আন্তর্জাতিকআলোচিত

প্যান্ডোরা পেপারস: গোপন সম্পদের কারবার ফাঁসে মর্যাদার সংকটে রথী-মহারথীরা

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক : প্যান্ডোরা বাক্স রহস্যময় গোপনীয়তার ধারক হিসেবে পরিচিত। সেই প্যান্ডোরার যাবতীয় গোপনীয় কারবার বিশ্বের সামনে উন্মোচন করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের দল ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে)। প্রায় ১২ মিলিয়ন গোপন নথি প্রকাশের ফলে দেশে দেশে নতুন করে আলোচনায় বিভিন্ন দেশের সাবেক-বর্তমান রাজা-বাদশা, প্রধানমন্ত্রী অথবা প্রেসিডেন্ট, ব্যবসায়ী, খেলোয়াড়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি রয়েছেন। সামনে এসেছে বিশ্বের ক্ষমতাবান ও ধনীদের অর্থ পাচার, কর ফাঁকি ও গোপন সম্পদের তথ্য। ১৪টি উৎস থেকে প্রাপ্ত দুই টেরাবাইটের বেশি নথি পর্যালোচনা করেন ১১৭টি দেশের ছয় শতাধিক সাংবাদিক। এতে সাবেক-বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান ৩৫ জনসহ ৯০টি দেশের ৩৩০ জনের বেশি রাজনীতিবিদ তাদের গোপন সম্পদ সুরক্ষিত রাখতে অফশোর কোম্পানি শরণাপন্ন হয়েছেন। বলা হচ্ছে, এখন পর্যন্ত উন্মোচিত গোপন নথি প্রকাশের ঘটনায় এটিই সবচেয়ে বড়।

প্যান্ডোরা পেপারসে গোপন সম্পদের নথি রয়েছে জর্ডানের বাদশা, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন, ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, পাকিস্তানের শরিফ ও ইমরান খান পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা, কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট, ভারতের কয়েকজন ব্যবসায়ী, কিংবদন্তি ক্রিকেটার শচীন টেন্ডুলকার ও ম্যানচেস্টার সিটি কোচ পেপ গার্দিওলাসহ অনেকের।

তবে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন জর্ডানের বাদশা দ্বিতীয় আব্দুল্লাহ বিন হুসাইন। বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, প্যান্ডোরা পেপারসের নথিতে আব্দুল্লাহ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে ১০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ গড়েছেন। ১৯৯৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১৫টি বিলাসবহুল বাড়ি কিনেছেন তিনি। এজন্য ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডের অফশোর কোম্পানিগুলোর নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেছেন জর্ডানের বাদশা। এর মধ্যে মালিবু, ক্যালিফোর্নিয়া ও লন্ডনে রয়েছে ৫ কোটি ৭০ লাখ ডলারের সম্পত্তি। বাদশাহ দ্বিতীয় আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে বেশ কিছুদিন ধরে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার অভিযোগ উঠছে। এজন্য প্রতিবাদ বিক্ষোভও হয়েছে। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় তিনি দেশের বাইরে এ বিপুল সম্পদ গড়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়ায় জর্ডান থেকে আইসিআইজের ওয়েবসাইটের ইউআরএল ব্লক করে দেয়ার অভিযোগ ওঠে।

এদিকে তালিকায় রয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও। মোনাকোয় তিনি বান্ধবীকে দিয়েছেন বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। ২০০৩ সালে এ গোপন আর্থিক লেনদেন করেন তিনি। তবে এ ব্যাপারে কোনো সংবাদ ছাপেনি দেশটির সংবাদমাধ্যম।

প্যান্ডোরার নথি বলছে, ব্রিটিশ সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ও তার স্ত্রী ৩ লাখ ১২ হাজার পাউন্ড কর ফাঁকি দিয়ে লন্ডনে ভবন কিনেছিলেন। অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে কেনার কারণে এ পরিমাণ কর দিতে হয়নি ব্লেয়ার দম্পতিকে। এ ব্যাপারে গার্ডিয়ানকে দেয়া সাক্ষাত্কারে চেরি ব্লেয়ার দাবি করেছেন, অস্বাভাবিক কোনো লেনদেন হয়নি।

পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে, দেশটির ৭০০ জনের তালিকায় প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মন্ত্রিসভার সদস্যসহ ঘনিষ্ঠজনেরা রয়েছেন। এ তালিকায় অর্থমন্ত্রী শওকত তারিন ও তার পরিবার, পানিসম্পদমন্ত্রী মুনিস এলাহী, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের সিইও, মিডিয়া মোগল জং গ্রুপের প্রকাশক, ডনের সিইও, সেনা কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারসহ অন্তত ২৯ জনের নাম রয়েছে। টুইট বার্তায় পেপারসে নাম আসা ব্যক্তিদের ব্যাপারে তদন্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তবে এক প্রতিক্রিয়ায় ইমরান খানের পদত্যাগ দাবি করেছেন বিরোধী দল পাকিস্তান মুসলিম লিগের মহাসচিব আহসান ইকবাল।

আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলীয়েভের ১১ বছর বয়সী ছেলে হায়দার আলীয়েভের নামে গোপনে যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে ৩ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ডের বিনিময়ে একটি ভবন কেনা হয় অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে। পেপারসের নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯ সালে এক বন্ধুর মাধ্যমে ছেলের জন্য ওই ভবন কেনেন ইলহাম।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বড় নেতাদের পাশাপাশি ছোট দেশ কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উহুরু কেনিয়াত্তার সম্পদের গোপন তথ্য ফাঁস করেছে প্যান্ডোরা পেপারস। খবরে বলা হয়, পূর্ব আফ্রিকার দেশ কেনিয়ার স্বাধীনতার পর থেকে রাজনীতিতে উহুরু কেনিয়াত্তা ও তার পরিবারের আধিপত্য রয়েছে। কেনিয়াত্তা ও তার পরিবারের ছয় সদস্য ১৩টি অফশোর কোম্পানির মালিক বা এর সঙ্গে যুক্ত।

এ ব্যাপারে তাদের মন্তব্য জানার চেষ্টা করে বিবিসি। তবে উহুরু কেনিয়াত্তা বা তার পরিবারের কেউ সাড়া দেননি।

পেপারসে বলা হয়েছে, অফশোর কোম্পানিগুলোতে উহুরু কেনিয়াত্তা প্রায় ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছেন। ২০০৩ সালে পানামায় ভ্যারিস নামে একটি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা হয়, যার প্রথম পৃষ্ঠপোষক কেনিয়াত্তার মা ৮৮ বছর বয়সী নিনা। কেনিয়াত্তা ফাউন্ডেশনটির দ্বিতীয় পৃষ্ঠপোষক ও মায়ের মৃত্যুর পর তিনিই এর একমাত্র উত্তরাধিকারী হবেন। বিবিসি বলছে, এ ফাউন্ডেশনের উদ্দেশ্য ও সম্পদের মূল্য সম্পর্কে জানা যায়নি।

নাম আসা চিলির প্রেসিডেন্ট সেবাস্তিয়ান পিয়েরাও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন।

সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে কোনো ধরনের অবৈধ কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেছেন পেপারসের নথি প্রকাশ হওয়া চেক প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ বাবিস।

ভারতের শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানির ভাই অনিল আম্বানির নামও আছে প্যান্ডোরা পেপারসে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে লন্ডনের আদালত তাকে দেউলিয়া ঘোষণা করেন। কারণ চীনের তিনটি ব্যাংকের দায়ের করা মামলার শুনানিতে আদালতে তিনি দাবি করেন, তার সম্পদের পরিমাণ শূন্যে নেমে এসেছে। অনিল আম্বানি জানান, বিদেশে তার কোনো সম্পদ নেই।

রোববার প্রকাশিত প্যান্ডোরা পেপারস এবার বলছে অন্য কথা। রিলায়েন্স এডিএ গ্রুপের চেয়ারম্যান অনিল আম্বানি ও তার পক্ষের লোকজনের মালিকানায় জার্সি, ভার্জিন আইল্যান্ড ও সাইপ্রাসে অন্তত ১৮টি অফশোর কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি কোম্পানির ১৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ ও ঋণ রয়েছে। এগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০০৭-১০-এর মধ্যে। জার্সিতে ব্যাটিস্টে আনলিমিটেড, রেডিয়াম আনলিমিটেড ও হুই ইনভেস্টমেন্ট আনলিমিটেড নামে ২০০৭-০৮ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত তিনটি কোম্পানি রয়েছে।

