মুক্তমত

মোহাজিরদের শহর করাচি

মাহমুদুর রহমান : সমুদ্রের তীরে করাচি শহরের পত্তন বহু আগে হলেও উনিশ শতকে ইংরেজ অধিকারের সময় থেকে এখানে জনবসতি বাড়তে আরম্ভ করে। ১৮৩৯ সালে ইংরেজরা যখন করাচি অধিকার করে, সে সময়ে এ অঞ্চলের জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৮ থেকে ১৪ হাজার। ধীরে ধীরে শহরটি জমজমাট হয়ে উঠতে শুরু করে। ১৮৪০ সালে করাচিকে সিন্ধুর রাজধানী করা হলে স্বাভাবিকভাবেই এ অঞ্চলের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। বিশ শতকের সূচনাকালে, ১৯০১ সালে করাচির জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৭ হাজার। ৪০ বছরে আরো প্রায় পৌনে তিন লাখ বেড়ে এ জনসংখ্যা ৩ লাখ ৮৭ হাজারে উন্নীত হয়। ১৯৪৭ নাগাদ তা চার লাখ ছুঁয়েছিল, কিন্তু এর পরই এক ধাক্কায় করাচির জনসংখ্যা অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল। মূলত দেশভাগের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত থেকে আসা উদ্বাস্তুরাই ছিল এ শহরের নতুন বাসিন্দা—এরাই মোহাজির। তারাই আধুনিক করাচির প্রাণ।

ভারতের স্বাধীনতা লাভ, পাকিস্তানের জন্ম ইতিহাসের অন্যতম বড় বাস্তুচ্যুতির সূচনা করেছিল। দেশভাগের কারণে বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগ হয়ে গেলে এ দুই অঞ্চলের অধিবাসীদের স্থানান্তর এবং দাঙ্গা নিয়েই বেশি আলোচনা হয়। কিন্তু এর বাইরেও বহু অঞ্চলের অধিবাসী জন্মভিটা ছেড়ে ঠাঁইনাড়া হয়েছিল। খোদ করাচিতে ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে একটি দাঙ্গা হলে করাচির হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সরকারের তত্ত্বাবধানে ভারতে স্থানান্তরিত হয়। একইভাবে ভারতের বিহার, রাজস্থান, বোম্বে ও উত্তর প্রদেশের বহু মুসলিম ভিটা ছেড়ে পাকিস্তানের দিকে যাত্রা করে। এর মধ্যে একটি বড়সংখ্যক অধিবাসীর ঠিকানা হয়েছিল করাচি। ১৯৪৮ সালের মে মাস নাগাদ করাচিতে প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার মানুষের প্রবেশ ঘটে, যার ফলে করাচির জনমিতি বদলে যায়।

করাচির জনমিতির এ বদল লক্ষ করতে গিয়ে দেখা যায়, ১৯৪১-৫১ নাগাদ এখানকার মোট জনসংখ্যা বেড়ে তিন গুণ হয়। ১৯৪২ সালে ৪২ শতাংশ মুসলিম বসবাস করত, যা ১৯৫১ সাল নাগাদ ৯৬ শতাংশে উন্নীত হয়। দেশভাগের প্রতিক্রিয়া এ পরিসংখ্যান থেকে টের পাওয়া যায়। করাচিতে হাজির হওয়া মোহাজিরদের বেশির ভাগের ভাষা উর্দু হওয়ার কারণে স্থানীয় সিন্ধিভাষীরা অনেকটা সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে। ১৯৪১ নাগাদ ৫১ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা সিন্ধি থাকলেও ১৯৫১ নাগাদ মোট জনসংখ্যার মাত্র ৮ দশমিক ৫ শতাংশের মাতৃভাষা সিন্ধি বলে শনাক্ত করা হয়। এ সময়ে উর্দুভাষীর অনুপাত হয় মোট জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ। হিসাব করে দেখা যায়, ১৯৫২ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর করাচিতে প্রায় এক লাখ করে মোহাজির আসতে থাকে।

