মুক্তমত

আত্মহত্যায় কি প্ররোচিত করছে গণমাধ্যম!

আমরা সবাই একসময় শিশু ছিলাম। ধীরে ধীরে ভালো-খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন বয়সে এসে পৌঁছেছি। আপনি নিজেও যদি নিজের অতীত সময়গুলোতে চোখ ঘুরান, সেখানে আশাহীন, সাহায্যহীন, মানসিক চাপ অতিক্রম করার কিছু সময় খুঁজে পাবো। যারা সময়গুলো এখন পর্যন্ত অতিক্রম করেছেন, তারা জানেন কিভাবে বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যেতে পেরেছেন। আর যারা এই বাধায় আটকে গিয়েছেন, নিজেদের জীবনকে বিসর্জন দিয়েছেন তাদের জন্য শোক ও সমবেদনা।

কেমন জানি স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন প্রতিদিনকার অনলাইন নিউজপোর্টাল ব্রাউজ করে বা দৈনিক পত্রিকার পাতা ওল্টালে অথবা টেলিভিশনে স্ক্রলে আত্মহত্যার খবর দেখা বা পড়া। যিনি আত্মহত্যা করেছেন! তার পরিচয়, তার পরিবারের অবস্থা, কিভাবে আত্মহত্যা করেছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কার কথা লিখে গিয়েছেন! সবকিছুই গণমাধ্যম নিঁখুতভাবে তুলে ধরছে, বিশ্লেষণ করছে।

এরপর ফলোআপ সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে, পরে আরও অন্তরালের খবর। বাদ যাচ্ছে না পারিবারিক, সামাজিক অবস্থানের মতো বিষয়গুলোও। তবে দুনিয়াজুড়ে কিন্তু আত্মহত্যার খবর প্রকাশে একটি মানদণ্ড মেনে চলা হয়। বিশেষত আত্মহত্যার খবর প্রকাশই করা হয় না।

একবার সিঙ্গাপুরে স্ট্রেইট টাইমসের সাবেক সম্পাদক এলান জনকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘আত্মহত্যার খবরের বিষয়ে কি করে সিঙ্গাপুরের গণমাধ্যমগুলো?’

উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আত্মহত্যার খবর প্রকাশ করা হয় না। কারণ যিনি আত্মহত্যা করেছেন, তিনি প্রচারের জন্যেই এই দূর্ভাগ্যজনক পরিণতি বেছে নিয়েছেন। এই ধরনের সংবাদ প্রকাশ, অন্যদেরও আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করে।’

তবে কি আমাদের গণমাধ্যমগুলো এই আত্মহত্যাকে আলোচিত করে তুলছে?

গবেষণায় এটা বারবারই উঠে এসেছে, আত্মহত্যার সংবাদ যে মানুষকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে। গত বছর প্রকাশিত কানাডিয়ান মেডিকেল এসোসিয়েশনের জার্নালে বলা হয়েছে, আত্মহত্যায় মানুষকে যে বিষয়গুলো প্ররোচিত করে, তার মধ্যে একটি বড় কারণ হচ্ছে তাকে আত্মহত্যার খবর জানানো। যে কাজটি এখন বাংলাদেশের গণমাধ্যম করে যাচ্ছে।

তাই প্রতিদিন আত্মহত্যার খবর পাওয়ার দায়তো গণমাধ্যমেরও কিছু রয়েছে।

ওই জার্নালে বলা হয়েছে, আত্মহত্যা থেকে মানুষকে বিরত রাখতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে গণমাধ্যম। মানুষের মধ্যে আশা জাগিয়ে তুলতে পারে গণমাধ্যম। সেটি কি করছে গণমাধ্যম?

আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের এক গবেষণায় দেখা গেছে, গণমাধ্যমে যখন আত্মহত্যার খবর বেশি প্রকাশ হতে থাকে, তখন আত্মহত্যার হারও বাড়তে থাকে। কারণ যারা এই ধরনের কঠিন মুহূর্ত অতিক্রম করছেন, তারা ভাবেন আত্মহত্যা করলে তাদের খবরটিও এভাবে প্রকাশ পাবে। আর যাদের ওপর তাদের ক্ষোভ রয়েছে, তারাও মানসিকভাবে শাস্তির সম্মুখিন হবে।

সাম্প্রতিক সময়ের আত্মহত্যার ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি বিষয় লক্ষণীয়। সেটি হচ্ছে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা। ভিকারুন্নেসা স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণীর ছাত্রী অরিত্রির আত্মহত্যা দেশের মানুষকে মর্মাহত করে। স্কুলের শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা হয়। গণমাধ্যম তীর ছুঁড়তে থাকে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের আত্মহত্যা বছরের শুরুতেই দেশবাসীকে মর্মাহত করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আঙুল তোলে গণমাধ্যম। চলে চুলচেরা নানা বিশ্লেষণ।

চিকিৎসক আকাশের আত্মহত্যার পরে তার স্ত্রী মিতুর দিকে যেভাবে গণমাধ্যম তেড়ে আসলো, তাতেও দেখা যায় দায়ী ব্যক্তিদের অপরাধী প্রমাণ করতে সচেষ্ট থাকে সমাজ এবং গণমাধ্যম।

গবেষণা বলছে, যারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নেয় এবং কারও ওপর প্রতিশোধ নিতে চায়, তাদেরকে উৎসাহ দেয় এই ধরনের সংবাদগুলো। তারাও ভাবেন, তাদের আত্মহত্যার পর সমাজ এবং গণমাধ্যম এই ধরনের প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠবে।

তাই গবেষণা এবং আর্ন্তজাতিক মানসম্পন্ন সংবাদমাধ্যমগুলো পর্যালোচনা করলে, আমাদের গণমাধ্যমেরও নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে, আত্মহত্যার সংবাদ বিস্তারিতভাবে প্রকাশের অর্থ কি! গণমাধ্যম কি প্ররোচনা দিচ্ছে নাকি! বা আত্মহত্যা ঠেকাতে কি করছে গণমাধ্যম!

মাজেদুল নয়ন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button