আলোচিতসারাদেশ

আগাগোড়া পুরোটাই দুর্নীতি ডেমু ট্রেনের

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ২০১৩ সালে রেলবহরে যোগ হয় ডেমু ট্রেন। কর-শুল্ক বাদ দিয়ে প্রতিটি ডেমুর দাম পড়েছে ২৩ কোটি টাকা। এসব ট্রেন এখন রেলওয়ের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ডেমু ট্রেনের অর্ধেকই এখন অকেজো। রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতে যেসব যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম প্রয়োজন, তা দেশে নেই। তাই এসব যন্ত্রপাতির অভাবে মেরামত করতে না পারায় অনেক ডেমু ট্রেন ওয়ার্কশপে অচল হয়ে পড়ে আছে।

রেলের কর্মকর্তারা দেশের অবকাঠামো বিবেচনায় নিয়ে ডেমুর নকশা না করে চীনের তাংশান কোম্পানি যে ধরনের ডেমু তৈরি করে, সে অনুযায়ী দরপত্র আহ্বান করা হয়। অথচ ডেমু প্রকল্পের অধীনে ৩০ জনের বেশি কর্মকর্তা চীন সফর করেছেন। তারা সেখানে কী পরিদর্শন করেছেন, সেই প্রশ্ন ছিল সরবরাহের পরই। এখন ডেমু ট্রেনের যন্ত্রাংশ কেনার নামে অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কাগজপত্র জালিয়াতিসহ কেনাকাটায় দুর্নীতির অনুসন্ধান করছে সংস্থাটি।

ডেমুসহ সব ইঞ্জিন-কোচ ক্রয় ও পরিচালনা করে রেলের মেকানিক্যাল বিভাগ। যাত্রী পরিবহনের দায়িত্ব পরিবহন বিভাগের। চালুর পর রেলের পরিবহন বিভাগ ডেমুতে যেসব সমস্যা পেয়েছে, সেগুলো হচ্ছে চাহিদার তুলনায় যাত্রী ধারণক্ষমতা কম। পর্যাপ্ত বাতাস প্রবেশের সুযোগ নেই। যাত্রীদের বসার আসনের নিচে ইঞ্জিন থাকায় মেঝে গরম হয়ে যায়। ফলে যাত্রীরা গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তদুপরি চলছে না এসব ডেমু ট্রেন। সচল রাখতে অতিরিক্ত টাকায় কেনা হয়েছে যন্ত্রাংশ। পিস্টন, রিং, ভালব, গ্যাসকিট, মেইন বিয়ারিং, টার্বো চার্জারসহ বহু যন্ত্রাংশ লাগে ট্রেনে।

দুদকের কাছে জমা নথিতে বলা হয়েছে, ডেমুর ইঞ্জিন মেরামতে মূল কোম্পানিকে বাদ দিয়ে স্থানীয় এক কোম্পানিকে কাজ দেওয়া হয়। আবার ইঞ্জিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে অন্য কোম্পানি থেকে যন্ত্রাংশ কেনা হয়েছে। এ ছাড়া ইঞ্জিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সহায়তা বা ম্যানুয়ালও নেওয়া হয়নি।

ডেমুর ইঞ্জিন বিশেষ ধরনের, যেগুলোর মডেল নং-ডি২৮৭৬ এলইউই ৬২২। উচ্চগতিসম্পন্ন ভারী পরিবহনের জন্য খুবই আধুনিক ও উন্নত মানের ইঞ্জিন এগুলো। এগুলো তৈরি করেছে জামার্নির ম্যান (এমএএন) গ্রুপ। এসব ইঞ্জিন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করার কথা, যা কখনো করা হয়নি। এমএএনের লোকাল অফিস বাংলাদেশেই আছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইঞ্জিন রক্ষণাবেক্ষণ ও ওভারহলিংয়ের জন্য ঢাকায় ওয়ার্কশপও স্থাপন করেছে। বিদেশি প্রকৌশলী ও কারিগরিভাবে দক্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে সেখানে কাজ করানো হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, রেলওয়ের পক্ষ থেকে কখনো তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি।

