গাজীপুর

কালীগঞ্জে রাব্বি হত্যা: সে দিন যা ঘটেছিল, গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য গোপন?

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : কালীগঞ্জে নিখোঁজের দুই দিন পর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে রাব্বি হাসান(১৯) নামে এক তরুণের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় যতই দিন যাচ্ছে ততই রহস্য আর গোলকধাঁধার জন্ম দিচ্ছে। পুলিশ গোপন করেছে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য!

মামলা সংক্রান্ত নথিপত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর এমই কিছু তথ্য।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ডের পর ইতিমধ্যে কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এ কে এম মিজানুল হককে থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে গত রোববার (১আগস্ট)।

অপরদিকে প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করে দুই দিনের রিমান্ড শেষ করে কারাগারে পাঠানো হলে অন্য আসামিরা এখনো পর্যন্ত পলাতক রয়েছে।

নিহত রাব্বি হাসান কালীগঞ্জের তুমুলিয়া ইউনিয়নের টিউরি গ্রামের খোকন মিয়ার ছেলে।

গত বৃহস্পতিবার (২৯ জুলাই) সকাল সাড়ে আটটার দিকে নিহতের বাবা খোকন মিয়া বাদি হয়ে কালীগঞ্জ থানায় হত্যা ও লাশ গুমের অভিযোগ এনে ৩০২,২০১ ও ৩৪ ধারায় চার জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত আরো ৫-৬ জনের নামে মামলা দায়ের করেন [মামলা নাম্বার ২৩(৭)২১]।

অভিযুক্ত আসামিরা হলো: কালীগঞ্জের মধ্যে ভাদার্ত্তী এলাকার নজরুল ইসলামের ছেলে শান্ত (২৩), দক্ষিণ ভাদার্ত্তী এলাকার কাশেম মিয়ার ছেলে ইকবাল(২৬), জামালপুর এলাকার রানা (৩০) এবং বালীগাঁও এলাকার নাদিম (৩০)।


ঘটনার সূত্রপাত ও পুলিশের ভূমিকা

গ্রেপ্তার প্রধান আসামি শান্তর স্বজন ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার দিন গত ২৭ জুলাই (মঙ্গলবার) বিকেলে আনুমানিক ৫টার দিকে ইউনিফর্ম ব্যতিত মাদক উদ্ধারের নামে কালীগঞ্জ পৌরসভার আড়িখোলা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন কালীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শহিদুল ইসলাম ও সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আ: ছামাদ। সঙ্গে ছিল কয়েকজন সোর্স। সে সময় শান্তকে আটক করে পুলিশ। তার দেহ তল্লাশি করে মাদক পাওয়া যায়নি। পরে শান্তকে মাদক ব্যবসায়ী ধরিয়ে দিতে বলে পুলিশ। শান্ত পুলিশকে জানায় বঙ্গবন্ধু এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে জাহাজে মাদকাসক্তদের পাওয়া যেতে পারে। এরপর কয়েক ঘন্টা শান্তকে সাথে নিয়ে পুলিশ আশপাশের এলাকায় সময় অতিবাহিত করে। পরে রাত আনুমানিক সাড়ে আটটার দিকে বঙ্গবন্ধু এলাকায় যায়। সে সময় শান্ত ছাড়াও পুলিশের সাথে ছিল সোর্স ইকবাল, রানা এবং নাদিম। তারা সকলেই নদীর তীরে অপেক্ষায় থেকে রানাকে মাদক কেনার জন্য শীতলক্ষ্যা নদীতে নোঙ্গর করা “এসভি মিথিলা সালমান” নামক জাহাজে পাঠায়। রানা জাহাজের ভেতরে গেলে জাহাজে থাকা স্থানীয় যুবকদের সাথে তার কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে রানা নিজেকে পুলিশের সোর্স হিসেবে পরিচয় দেয়। ওই সময় জাহাজের মাস্টারসহ তার কয়েকজন সহকারী ও রাব্বিসহ তার কয়েক বন্ধু ও এলাকার স্থানীয় প্রায় ১০‐১৫ জন যুবক জাহাজে অবস্থান করছিল। সে সময় নদীর তীরে অপেক্ষায় থেকে পুলিশ সদস্যসহ সোর্সদের জাহাজে যেতে চিৎকার করে ডাকতে থাকে রানা। ডাকে সাড়া দিয়ে তারা জাহাজে যাওয়ার পর পুলিশের উপস্থিতি বুঝতে পেরে ভয়ে জাহাজে থাকা রাব্বির কয়েক বন্ধু ও এলাকার স্থানীয় যুবকরা লাফালাফি করে জাহাজ থেকে পালিয়ে যায়। সে সময় রাব্বিসহ কয়েকজন নদীতে লাফিয়ে পরে। পরে তাদের ধরতে পুলিশের নির্দেশ মতো শান্ত নদীতে ঝাঁপ দেয়। একপর্যায়ে শান্ত নদী থেকে তাকে উদ্ধারে করতে সাহায্য চেয়ে ডাকতে থাকে। পরে ইকবার ও রানা নদীতে নেমে তাকে উদ্ধার করে। আর শান্ত নিখোঁজ হয়। অন্যরা পালিয়ে যায়। এরপর প্রায় দুই ঘন্টা ওই এলাকায় পুলিশসহ তারা সকলে অবস্থান করে রাব্বিকে না পেয়ে চলে আসে।

