আলোচিতস্বাস্থ্য

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে বিনামূল্যে ক্যানসারের ওষুধ পাচ্ছেন রোগীরা

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : মাতৃত্বজনিত ক্যানসারে ভুগছেন হুনেফা বেগম (২৪)। একমাস ধরে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি আছেন। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন তিনি। রাহেলা বেগম (৪৫) ব্রেস্ট ক্যানসারে আক্রান্ত। আর সায়মা আখতার (১৪) ও মীম (১৩) দুজনই বোন ক্যানসারের রোগী। তাদের মতো এই হাসপাতালে আরও কয়েকজন ক্যানসার রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখানকার রোগীদের কেউ কেউ একেবারেই বিনা মূল্যে ওষুধ পাচ্ছেন। কেউবা অর্ধেক ওষুধ হাসপাতাল থেকে পাচ্ছেন, বাকিটা বাইরে থেকে কিনছেন।

হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যেসব রোগী একেবারেই গরিব, ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই, তাদেরকে সম্পূর্ণ ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়া হয়। যাদের আর্থিক অবস্থা মোটামুটি ভালো তাদেরকে এক সাইকেল (কেমোথেরাপির চক্র) ফ্রি ওষুধ দেওয়া হয়, এক সাইকেল বাইরে থেকে কিনতে হয়। এক সাইকেল ওষুধ কিনতে খরচ হয় ৪০ হাজার টাকা। এছাড়া, ক্যানসার রোগীদের জন্য বরাদ্দ বেডগুলো সম্পূর্ণ ফ্রি, তাই রোগীদের কোনও অর্থ দিতে হয় না। সরকারি হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী, এখানে তিন বেলা খাবার পান রোগীরা।

সোমবার (২১ জানুয়ারি) কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, এখানে সরাসরি কোনও ক্যানসার ওয়ার্ড নেই। ক্যানসার রোগীদের জন্য মেডিসিন ওয়ার্ডে আলাদা বেডের ব্যবস্থা রয়েছে। পুরুষ ওয়ার্ডে ১৫টি এবং নারী ওয়ার্ডে ২০টি বেড রয়েছে।

গলার ক্যানসারে চিকিৎসাধীন ময়মনসিংহ মোহাম্মদ ইউনুসের (১৮) বলেন, ‘আমি গত পাঁচ বছর ধরে হোমিওপ্যাথি ওষুধ খেয়েছি। এখন গলার অবস্থা বেশি খারাপ। এখানে চিকিৎসার পর অবস্থা আগের চেয়ে ভালো হচ্ছে। গত চার মাস ধরে আমি এখানে ভর্তি আছি।’

রংপুরের মিঠাপুকুরের বাসিন্দা জাহিদুর রহমান (৫০) পাকস্থলীর ক্যানসার নিয়ে এই হাসপাতালে ভর্তি আছেন। দুই মাস ধরে তিনি অসুস্থ।

ব্রেস্ট ক্যানসারে আক্রান্ত যশোর থেকে আসা রোগী রাহেলা বেগম (৪৫) কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘এত কষ্টে আছি কাউকে বোঝাইবার পারবো না। স্বামী আমার ওপরে রাগ করে বাড়ি চলে গেছে। এখন কী করে আমার চিকিৎসা চলবে কিছুই জানি না।’

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের ক্যানসার বিভাগটি চালু হয় ২০১৫ সালে। তৎকালীন পরিচালকের ক্যানসার বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ থাকায় তাকে এই বিভাগ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এখন এই বিভাগে একজন সহকারী অধ্যাপক ও দুজন মেডিক্যাল অফিসার কর্মরত আছেন। এছাড়া, আছেন ১০ জন নার্স। তারা শিফট ডিউটির মাধ্যমে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিচ্ছেন।

হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন বলেন, ‘অন্য হাসপাতালের চেয়ে আমাদের হাসপাতালের বিশেষত্ব হচ্ছে এখানে ভর্তি প্রক্রিয়াটা সহজ। আমরা এখানে সব চিকিৎসক একসঙ্গে বসি। আমরা সম্মিলিতভাবে রোগী ভর্তির সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি।’ তিনি বলেন, ‘আমার সহকর্মীদের ধন্যবাদ দেই এই কারণে যে, কারও সার্জারির দরকার হলে তারা দ্রুত সার্জারি শুরু করে। এতে করে সময় নষ্ট হয় না। রোগীদেরও ঘুরতে হয় না।’

ডা. সুমন বলেন, ‘আমাদের এখানে প্রচুর অস্টিওসারকোমার রোগী আসে। তাদের শুরুতে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। এরপর তাদের পা কেটে ফেলা হয়। এরপর তাদেরকে নকল পা লাগানো হয়। এই রোগটা টিনেজ বয়সীদের বেশি হয়।’

নিজেদের সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, আমাদের ক্যানসার বিভাগটি একটি ইনডিপেনডেন্ট ইউনিট হবে। প্রতিবছর আমরা এখানে নতুন এক হাজার ক্যানসার রোগী পাচ্ছি। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি ২৫০ জন ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর জন্য এক জন ক্যানসার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দরকার। সেক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ পদ মর্যাদার চার জন চিকিৎসক আমাদের এখানে প্রয়োজন। এছাড়া, ক্যানসারের চিকিৎসার ক্ষেত্রে রেডিওথেরাপি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের এখানে রেডিওথেরাপি দেওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই। আশা করছি, অচিরেই আমাদের এখানে রেডিওথেরাপি মেশিন চালু হবে। তাহলে, আমরা ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের পুরোপুরি চিকিৎসা দিতে পারবো।’

এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মীম এবং সায়মা অস্টিওসারকোমায় আক্রান্ত। তারা দুজনেই বয়সে কিশোরী। তারা সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে দ্রুত বাড়ি ফিরে যেতে চান। ফের যেতে চান নিজ নিজ স্কুলে। তাদের মতো রোগীদের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের ক্যানসার বিভাগ, বললেন ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন।

 

সূত্র:বাংলা ট্রিবিউন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button