বাস্তুচ্যুত এ মানুষদের প্রাথমিকভাবে উদ্বাস্তু (রিফিউজি) বলা হতো না। এদের সাধারণত ‘মোহাজির’ বলে চিহ্নিত করা হতো। ভারতভাগের পেছনেও ‘ধর্ম’ অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল, তাই ভারত ত্যাগ করে সদ্য গঠিত পাকিস্তানে আসা এ মুসলিমদেরও মোহাজির বলা হতো এবং তাদের প্রাথমিকভাবে মর্যাদার সঙ্গে গ্রহণ করা হয়। অভিবাসী এ জনতাই এক অর্থে করাচির শহরাঞ্চল গড়ে তুলেছিল। অন্যান্য ‘ভারতীয়’ অঞ্চল থেকে আসা শিক্ষিত এবং ক্ষেত্রবিশেষে ধনাঢ্য অধিবাসীরা করাচির মফস্বল অঞ্চলকে উন্নত করে তোলার পাশাপাশি নিজেদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু স্বভাবতই এ প্রাধান্য স্থানীয় সিন্ধিদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠে। অবশ্য এর পেছনে কিছু নির্দিষ্ট কারণও ছিল।

বসবাসের শুরু থেকেই সরকারিভাবে মোহাজিরদের নানা সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান মূলত বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধিতে একটি কোটা ব্যবস্থা চালু করেন, কিন্তু তা করাচির মোহাজিরদের স্বার্থে আঘাত করেনি। ফলে রাজনীতি, কূটনীতি ও ব্যবসায় মোহাজিররা প্রাধান্য করতে থাকে। মোট চাকরির ২১ শতাংশ তারাই অধিকার করেছিল। এক ইউনিট নীতি ও শিক্ষার উচ্চহারের কারণে সিভিল সার্ভিসে মোহাজিরদের অংশ্রগ্রহণ ৪৭ শতাংশে উন্নীত হয়। করাচির ১২টির মধ্যে সাতটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানই গুজরাটি মোহাজিরদের অধিকারে ছিল। ১৯৭০ নাগাদ বেসামরিক কূটনৈতিক ক্ষেত্রে মোহাজিররা ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ গেজেটেড পদ এবং সামরিক বাহিনীর ৪৮টি জেষ্ঠ্য পদের মধ্যে ১১টির (২৩ শতাংশ) অধিকারী হয়েছিল।

স্বাভাবিকভাবেই মোহাজিরদের এ প্রাধান্য স্থানীয়রা বেশি দিন সহ্য করতে পারেনি। পঞ্চাশ থেকে ষাটের দশকে সিন্ধি ও পশতুনদের সঙ্গে মোহাজিরদের বিরোধ তীব্র হতে আরম্ভ হয়। এ সময়েই সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনীতি। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির ক্ষেত্রে ‘জামাত-ই-ইসলামী’ ও ‘জামিয়াত-ই-উলেমা পাকিস্তান’ প্রভৃতি ধর্মভিত্তিক দল মোহাজিরদের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করত। এ সময়ের মধ্যে সিন্ধু প্রদেশের রাজনীতিতে গোষ্ঠী পরিচয় বা স্থানীয় বিষয় আসেনি, কিন্তু ষাটের দশকে পাকিস্তান পিপলস পার্টি সক্রিয় হলে এখানকার রাজনীতি বদলে যায়। অবশ্য তারও আগে ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসে পাকিস্তানের রাজধানী করাচি থেকে ইসলামাবাদে স্থানান্তর করলে সিন্ধুর মোহাজিরদের সমর্থন ফাতিমা জিন্নাহর দিকে ঘুরে যায়। ১৯৬৪-এর নির্বাচনে আইয়ুব খান জয়ী হলে পশতুনদেন সঙ্গে মোহাজিরদের সংঘাত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মোহাজিরদের মধ্যে একটি মিশ্র সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। সত্তরের দশকে পাকিস্তানের পূর্বাংশের মতো পশ্চিম অংশেও বেশকিছু রাজনৈতিক সংকট উপস্থিত হয়। জুলফিকার আলী ভুট্টো ক্ষমতা লাভ করলে তিনি মোহাজিরদের প্রাধান্য হ্রাস করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। নানাভাবে হিসাব করে মোট প্রায় ১০ হাজার উর্দুভাষীর চাকরিচ্যুতি, বাধ্যতামূলক অবসর ও পদাবনতি করা হয়। পাশাপাশি একটি ভাষা-নীতি গ্রহণ করা হয় এবং এর মাধ্যমে উর্দুর পাশাপাশি সিন্ধিকে সমমর্যাদার দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ভুট্টোর করা কোটা নীতি অনুসারে সিন্ধিরা মোহাজিরদের তুলনায় চাকরিবাকরিতে অধিক সুযোগ লাভ করে। চাকরির পাশাপাশি ভাষাগত দিক থেকে নিজেদের অধিকারচ্যুত মনে করে, মোহাজিররা আন্দোলন শুরু করে, যা ক্রমেই সহিংস হয়ে ওঠে। অবস্থার এতই অবনতি হয় যে জামাত-ই-ইসলামীর তরফ থেকে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ধি বিভাগ পুড়িয়ে দেয়ার জন্য মশাল মিছিল হয়।