এর মধ্যেই বঙ্গবন্ধু বাজারে থাকা লোকজনও জড়ো হয় শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে। তারা দেখতে পায় এসকল ঘটনা।

এর পরদিন ২৮ জুলাই (বুধবার) কালীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শহিদুল ইসলাম ১৫১ ধারা অনুযায়ী দুই আসামিকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠান।

আসামিদের সঙ্গে আদালতে পাঠানো ওই দিনের প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, “কালীগঞ্জ থানার জিডি নং১৪২৪ (তারিখ ২৮-৭-২১) সূত্রে গ্রেপ্তার আসামি দক্ষিণ ভাদার্ত্তী এলাকার শিপন মিয়ার ছেলে সাজেদ মিয়া (১৬) ও মধ্যে ভাদার্ত্তী এলাকার নজরুল ইসলামের ছেলে সাইদুল ইসলাম শান্তকে (২১) পুলিশ পাহারায় আদালতে সোপর্দ পূর্বক এই প্রতিবেদন দাখিল করতেছি যে, আমি সংগীয় অফিসার ফোর্স সহ জিডি মূলে কালীগঞ্জ থানার সোম বাজারের রাস্তা দিয়ে দক্ষিণ সোম বঙ্গবন্ধু বাজার এলাকায় থাকা চায়না ফ্যাক্টরি দিকে যাওয়ার পথে ২৭ জুলাই রাত আনুমানিক পৌণে এগারোটা দিকে দক্ষিণ সোম হিমু বুবুর (NCG) ইটখোলার পূর্ব পাশে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে অবস্থানরত একটি শীপের মধ্যে হৈ হট্টগোল শুনে শীপে গিয়ে দেখি দুই পক্ষ মাদকসহ পূর্বশত্রুতাকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি মারপিটে লিপ্ত। ঘটনাস্থলে বড় ধরনের ধর্তব্য অপরাধ নিবারনের লক্ষে দুই আসামীকে ১৫১ ধারা মূলে গ্রেপ্তার করে হেফাজতে নেই। এসময় উভয় পক্ষের কয়েকজন দৌড়ে পালিয়ে যায় এবং কয়েকজন নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কে বা কারা নদী ঝাঁপিয়ে পড়েছে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।”

gazipurkontho
নিহত রাব্বি হাসান এবং প্রধান আসামি শান্ত।

অভিযুক্তরা সকলেই পুলিশের সোর্স

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন মামলার এজাহারভুক্ত সকল আসামিই থানা পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করতেন।

ঘটনার পর ২৮ জুলাই সকালে পুলিশের সোর্স ইকবাল বলেছিলেন, মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বঙ্গবন্ধু এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে থাকা একটি জাহাজে বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ীসহ প্রায় ১৫-২০ জন যুবক অবস্থান করছিল। সে সময় কালীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শহিদুল ইসলাম এবং সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আ: ছামাদ এবং পুলিশের সহযোগী হিসেবে আমিসহ শান্ত, নাদিম ও রানা শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে যাই। পরে রানাকে মাদক কেনার জন্য জাহাজে পাঠানো হয়। এর কিছু সময় পর জাহাজে দুই পক্ষের মধ্য মারামারি লাগে। সে সময় আমারা জাহাজে ধাওয়া দিলে কয়েকজন পালিয়ে যায়, রাব্বিসহ কয়েকজন নদীতে লাফ দেয়। তখন রাব্বিকে ধরতে শান্ত ও রানাও নদীতে লাফ দেয়। পরে শান্ত ও রানাকে উদ্ধার করতে আমিও নদীতে নামি। আমারা নদী থেকে পাড়ে উঠে আসলেও রাব্বিকে আর ধরতে পারিনি। এরপর নদীর পাড়ে কয়েক ঘন্টা অপেক্ষা করে আমরা চলে আসি।

