গাজীপুর

গাজীপুরে একদিকে জবরদখল, অন্য দিকে পুনরুদ্ধার: হুমকির মুখে বনভূমি

বিশেষ প্রতিনিধি : গাজীপুর বনাঞ্চলে একদিকে চলে জবর দখল; অন্য দিকে চলে উদ্ধার এভাবেই চলছে বনবিভাগের কার্যক্রম। বনখেকোদের আগ্রাসনে অনেকটাই হিমশিম খাচ্ছে বনবিভাগ। চলমান কঠোর লকডাউনের সুযোগে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে তৎপর হয়ে উঠছে ভূমিদস্যুরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কোভিড-১৯ সংক্রমণের মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যেই বনভূমি উদ্ধার, জবরদখল প্রতিরোধ এবং বনায়ন কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে বন অধিদফতর। চলমান করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও গত চার মাসে গাজীপুরে বেহাত হওয়া ২১২.৭৯ একর বনভূমি বিভিন্ন ব্যক্তি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দখল থেকে উদ্ধার করেছে বনবিভাগ। গত কয়েক দশকের মধ্য গাজীপুরে স্বল্পসময়ে এটিই সর্বোচ্চ পরিমাণ বনভূমি উদ্ধারের ঘটনা।

বন অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরে সরকারের গেজেটভুক্ত ৫২ হাজার একরের বেশি বনভূমি বর্তমানে রক্ষণাবেক্ষণ ও বনায়ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে দু’টি বিভাগের অধীনে। মহানগরের ভাওয়াল এবং জাতীয় উদ্যান রেঞ্জ ঢাকা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের অধীনে এবং জেলার কালিয়াকৈর, কাচিঘাটা, রাজেন্দ্রপুর শ্রীপুর রেঞ্জ ঢাকা বনবিভাগের অধীনে। জেলায় দ্রুত শিল্পায়নের কারণে ভাওয়াল, কালিয়াকৈর ও রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের বনভূমি সবচেয়ে বেশি হুমকির সম্মুখীন। এই তিন রেঞ্জের জমি বেশি জবরদখল প্রবণ হওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন বনবিভাগের সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বশীলরা।

ঢাকা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ভাওয়াল রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা জানান, ভবানীপুর বিটে এক যুবলীগ নেতার দখল থেকে ১ একর, একটি ফিডমিল থেকে ৯ শতাংশ, একটি টেক্সটাইল মিল থেকে ১.৪০ শতাংশ এবং আরো একটি কারাখানা থেকে ১৬ শতাংশ বনভূমি উদ্ধার হয়েছে। ২০২০-২১ আর্থিক সনে রেঞ্জটির বিভিন্ন এলাকায় ১৭.২৯ একর বনভূমি বিভিন্ন ব্যক্তির দখল থেকে উদ্ধার করে বাগান সৃজন করা হয়েছে। এসব উদ্ধার হওয়া বনভূমি বহু বছর ধরে কৃষিজমি হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

কালিয়াকৈর চন্দ্রা বিট কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে চন্দ্রা বিটের বোর্ডমিল এলাকায় দুই শতাধিক দোকানপাট ও গুদামঘর উচ্ছেদের মাধ্যমে ৫ একর বনভূমি উদ্ধার হয়েছে। চন্দ্রা এলাকায় ৫ শতাংশ ও পূর্ব চান্দরায় ছয়টি পাকা ও টিনসেড দোকানঘর উচ্ছেদ করে ৬ শতাংশ বনভূমি উদ্ধার হয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যুতের খুঁটি প্রস্তুতকারী একটি প্রতিষ্ঠানের দখল থেকে ২.৫০ একর এবং চন্দ্রা মৌজায় একটি টেক্সটাইল মিলের দখল থেকে ১.৪০ একর বনভূমি উদ্ধার হয়েছে।

কালিয়াকৈর মৌচাক বিট কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ভান্নারা মৌজায় দুটি কারখানার দখলে থাকা এবং কৃষি জমি হিসেবে ব্যবহৃত ২ একর বনভূমি উদ্ধার হয়েছে। সাকাস্বর মৌজায় দুটি বাড়ি উচ্ছেদে ২০ শতাংশ, কৌচাকুড়ি মৌজায় একটি বাড়ি ও কৃষি জমি হিসেবে ব্যবহৃত ২.৫০ একর এবং একই মৌজার পৃথক স্থানে ৪০ শতাংশ বনভূমি উদ্ধার হয়েছে। এ ছাড়া বারাব মৌজায় কৃষি জমি হিসেবে ব্যবহৃত ১ একর এবং মাজুখান মৌজায় ২৫ শতাংশ বনভূমি বিভিন্ন ব্যক্তির দখল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

কালিয়াকৈর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম দোলন জানান, গত চারমাসে কালিয়াকৈর রেঞ্জের চন্দ্রা ও মৌচাক বিটে সর্বমোট ১৫.৩৫ বনভূমি উদ্ধার হয়েছে। এ ছাড়া রেঞ্জটির বিভিন্ন বিটে অনুন্নয়ন খাতে ১২৩.৫০ একরসহ সর্বমোট ১৩৮.৮৫ একর বনভূমি বিভিন্ন ব্যক্তি ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের দখল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা সৈয়দ আমিনুর রহমান জানান, রেঞ্জটির কাপিলাতলী এলাকায় একটি বাড়ি উচ্ছেদসহ ১ একর এবং মনিপুর বিটে ৩ একরের বেশি কৃষি জমি হিসেবে বনভূমি উদ্ধার হয়েছে। সূর্যনারায়ণপুর বিটের চাঁদপুর মৌজা এবং পূর্ব বিটের কাপিলাতলি মৌজার বিভিন্ন এলাকায় সর্বমোট ৫০ একর অনুন্নয়ন খাতে বাগান সৃজিত হয়েছে। ২০২০-২০২১ আর্থিক সনে ৫০ একরের স্বল্প মেয়াদী মিশ্র বাগানগুলো কৃষি জমি হিসেবে ব্যবহৃত বনভূমি উদ্ধারপূর্বক সৃজিত হয়েছে।

ঢাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইউছুপ জানান, ঢাকা বন বিভাগে মাঠ পর্যায়ে জনবল সংকট রয়েছে। এই স্বল্প জনবল নিয়ে বেহাত হওয়ার ঝুঁকিপ্রবন বনভূমি রক্ষা ও উদ্ধার কার্যক্রমে তাদেরকে অনেক সময় হিমশিম খেতে হয়। তবে ব্যক্তি সচেতনতা বাড়লে স্বল্প জনবলেও বনভূমি রক্ষা সম্ভব বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ঢাকা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজল তালুকদার জানান, উচ্ছেদ মোকদ্দমাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হলে বাগানের আতয়ন বাড়বে। এতে হতদরিদ্রদের সামাজিক বনায়নের আওতায় উপকারভোগী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button