ভুট্টোর এ সিদ্ধান্ত মূলত স্থানীয় সিন্ধিদের সমর্থন লাভের উদ্দেশ্যে গৃহীত হলেও তা মোহাজির ও স্থানীয়দের মধ্যে জমে ওঠা ক্ষোভকে চাগিয়ে তোলে। ১৯৭২ সালের দাঙ্গা এবং তার পরবর্তী সময়ে উভয় গোষ্ঠীরই বহু লোক হতাহত হয়। জ্ঞাতি ভাই মমতাজ ভুট্টো সিন্ধুর প্রশাসক থাকাকালে জুলফিকার আলী এ প্রদেশ সফর করেন এবং সে সময়ে ভাষাগত প্রশ্নে কোটা ব্যবস্থা তুলে নিয়ে বলেন, সরকারি চাকরিলাভের জন্য ভাষা কোনো শর্ত হয়ে দাঁড়াবে না। কিন্তু ততদিনে বহু দেরি হয়ে গেছে। সহিংসতা ও অবিশ্বাসের বীজ এত গভীরে প্রোথিত হয়ে গেছে, যার প্রভাবের মাত্রা প্রশমন করাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এ সময়ে মোহাজিররা একটি রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন অনুভব করে, যারা সরাসরি মোহাজিরদের প্রতিনিধি হয়ে কাজ করবে।

উর্দুভাষী বাবা-মায়ের সন্তান আলতাফ হোসেন, করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সরব ছাত্র ছিলেন। ১৯৭৮ সালে তিনি অল পাকিস্তান মোহাজির স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশন (APMSO) প্রতিষ্ঠা করেন। মোহাজিরদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সুযোগ-সুবিধাদি আদায়ের উদ্দেশ্যে গঠিত দলটি সূচনায় অন্যান্য সমস্যার সঙ্গে আলতাফ হোসেন কোনো প্রকার প্রতিবাদী ভূমিকা গ্রহণ না করার জন্য মোহাজিরদের প্রথম প্রজন্ম এবং উচ্চবর্ণ ও বিত্তের মোহাজিরদের দায়ী করেন। কিন্তু তখন পর্যন্ত আলতাফের এ রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনটি মোহাজিরদের অধিকার আদায়ের জন্য সচেতনতা তৈরি এবং আওয়াজ তোলার নীতিই গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সত্তরের দশকে সিন্ধু প্রদেশে প্রচুর পশতুন অভিবাসীর পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময়ে বিহারিরাও নতুন করে আসতে আরম্ভ করে। ফলে কেবল সিন্ধি নয়, পশতুনদের সঙ্গেও মোহাজিরদের টানাপড়েন আরম্ভ হয়।