এরপর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের দেয়া ঘটনার বর্ণনা

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘটনার সময় শীতলক্ষ্যা নদীতে নোঙ্গর করা “এসভি মিথিলা সালমান” জাহাজে উপস্থিত ছিলো জাহাজের সহকারী মাস্টার (পরিচালক) চট্টগ্রামের মিরেরশরাই থানার উত্তর কাজী গ্রামের নুরুল আমিনের ছেলে নজরুল ইসলাম (৩০) ও ফেনীর ডাগনভূইয়া থানার পূর্ব চন্দ্রপুর গ্রামের আব্দুল মান্নানের ছেলে আব্দুর রেজ্জাক (২০), জাহাজের সুপারভাইজার চট্টগ্রামের হালিশহর থানার বড়কুল এলাকার নুর মিয়ার ছেলে রাসেল (২০), জাহাজের লস্কর (শ্রমিক) বাগেরহাট জেলার রামপাল থানার মল্লিকের বের এলাকার ইয়াকুব আলীর ছেলে লিটন (৩০) এবং জাহাজের ইঞ্জিনের মেকানিকের সরকারী চট্টগ্রামের মিরেরশরাই থানার কাজী তাল্লুক এলাকার নুরুর আফসারের ছেলে শাকিল (২৪)।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ওই দিন রাত আনুমানিক সাড়ে আটটার দিকে পুলিশ জাহাজে অভিযানে যায়। সে সময় অনেকেই লাফালাফি করে জাহাজ থেকে নেমে পালিয়ে যায়। কয়েকজন নদীতে লাফিয়ে পরে। পুলিশসহ তাদের সহযোগীরা কয়েক ঘন্টা ওই এলাকায় অবস্থান করেন সে সময়। পরে তারা চলে যায়।

ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা প্রত্যক্ষদর্শী “এসভি মিথিলা সালমান” জাহাজের সহকারী মাস্টার নজরুল ইসলাম তাদের সকলে উপস্থিত থাকার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, মঙ্গলবার রাত আনুমানিক সাড়ে আটটার দিকে আমিসহ স্থানীয় আরো কয়েকজন জাহাজে থানা নামাজের জন্য নির্ধারিত স্থানে এশার নামাজ আদায় করছিলাম। নামাজ শেষ হওয়ার পূর্বেই জাহাজের দোতলায় পুলিশ এসেছে বলে জানতে পারি। পরে নামাজের সালাম ফিরিয়ে মোনাজাত করার আগেই নিচে গিয়ে দেখতেই পাই জাহাজে থাকা কয়েকজন যুবক লাফালাফি করে নিচে নামছে আর কয়েকজন নদীতে লাফিয়ে পড়েছে। সে সময় কয়েকজন নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়েছেন তবে তারা ইউনিফর্ম ব্যতিত ছিলেন। প্রায় এক ঘন্টা তারা জাহাজে অবস্থান করে বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি করে কিছু না পেয়ে এক তরুণকে আটক করে জাহাজ থেকে নেমে চলে যায়। জাহাজে মাদক ব্যবসায়ী থাকতে পারে এমন সন্দেহে তল্লাশি করা হয়েছে বলে সে সময় জানিয়েছিল পুলিশ। যদিও সে সময় মাদক সংক্রান্ত কোন আলামত উদ্ধার বা জব্দ করেছে পারেনি পুলিশ। জাহাজে মারামারির কোন ঘটনা ঘটেনি সে সময়। শুধু উচ্চ বাক্যবিনিময়ের শব্দ শুনেছি। এর একদিন পর নদী থেকে এক যুবকের লাশ উদ্ধারের খবর পাই। পরে জানতে পারি ওই দিন জাহাজ থেকে নদীতে ঝাঁপ দেয়াদের একজন সে। এরপর পুলিশ এসে আমাদের সকলের নাম-পরিচয় ও মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করে নিয়ে গেছেন এবং আমাদের জাহাজের মালামাল আনলোড করতে নিষেধ করেছেন।