এ ছাড়া ডেমুর খুচরা যন্ত্রাংশ একবারে সংগ্রহ না করে ছোট ছোট লটে কেনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে ২০১৭ সালের একটি দরপত্রের উদাহরণ তুলে ধরা হয়। এ ক্ষেত্রে ১২৭ লাইন আইটেম কেনার কথা ছিল। তবে তা একেবারে না কিনে এলটিএমের মাধ্যমে পাঁচ-ছয়টি ভাগে কেনা হয়, যেন সিসিএস নিজেই অনুমোদন করতে পারে। এসব করা হয়েছে রেলের মেকানিক্যাল বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ইশারায়।

ডেমু কেনায় অনিয়মের সঙ্গে জড়িত হিসেবে বর্তমান মহাপরিচালক সামসুজ্জামানের নাম আছে আগে থেকেই। যন্ত্রাংশের অনিয়মে তিনি এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) মঞ্জুর উল আলম চৌধুরীসহ আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। চড়া দামে এসব সামগ্রী কেনাকাটায় সবচেয়ে বেশি অভিযোগ মঞ্জুর আলম চৌধুরীর বিরুদ্ধে। এমনকি করোনার মহামারীকালে মাস্কসহ অন্য কেনাকাটায় অতিরিক্ত মহাপরিচালক মঞ্জুরের নাম চলে এসেছে। মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্তেও তার বিরুদ্ধে দুর্র্নীতির প্রমাণ মিলেছে।

সূত্রমতে, ডেমু ট্রেন আমদানির লক্ষ্যে ২০১১ সালে চীনের তাংশান রেলওয়ে ভেহিকল কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করে রেলওয়ে। ২০ সেট ডেমুর মূল্য ৪২৬ কোটি টাকা। কিন্তু এর সঙ্গে শুল্ক ও কর যুক্ত হয়। আরও যুক্ত হয় কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ ভ্রমণ ও ভাতা। সব মিলিয়ে প্রকল্প দাঁড়ায় ৬৫৪ কোটি টাকার। প্রথমে চীন থেকে সরবরাহ ঋণে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ২০১০ সালে রাজস্ব খাত থেকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়ে তা অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায় মন্ত্রণালয়। কিন্তু রাজস্বের টাকায় এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে অনীহা দেখায় পরিকল্পনা কমিশন। এর পর প্রকল্পটি অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং ঢাকার যানজট নিরসনে সহায়ক হবে উল্লেখ করে তা রাজস্ব খাত থেকে বাস্তবায়নের ‘যুক্তি’র পরিপ্রেক্ষিতে অনুমোদন করা হয়। কমলাপুর স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম থেকে দরজার উচ্চতা আড়াই ফুট উঁচু এবং দরজার হাতলও যাত্রীবান্ধব নয়। সাধারণ ট্রেন কমলাপুর প্ল্যাটফর্ম থেকে দুই ফুট উঁচু। সাধারণ ট্রেনের চেয়ে দরজার উচ্চতা আধা ফুট বেশি বলে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের ডেমুতে উঠতে সমস্যা হয়। টয়লেট না থাকায় দূরের পথে যাত্রীদের অসুবিধা হচ্ছে।

