অর্থনীতিআলোচিতগাজীপুর

স্টাইলক্রাফট লিমিটেড: ধারদেনা আর বকেয়া বেতনে নিবু নিবু করছে

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত স্টাইলক্রাফট লিমিটেড উৎপাদন শুরু করে ১৯৮৩ সালে। এর মূল প্রতিষ্ঠাতা এম শামসুর রহমানকে এখনো পোশাক খাতের দিকপাল হিসেবেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু তার অবর্তমানে উত্তরসূরিরা ব্যবসার হাল ধরে রাখতে পারেননি। ক্রেতা হারানো, ব্যাংক দেনার পাশাপাশি এখন শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে কারখানা বিক্রির মতো পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়েছে। যদিও সন্তানদের দাবি, দ্রুতই সংকট কাটিয়ে কারখানা চালু করা সম্ভব হবে।

দেশে রফতানিমুখী পোশাক খাতের গোড়াপত্তন সত্তরের দশকের শেষে। পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এম শামসুর রহমান। অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে আশির দশকে যাত্রা করা স্টাইলক্রাফট লিমিটেড গত বছর পর্যন্ত বিশ্ববাজারে কয়েকশ কোটি পোশাকপণ্য রফতানি করেছে। ২০১৬ সালে প্রয়াত এম শামসুর রহমানের গড়ে তোলা ৩৭ বছরের পুরনো প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির টার্নওভার ছিল ২ কোটি ৩৯ লাখ ৯০ হাজার ডলারের। কিন্তু চলতি বছর ঈদুল আজহার পর শ্রমিকদের পাওনা বুঝিয়ে দিতে না পারার ব্যর্থতায় কারখানাটি বন্ধ রয়েছে।

গাজীপুর জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জয়দেবপুরের লক্ষ্মীপুরা এলাকায় ৩ লাখ ৩০ হাজার বর্গফুটের কারখানা স্টাইলক্রাফট লিমিটেডের শ্রমিক সংখ্যা ৩ হাজার ৯৫০। এছাড়া কর্মী রয়েছে ৬৮১ জন। কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ১১ লাখ ৫০ হাজার। এম শামসুর রহমানের সন্তান শামস আলমাস রহমান রয়েছেন এখন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে। গত ঈদুল ফিতরের আগে বেতনসহ বোনাসের জন্য টানা ৪৮ ঘণ্টা অবরোধ করেন শ্রমিকরা। জনপ্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপে এপ্রিলের বেতনসহ বোনাস পরিশোধ করা হয়। এর পরও ২০১৯ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২০ সালের মার্চ, আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বরের আংশিক বেতন বকেয়া রয়েছে। এছাড়া চলতি বছরের মার্চ, মে ও জুনের বেতনও দিতে পারেনি কারখানা কর্তৃপক্ষ।

বেতন বকেয়া থাকার পরও আদায়ের আশায় ঈদুল ফিতরের পর কাজে অংশগ্রহণ করেন শ্রমিকরা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বকেয়া আদায়ে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। আন্দোলনের মুখে ঈদুল আজহার আগে আবারো বকেয়া পরিশোধের প্রতিশ্রুতি পান শ্রমিকরা। কিন্তু গত ১৭ জুলাইয়ে মধ্যে পরিশোধের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয় মালিকপক্ষ। এক পর্যায়ে মালিকপক্ষের সন্ধানে গুলশানের বাসায়ও যায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

শ্রমিক, মালিক ও সরকার তিন পক্ষের সমন্বয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলার উদ্যোগ নেয়া হয়। বিজিএমইএর সহযোগিতায় কয়েক দফা সভা শেষে ৫ সেপ্টেম্বর নতুন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এম শামসুর রহমানের সন্তানরা। আর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধ করতে না পারলে মালিকপক্ষের একটি কারখানা ইউনিট বিক্রি করা হবে। বিজিএমইএ সূত্র জানিয়েছে, শ্রমিকদের বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি টাকা। স্টাইলক্রাফট গ্রুপের ব্যাংক দেনা প্রায় ১৯০ কোটি টাকা। শুধু স্টাইলক্রাফটের ব্যাংক দেনা ৮০-৮২ কোটি টাকা।

জাপানভিত্তিক পোশাক ক্রেতা ইউনিক্লো ছিল স্টাইলক্রাফটের তৈরি পণ্যের অন্যতম বড় ক্রেতা। কারখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, ২০১৯ সালে ইউনিক্লোর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন হয় স্টাইলক্রাফটের। ওই ঘটনা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পরিস্থিতিতে বড় প্রভাব ফেলে। এরপর বহু চেষ্টা করা হয়েছে পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে। অর্থপ্রবাহ নিয়ে সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়। তখন শ্রমিকদের প্রাপ্য নিয়মিত পরিশোধ মুশকিল হয়ে যায়। ফলে শ্রম অসন্তোষের ঘটনা ঘটে। ব্যবসা থেকে, ঋণ করে, নিজস্ব উৎস থেকে অর্থ নিয়ে সব উপায়ে মসৃণভাবে কারখানা পরিচালনার চেষ্টা করেন মালিক। কিন্তু তার পরও কিছু সমস্যা রয়ে যায়। ফলে শ্রম অসন্তোষ হয়। সব দিক বিবেচনায় ঈদুল আজহার পর থেকে সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ।