এসব গোপন আর্থিক লেনদেন ও সম্পদ সম্পর্কে অনিল আম্বানির আইনজীবী জানিয়েছেন, ভারতের একজন করদাতা অনিল আম্বানি। তিনি ভারতীয় আইন মেনেই ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। প্রতিষ্ঠানটির যাবতীয় ব্যবসা বৈধ।

আইসিআইজের ফাঁস করা প্যান্ডোরা পেপারসে নাম এসেছে ভারতীয় ক্রিকেট কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকার ও ফুটবল কোচ পেপ গার্দিওলার।

২০১৩ সালে ক্রিকেট থেকে অবসর নেয়ার পর ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন শচীন টেন্ডুলকার। যে কারণে পলিটিক্যাল এক্সপোসড পারসনের (পিইপি) এক রেজিস্ট্রিতে তার নাম উচ্চঝুঁকির তালিকায় রাখা হয়েছে।

ফাঁস হওয়া প্যান্ডোরা পেপারসে শচীনের স্ত্রী অঞ্জলি টেন্ডুলকার ও শ্বশুর আনন্দ মেহতার নামও রয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডের একটি প্রতিষ্ঠানে গোপনে বিনিয়োগ করেছিল শচীনের পরিবার। প্যান্ডোরা পেপারসের নথিতে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে বিনিয়োগের টাকা তুলে নিয়েছেন শচীন ও তার পরিবার।

আইসিআইজে প্রকাশিত প্যান্ডোরা পেপারসে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডের প্রতিষ্ঠানে শচীন টেন্ডুলকারের শেয়ার ছিল নয়টি। তার স্ত্রী অঞ্জলির ১৪ ও আনন্দ মেহতার পাঁচটি শেয়ার ছিল।

শচীনের শেয়ারের মূল্য ছিল ৮ লাখ ৫৬ হাজার ৭০২ ডলার। এছাড়া তার স্ত্রী অঞ্জলির ১৩ লাখ ৭৫ হাজার ৭১৪ ডলারের শেয়ার ছিল। তার বাবা আনন্দ মেহতার শেয়ার ছিল ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৮২ মার্কিন ডলার মূল্যের।

ভারতীয় কিংবদন্তি এ ক্রিকেটারের বিদেশী বিনিয়োগের কথা স্বীকার করেছেন তার আইনজীবী। তিনি বলেন, শচীনের কোনো বিনিয়োগ গোপন নয়। প্রতিটি বিনিয়োগই বৈধ এবং তা কর কর্তৃপক্ষ অবগত।

শচীনের পাশাপাশি প্যান্ডোরা পেপারসে নাম এসেছে কোচ পেপ গার্দিওলার নামও। এতে বলা হয়েছে, তিনি অ্যান্ডোরার একটি অঘোষিত অ্যাকাউন্টে ৫ লাখ ইউরো গোপন করেছিলেন। স্প্যানিশ ট্যাক্স এজেন্সির কর্মকর্তা ক্রিস্টোবল মন্টোরো কর্তৃক তার ১০ শতাংশ কর ধার্য ছিল।

লা সেক্সটা ও এল পাইসের মতে, গার্দিওলা ২০১২ সাল পর্যন্ত অ্যান্ডোরার ওই অ্যাকাউন্ট চালু রেখেছিলেন। এক্ষেত্রে তিনি মারিয়ানো রাজ্য সরকার কর্তৃক তার আর্থিক পরিস্থিতি নিয়মিত করার জন্য চালু করা কর ক্ষমার সুবিধা গ্রহণ করেছিলেন। এ সময় পর্যন্ত তিনি স্প্যানিশ ট্যাক্স এজেন্সিকে কোনো হিসাব দেননি।

গার্দিওলার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, তার অ্যাকাউন্টটি ব্যাঙ্কা প্রিভাদা ডি’অন্দোরার অন্তর্গত। ২০০৩-০৫ সাল পর্যন্ত সৌদি ফুটবল ক্লাব আল-আহলি থেকে বেতনও নিয়েছেন তিনি। এ ব্যাপারে গার্দিওলা বলেন, আমি বিশ্বাস করি, ফার্নান্দেজ ডিয়াজ কিছু ভুল করেছেন। আমি প্রথম দিন থেকে শেষ পর্যন্ত কর দিয়েছি।

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button