আইন-আদালতআলোচিতগাজীপুরসারাদেশ

এএসপি আনিসুল করিম হত্যাকাণ্ড: তদন্তে ধীরগতি, একবছরেও দেওয়া হয়নি চার্জশিট

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : গাড়ির শব্দ শুনলেই বাবাকে খুঁজে ফেরে হত্যাকাণ্ডের শিকার এএসপি আনিসুল করিম শিপনের সাড়ে চার বছরের ছেলে সারফ্রান। তার মনে হয়, এই বুঝি বাবা এলো। কিন্তু বাবা যে না ফেরার দেশে চলে গেছেন, এ কথা বোঝার বয়স হয়নি শিশুটির। ছোট্ট বাচ্চার এমন আবেগ-অনুভূতি সত্যিই খুব কষ্ট দিচ্ছে।

কান্নাজড়িত কন্ঠে কথাগুলো বলছিলেন আনিসুল করিম শিপনের স্ত্রী শারমিন। স্বামী হারানোর বেদনা আর শিশু সন্তানকে নিয়ে একাকী পথ চলা এই নারী তুলে ধরেন এ হত্যাকাণ্ডে দায়ের করা মামলার বর্তমান অবস্থার কথা।

প্রসঙ্গত, ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর বেলা ১১টায় আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে হাসপাতালটির কর্মচারীদের মারধরে মারা যান সিনিয়র এএসপি আনিসুল করিম শিপন।

হতাশাগ্রস্ত শারমিন বলেন, ‘আমরা ওকে তো আর পাবো না। এখন শুধু বিচার চাই। তার সঙ্গে যা হয়েছে তা তো আমরা সবাই দেখছি। আমরা বিচারের দিকে তাকিয়ে আছি। তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হচ্ছে; তারা বলছেন, অভিযোগপত্র দেবেন। তবে কবে দেবেন এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছেন না। তদন্তে ধীরগতি কেন হচ্ছে, এ বিষয়টি বুঝতে পারছি না। এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, কিন্তু চার্জশিট এখনও দেওয়া হয়নি। পুলিশ পরিবারের সদস্য সেটা ঠিক আছে, কিন্তু এখন তো আমি একজন সাধারণ মানুষ।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘একদিকে স্বামী হারানোর বেদনা, অন্যদিকে ছোট্ট বাচ্চাকে নিয়ে খুবই ফ্রাস্ট্রেশনে রয়েছি। সে চলে যাওয়ার পর থেকে লাইফ স্ট্রাগল শুরু হয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে আর কথা বলতে ভালো লাগে না।’

একজন বিসিএস কর্মকর্তা এবং পুলিশ সদস্য হওয়ার পরও এএসপি আনিসুল করিম শিপন হত্যাকাণ্ডের অভিযোগপত্র দেওয়ার ধীরগতির পেছনে পুলিশের গাফিলতি রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শিপনের বাবা ফাইজুদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেলেই দেওয়া হবে অভিযোগপত্র।’

চার্জশিটে ধীরগতির বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করে ফাইজুদ্দিন বলেন, ‘এত সময় লাগার তো কথা নয় তদন্ত কার্যক্রমে। তদন্তে গাফিলতি হচ্ছে। এখন আমার চাওয়া বা দাবি যাই বলুন না কেন একটাই, চার্জশিট দ্রুত দিয়ে আইনের আওতায় এনে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। দোষীদের বিচার দেখে যেতে চাই।’ দুই ছেলে দুই মেয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছেলে শিপনকে হারিয়ে আক্ষেপের শেষ নেই বাবার।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ধীর গতির বিষয়টি স্বীকার করে আদাবর থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন্স) ফারুক মোল্লা বলেন, ‘এসপি আনিসুল করিম শিপন হত্যা মামলার চার্জশিট কিছুটা সময় লাগছে। সাক্ষ্যগ্রহণের কাজ বাকি রয়েছে। এ কারণেই অভিযোগপত্র দিতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আরও ১০ থেকে ১৫ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হবে। করোনাকালীন সাক্ষীদের বাসা পরিবর্তন এবং ঠিকানা অনুযায়ী তাদের না পাওয়ায় তদন্ত কার্যক্রম দীর্ঘায়িত হয়। এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তের ক্ষেত্রে জাতীয় মানসিক হাসপাতালের আরও কোনও চিকিৎসকের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তথ্য পেলে আমরা সে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখবো। তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।’

তিনি বলেন, ‘এছাড়া অভিযোগপত্র দেওয়ার জন্য আসামিদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণ রয়েছে। ফরেনসিক রিপোর্টও আমাদের হাতে এসেছে। মারধরের কারণেই এএসপি আনিসুল শিপনের মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে প্রতিবেদনে।’

প্রসঙ্গত, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের ৩৩ ব্যাচের ছাত্র ছাত্র আনিসুল করিম ৩১তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে এএসপি পদে যোগ দেন। এক সন্তানের জনক আনিসুলের বাড়ি গাজীপুরে। সর্বশেষ তিনি বরিশাল মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সহকারী কমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন।

মানসিক সমস্যায় ভুগে রাজধানীর আদাবরে মাইন্ড এইড হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আনিসুল করিম। ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর হাসপাতালের কর্মচারীদের এলোপাতাড়ি আঘাতে তিনি মারা যান। এ ঘটনায় আনিসুল করিম শিপনের বাবা ফাইজুদ্দিন আহমেদের দায়ের করা মামলায় আসামি করা হয় ১৫ জনকে। বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন ১১ জন, মারা গেছেন একজন, জামিনে রয়েছেন একজন।

 

এ সংক্রান্ত আরো জানতে……

জ্যেষ্ঠ এএসপি আনিসুল করিমকে হাসপাতালে ভর্তির পর মারধর, চার মিনিটেই মৃত্যু

এএসপি আনিসুল হত্যায় জড়িতদের কাউকে ছাড়া হবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

এএসপি আনিসুলের মৃত্যুর ঘটনা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে : আইজিপি

এএসপি আনিসুল হত্যার বিচার দাবিতে মোমবাতি প্রজ্বালন

 

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close