মোহাজিররা বস্তি ও অন্যান্য অঞ্চলের ভূমির অধিকার করে রেখে পরিবহন খাতেও নিজেদের প্রভাব রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু এ ব্যবসায় পশতুনদের একচেটিয়া অধিকার ছিল। এসবের মধ্য দিয়ে এক ধরনের জাতিবাদী বিরোধ তৈরি হয়, যা ১৯৮৫ সালে একটি রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার সূচনা ঘটিয়েছিল। ভারতভাগের পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানে পাঞ্জাবিদের প্রাধান্য বাড়তে আরম্ভ করে। মোহাজির ও পাঞ্জাবিদের মধ্যে প্রতিযোগিতার কারণে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তত্ত্বাবধানে মোহাজিরদের বিরুদ্ধে ‘পাঞ্জাবি-পশতুন ইত্তেহাদ’ গঠিত হয়। সে সময় থেকে সিন্ধু প্রদেশে পাঞ্জাবি, পশতুন ও মোহাজিরদের নিয়ে একটি জটিল নৃ-রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়, যা এখনো অব্যাহত আছে।

প্রাথমিককালে মোহাজিররা কেবল তাদের সুযোগ-সুবিধা নিয়েই সন্তুষ্ট ছিল। পরবর্তী সময়ে ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাত উপস্থিত হলে মোহাজিররা নিজেদের বঞ্চিত বলে অনুভব করতে শুরু করে এবং এ বঞ্চনা থেকে নিজেদের আলাদা একটি সত্তা হিসেবে প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। মোহাজিররা ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চল থেকে করাচিতে আগমন করেছিল। ফলে তাদের নিজস্ব কোনো পরিচয় টিকে ছিল না। তাই এ নতুন আবাসে তারা ‘মোহাজির’ পরিচয়টিকেই নিজেদের ‘আইডেন্টিটি’ হিসেবে গ্রহণ করে এবং এ পরিচয় সামনে রেখেই নিজেদের একতা ও নিজস্বতা নির্মাণে সচেষ্ট হয়। এমন লক্ষ্য থেকেই আলতাফ হোসেনের অল পাকিস্তান মোহাজির স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশন আরো বড় আকারে আত্মপ্রকাশ করে। জেনারেল জিয়াউল হকের শাসনামলে ১৯৮৩ সালে কোটা ব্যবস্থা আরো ১০ বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ছয়দিনের মাথায় মোহাজির কওমি মুভমেন্ট (এমকিউএম) গঠিত হয়। আলতাফ হোসেনের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং সিন্ধু প্রদেশের অস্থিতিশীলতার কারণে দলটি শহরাঞ্চলের তরুণদের মধ্যে একটি প্রতিবাদী চেতনা তৈরিতে সক্ষম হয়েছিল।

পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই এখানে বহু জাতির মানুষের বসবাস থাকলেও পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতারা ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে একীভূত করার চেষ্টা করেছে। জিয়াউল হক তার শাসনামলে দেশে ‘ইসলামীকরণ’ নীতি গ্রহণ করলে এখানে মোহাজিররা নিজেদেরে মোহাজির পরিচয়কে আরো বেশি করে আঁকড়ে ধরে। অনেকে মনে করেন, জিয়াউল হক এমকিউএম দলটিকে প্রচ্ছন্নভাবে সহায়তা করেছিলেন। কেননা এর মাধ্যমে ভুট্টোর পিপলস পার্টির প্রভাব কমানো সহজ হয়েছিল। বলা চলে, করাচিতে পিপলস পার্টির জায়গা আলতাফ হোসেনের দলটি দখল করে নেয়। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে দলটি বেশকিছু আসনে জয়ী হয়, কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাদের নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। নব্বইয়ের দশকে নানাভাবে দলটিকে কোণঠাসা করে ফেলা হয়। ১৯৯২ সালে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে এমকিউএমকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টাও হয়। সরাসরি সেনাবাহিনিকে অভিযানে প্রেরণ করা হয়। অপারেশন ক্লিন-আপ নামের এ দমন অভিযান শুরু হওয়ার মাসখানেক আগে আলতাফ হোসেন পাকিস্তান ছাড়েন এবং লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন। এর কিছুদিন আগে, ১৯৯১ সালের ২১ ডিসেম্বর তাকে হত্যার জন্য হামলা হয়েছিল।