ইঞ্জিনপ্রতি ৫৫ লাখ টাকায় ওভারহলিং বিল করেছে রেল। এভাবে ৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা ডেমু ট্রেনের ইঞ্জিন ওভারহলিং বাবদ ব্যয়কে অপচয় হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। তা ছাড়া ডেমু ট্রেনের যন্ত্রাংশ সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ এসেছে। একই আইটেমের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির নামে কোটেশন বানিয়ে নিম্নমানের মাল সরবরাহের অভিযোগ এসেছে। আবার চড়া মূল্যে যন্ত্রাংশ কেনা হয়েছে। যেমন- এইচএমআই ডিসপ্লে/ইনক৭০ নামের ডিসপ্লে কেনা হয় ১০টি। এর দাম ৪৯ হাজার ৮০০ ডলার ধরা হয়। অথচ এই ডিসপ্লে মনিটরটির সর্বোচ্চ বাজারমূল্য ২ হাজার ডলার। দুদকের নথিতে বলা হয়েছে, এতে এ আইটেমে ৪ কোটি টাকা অপচয় হতে পারে। আবার জামপার ক্যাবলের দাম ৪ হাজার ডলার রাখা হয়েছে। অথচ এর বাজারমূল্য মাত্র ২ হাজার ডলার।

এ বিষয়ে রেলওয়ের মহাপরিচালক শামসুজ্জামান ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) মঞ্জুর উল আলম চৌধুরী দুজনের কেউই কথা বলতে রাজি হননি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেলে ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে এমআরআর ইন্টারন্যাশনাল, কসমোপলিটন করপোরেশন, আরএম ইঞ্জিনিয়ারস, জেআর এন্টারপ্রাইজ, এমআরটি ইন্টারন্যাশনাল, ফেরদৌস ইমপেক্স (প্রাইভেট) লিমিটেড। ডেমু ট্রেনের সরবরাহকারী তাংশাং রেলওয়ে কোম্পানির নাম নেই। ট্রাকশন মোটরের মূল সরবরাহকারী স্ট্রিংজেল সাপলাই ইনক. ইউএসএ। তালিকায় দেখানো হয়েছে কানাডিয়ান ডিজেল ইমপেক্স হচ্ছে কানাডা ইনক-এর ডিস্ট্রিবিউটর। আদতে এই কোম্পানির সঙ্গে ডিজেল ইমপেক্সের সম্পর্ক নেই। এরা ট্রাকশন মোটর তৈরিও করে না। কানাডার বাসাবাড়ির দেওয়া ঠিকানা ভুয়া বলে অভিযোগ করেছে একটি প্রতিষ্ঠান। ওই প্রতিষ্ঠানের লোকাল এজেন্ট এমআরআর ইন্টারন্যাশনাল। এ নিয়ে রেল কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে চারটি অর্ডার বাতিল করেছে। আরও একটি বিষয় হচ্ছে- স্ট্রিংজেল সাপলাই ইনক কোনো কোটেশন দেয়নি। ডিজেল ইমপেক্স নাকি ওই প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া কোটেশন জমা দিয়েছে- এমন অভিযোগ জমা পড়েছে দুদকে।

দুদকের সূত্র জানায়, ডেমু ট্রেনের মূল ইঞ্জিন আমদানিকারক ম্যান (এমএএন) জার্মানি। ম্যান ইঞ্জিন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন। কিন্তু এটি রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। ইঞ্জিন অয়েল ও ফিল্টার পরিবর্তন করা হয় না। ঢাকায় ২০১৭-১৮ সালে ১০টি ডেমু এবং চট্টগ্রামে ২০১৮-১৯ সালে পাঁচটি ডেমু ইঞ্জিন ওভারহলিং করা হয়েছে কেবল ধোয়া-মোছার মাধ্যমে। রেলওয়ের ক্রয়নীতি অনুযায়ী ডেমু ইঞ্জিন ওভারহলিং করতে হলে তাদের নির্ধারিত প্রতিনিধি অথবা এমএএন ইঞ্জিন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করার কথা। ওভারহলিংয়ের কাজ করছে এমন প্রতিষ্ঠান যাদের নিজস্ব ওয়ার্কশপ নেই। ওভারহল করার যন্ত্রপাতি নেই এবং প্রশিক্ষিত কারিগরি ব্যক্তি না থাকার অভিযোগ এসেছে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

 

সূত্র: আমাদের সময়

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button