স্টাইলক্রাফট লিমিটেডের পরিচালক ও এম শামসুর রহমানের আরেক সন্তান শরীফ আলমাস রহমান বলেন, যে প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে পোশাক খাতের যাত্রা হয়, সেগুলো সব এখন ব্যবসায়ও নেই। দেশ গার্মেন্টস, আমাদের স্টাইলক্রাফটসহ দু-তিনটি প্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলো এখনো ব্যবসায় টিকে আছে। কিন্তু এ ব্যবসায় যা হয়, একটা বড় গ্যাপ পড়ে গেলে রাতারাতি কাটিয়ে ওঠা যায় না। পরিস্থিতি মোকাবেলায় হিমশিম খেতে হয়েছে। আমরা এরই মধ্যে একটা তারিখ নির্ধারণ করেছি। নিশ্চিতভাবেই ওই সময়ের মধ্যে কারখানা পুনরায় চালু করতে পারব। ১৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কারখানা চালু করতে পারব বলে মনে করছি। শ্রমিকদের পাওনা ধাপে ধাপে মিটিয়ে দেয়া হবে। যদি শ্রমিকদের পাওনা বুঝিয়ে দিতে না পারি, সেক্ষেত্রে একটা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দেয়া হবে, প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে কোনো ক্রেতা যদি পাওয়া যায়, তাহলে সম্পদ বিক্রি করে শ্রমিকের পাওনা বুঝিয়ে দেয়া হবে। ওই পরিস্থিতি আসবে বলে মনে করছি না। আমি আশাবাদী। এ মুহূর্তে কারখানায় কাজও আছে।

উত্তরসূরি হিসেবে ব্যবসায় যথেষ্ট মনোযোগী নন—এমন দাবি অস্বীকার করে শরীফ আলমাস রহমান বলেন, হয়তো অব্যবস্থাপনাসহ অন্য কিছু ইস্যু ছিল। তবে ব্যবসায় ফোকাসড ছিলাম না, এটা সঠিক নয়। আমাদের পণ্যের বড় ক্রেতা যতদিন ছিল ততদিন এসব বিষয়ে কেউ প্রশ্ন করেনি। আমার বাবা ৭৯ বছর বয়সে মারা যান। তার আগ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন কোম্পানির এমডি ও চেয়ারম্যান। তবে তিনি ব্যবসার দৈনন্দিক কার্যক্রম পরিচালনায় অংশ নিতেন না। সব দিক দেখাশোনার জন্য পর্ষদেরই একজন সদস্য নিয়োজিত ছিলেন। এভাবে ধাপে ধাপে গত ২০ বছরে আজকের অবস্থানে এসেছে ব্যবসা।

গত চার বছরে স্টাইলক্রাফটের আর্থিক পারফরম্যান্স পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৬-১৭ হিসাব বছরে কোম্পানিটির বিক্রি ছিল ৩০৯ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে বিক্রির পরিমাণ বেড়ে যথাক্রমে ৩২৫ ও ৩৫১ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। সর্বশেষ ২০১৯-২০ হিসাব বছর শেষে কোম্পানিটির বিক্রি দাঁড়িয়েছে ২০৫ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ হিসাব বছরে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ছিল ২ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, যা পরের তিন হিসাব বছরে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩ কোটি ৫৮ লাখ, ৩ কোটি ৯১ লাখ ও ৬৬ লাখ ৯০ হাজার টাকায়।

সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২০-২১ হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে (জুলাই-মার্চ) কোম্পানিটির বিক্রি হয়েছে ৯৮ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে বিক্রি ছিল ১৬৮ কোটি টাকা। গত হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে ৭ লাখ টাকা কর-পরবর্তী নিট লোকসান হয়েছে কোম্পানিটির, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ১ কোটি ৫৮ লাখ টাকার নিট মুনাফা হয়েছিল।

৩০ জুন সমাপ্ত ২০২০ হিসাব বছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ দিয়েছে স্টাইলক্রাফট। আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ছিল ৫৩ পয়সা, আগের হিসাব বছরে যা ছিল ৩ টাকা ১০ পয়সা (পুনর্মূল্যায়িত)। ৩০ জুন কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়ায় ২৬ টাকা ৯৬ পয়সা, আগের হিসাব বছর শেষে যা ছিল ২৬ টাকা ৪৩ পয়সা (পুনর্মূল্যায়িত)।

২০১৯ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ১৫০ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ দিয়েছিল স্টাইলক্রাফট। ২০১৮ হিসাব বছরে ৪১০ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ দিয়েছিল তারা। এছাড়া ২০১৭ হিসাব বছরে ১০ শতাংশ নগদ ও ৮০ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ পেয়েছিলেন কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডাররা।

১৯৮৩ সালে তালিকাভুক্ত স্টাইলক্রাফটের অনুমোদিত মূলধন ৫০ কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ১৩ কোটি ৮৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। রিজার্ভে রয়েছে ২০ কোটি ১৪ লাখ টাকা। মোট শেয়ার সংখ্যা ১ কোটি ৩৮ লাখ ৮৪ হাজার ৭৫০। এর মধ্যে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে ৩৮ দশমিক ৮১, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ৭ দশমিক ৯৩ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে বাকি ৫৩ দশমিক ২৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

ডিএসইতে সোমবার স্টাইলক্রাফটের শেয়ার সর্বশেষ ১৯৪ টাকা ৯০ পয়সায় হাতবদল হয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর কোম্পানিটির শেয়ারদর ছিল ৯১৯ টাকা ৭০ পয়সা।

 

তথ্যসূত্র : বণিক বার্তা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close