এরপরও দলটি নানাভাবে নিজেদের এগিয়ে নিয়েছে। ১৯৯৭ সালে দলটি ‘মোহাজির কওমি মুভমেন্ট’ থেকে নাম বদলে ‘মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট’ করার মাধ্যমে আরো বিস্তৃত প্রপঞ্চ তৈরির চেষ্টা করে। পরবর্তী সময়ে পারভেজ মোশাররফ ক্ষমতায় এলে—যিনি নিজেও একজন মোহাজির—মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্টের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। কিন্তু মোশাররফ-পরবর্তী সময়ে এমকিউএমের ভরাডুবি হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে অভিবাসন সম্বন্ধে আমরা পশ্চিমা বিশ্বের নানা নীতির কথা শুনি। হিজরতকে যদিও সম্মানের সঙ্গে দেখা হয়, বহুদিন হলো অভিবাসন ও অভিবাসী সমস্যা গুরুতর হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক ও স্থানীয় রাজনীতি উভয়ই এজন্য দায়ী। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের মতো করাচিরও অভিবাসী সমস্যা গুরুতর। এ নিবন্ধে করাচির অভিবাসীদের সম্বন্ধে কিছু বিষয় আলোচিত হলো, কিন্তু এখানে একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় বাকি রয়ে গেছে। করাচিতে বহুসংখ্যক বাঙালিও মোহাজির হিসেবে বসবাস করে, যাদের সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ।

করাচির মূল শহর থেকে প্রায় ১ ঘণ্টার দূরত্বে ইব্রাহিম হায়দেরি নামক প্রায় বস্তি অঞ্চলে এদের বাস। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় বহুসংখ্যক বাঙালি পাকিস্তানে চলে যায়। তাদের একটি বড় অংশের বর্তমান ঠিকানা করাচির এ শহরতলি। কোনো রকম নাগরিক সুবিধাদি ব্যতিরেকে এ বাঙালি ‘মোহাজিররা’ সেখানে জীবন যাপন করছে। তাদের না আছে কোনো আইডেন্টিটি কার্ড, না আছে কোনো অধিকার। বহুকাল বসবাস করেও তারা নাগরিকের মর্যাদা লাভ করতে পারেনি। সরকারিভাবে তারা ‘অবৈধ অভিবাসী’ বলেই পরিচিত। করাচিতে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বৃদ্ধি পাওয়ার পর ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরিও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পরিচয়পত্রের অভাবে এরা চাকরি তো দূরে থাক, পড়াশোনারও সুযোগ পায় না।

জয়নুল আবেদিন নামে এক তরুণ পাকিস্তানি, ‘বেঙ্গলি অ্যাকশন এইড’ নামে মোহাজির বাঙালিদের জন্য একটি সংগঠনের সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করছেন। বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, ‘বাঙালিদের সিংহভাগই বয়সে তরুণ। এরা সব পাকিস্তানে তৃতীয় প্রজন্মের বাঙালি।’ সত্যিকার অর্থে এরা পাকিস্তানিই হয়ে গেছেন। বহু আগে বাংলা ছেড়ে আসা তাদের পূর্বপুরুষদের অনেকে পরলোকে গমন করেছেন। করাচিতে বসবাসকারী এ অংশের বহুজনের জন্ম পাকিস্তানের মাটিতে। আমারা ইউসুফ বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা কি পাকিস্তানি নই? আমার জন্ম এখানে। আমার বাবা-মায়ের জন্মও এখানে।’ কিন্তু তবু কোনো পরিচয়পত্রের মুখ দেখেননি তিনি। বসবাসকারী বাঙালিরা তাই কোনো ভালো কাজও করতে পারেন না। কেউ পথের ধারে সবজি বিক্রি করেন, কেউ চায়ের দোকান চালান। যেহেতু তারা ভোটার নন, কোনো রাজনৈতিক দল তাদের নিয়ে ভাবনায় সময় নষ্ট করে না। তবু এত কিছুর পরও তারা করাচিতেই থাকতে চান। জয়নুল বলেন, ‘যা-ই হোক না কেন আমরা এ দেশ ছেড়ে যাব না। আমরা এখানেই থাকব, এখানেই মরব।’

জয়নুলের এ কথা যেন করাচিতে ঠাঁই নেয়া নানা অঞ্চলের মোহাজিরদের মনোভাবেরই প্রতিধ্বনি করে।

 

লেখক: মাহমুদুর রহমান

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close