকিয়াভেলির প্রগাঢ় জ্ঞান। প্রাচীন গ্রিস ও রোমের ইতিহাস মূল্যায়ন করে তিনি তার সিদ্ধান্ত টেনেছিলেন। চাণক্য ও ম্যাকিয়াভেলির মধ্যে সময়ের ব্যবধান প্রায় ১৫০০ বছর। দুজনই রাষ্ট্রযন্ত্রের কৌশলকে নৈতিকতার চর্চা থেকে দূরে রেখেছেন। এখানে উদ্দেশ্য সাধনই মুখ্য। এখানে অবশ্য একটি কৌতূহলের সূত্র আছে। চাণক্য কেন ম্যাকিয়াভেলির অগ্রদূত ছিলেন? সে সময় ভারতবর্ষের রাজনীতি ও শাসকদের চরিত্রে নিশ্চয়ই এমন কিছু ছিল যার পরিপ্রেক্ষিতে চাণক্য রচনা করেছিলেন তার অর্থশাস্ত্র।

ইউরোপ তথা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে ধারণা থাকা মানুষ হরহামেশাই বলে ওঠেন—এটা তো ‘ম্যাকিয়াভেলিয়ান’—মানে শঠতা, প্রতারণা। এমনকি অভিধানেও এ বিশেষণের অর্থ রাজনীতিতে ধূর্ততা, ষড়যন্ত্র ও বিবেকহীনতা। এসব নিয়ে ম্যাকিয়াভেলি নিশ্চয়ই সচেতন ছিলেন। নীতিভরা এসব সমালোচনা যে হবে তা তার অজানা নয়। মুখে মুচকি হাসি নিয়েই হয়তো তিনি এসব সমালোচনা শুনতেন আর বড়জোর বলতেন—একবার দুনিয়ায় চেয়ে দেখ, রাজনীতিতে কোথায় নৈতিকতা আছে? চাণক্যও নিশ্চয়ই ম্যাকিয়াভেলিকে সমর্থন করতেন।

এ বছরের ৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটলে হামলা চালায় সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকরা। সে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। ঘটনার কয়েকদিন পরেই লিটহাবের অ্যান্ড্রু কিন সাক্ষাত্কার নেন ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও ম্যাকিয়াভেলি: হিজ লাইফ অ্যান্ড টাইম গ্রন্থের লেখক আলেকজান্ডার লির। সমালোচনা সত্ত্বেও লি বলেন, নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের উচিত ম্যাকিয়াভেলিতে মনোযোগ দেয়া। ক্যাপিটলে হামলা যেন ম্যাকিয়াভেলির আমলে ফ্লোরেন্সের ভঙ্গুর দশার কথা স্মরণ করাচ্ছে। তাই দরকার দৃঢ় নেতা যিনি রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে পারবেন।

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button