জাহাজের সুপারভাইজার রাসেল বলেন, শীতলক্ষ্যা নদীতে নোঙ্গর করা আমাদের “এসভি মিথিলা সালমান” জাহাজে সারা দিনই এলাকার নারী-পুরুষ ও মুরুব্বিরা ঘুরতে আসতো। ঘটনার দিনও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ওই দিন রাত আনুমানিক সাড়ে আটটার দিকে আমিসহ আরো কয়েকজন জাহাজের ক্যারাম বোর্ড খেলছিলাম। এক পর্যায়ে শুনতে পাই জাহাজে পুলিশ অভিযান চালছে। সে সময় আমরা দোতলায় যাই। পরে কয়েকজন লোক দেখতে পাই। তারা নিজেদের পুলিশ পরিচয় দেন। পরে আমারা দেখি কয়েকজন যুবক লাফালাফি করে জাহাজ থেকে নিচে পালিয়ে যাচ্ছে। আর কয়েকজন শীতলক্ষ্যা নদীতে ঝাঁপ দিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, পুলিশ পরিচয় দেয়া ওই লোকজনের ইউনিফর্ম ছিলো না। তবে তাদের সঙ্গে হাতকড়া ছিল। তারা আমাদের বলেন জাহাজের লোকজনকে একসঙ্গে দাঁড়াতে। অন্যরা আলাদা হয়ে দাঁড়াতে। জাহাজে মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছেন সে সময়। পরে তারা জাহাজে তল্লাশি করেন। প্রায় এক ঘন্টা চলে ওই তল্লাশি। এরপর কিছু না পেলেও এক তরুণকে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। এরমধ্যে এলাকার লোকজন জাহাজের কাছে ভিড় করেন। এর একদিন পর লাশ উদ্ধারের খবর পাই। পরে একদিন পুলিশ জাহাজে এসে আমাদের নাম-পরিচয় ও মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করে নিয়ে গেছেন।

ঘটনার সময় রাব্বির সঙ্গে জাহাজে ছিল তার চার বন্ধু

জানা গেছে, ঘটনার সময় রাব্বির সঙ্গে জাহাজে ছিল তার চার বন্ধু টিউরি এলাকার শিবলুর ছেলে সজিব(১৮), আব্দুল হাইয়ের ছেলে রিয়াদ(১৮), নজরুল ইসলামের ছেলে জিহাদ(১৮) এবং আবজাল মিয়ার ছেলে তায়েব(১৯)।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৭ জুলাই (মঙ্গলবার) রাত আনুমানিক সাড়ে আটটার দিকে রাব্বিসহ তারা সকলে মিলে জাহাজের তিন তলার ছাদে বসে লুডু খেলছিল। জাহাজে আরো প্রায় ১৫-২০ জন বিভিন্ন স্থানে যে যার মতো আড্ডা দিচ্ছিল। এক পর্যায়ে হঠাৎ করে দোতলায় পুলিশ এসেছে শুনে ভয়ে জাহাজে থাকা লোকজন দৌড়ঝাঁপ করছে এমন শব্দ শুনতে পায় তারা। সে সময় দোতলা থেকে কোন একজন তাকে বাঁচানোর আকুতি জানালে উপর থেকে প্রথমে রাব্বি নিচে নামে। পরে অন্যরা উঁকি দিয়ে নিচে দৌড়ঝাঁপ দেখে যে যার যার মতো পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করে। তাদের মধ্যে তায়েব ও সজিব পুলিশের মুখোমুখি হয়। পরে তাদের দেহ তল্লাশি করে পুলিশ পরিচয় দেয়া দেওয়া লোকজন। পরে তারা জাহাজ থেকে পালিয়ে নেমে যায়। কিন্তু রাব্বিকে আর খুঁজে পায়নি। এর কিছু সময় পর তারা চারজন একত্রিত হলেও রাব্বি আসেনি। পরে তারা চারজন রাব্বির বাড়িতে খবর দিতে যায়। সে সময় রাব্বির বাড়ির কাছাকাছি গেলে তারা শুনতে পায় রাব্বির বাবা মোবাইল ফোনে কাউকে বকা দিচ্ছে রাব্বি কেন জাহাজে গিয়েছিল সেই বিষয়ে। পরে ভয়ে তারা আর বাড়ির ভেতরে প্রবেশ না করে ফিরে আসে। কিছু সময় চারদিকে রাব্বিকে খোঁজাখুঁজি করে পরে যার যার বাড়িতে চলে যায়। সকাল পর্যন্ত রাব্বি বাড়িতে না ফিরলে তারা আবার জাহাজে যায় তাকে খুঁজতে। সে সময় জাহাজে থাকা কয়েকজন জানায় রাতে জাহাজ থেকে কয়েকজন নদীতে ঝাঁপ দিয়েছেন। সে সময় পেছনে আবার কয়েকজন নদীতে নেমে তাদের ধাওয়া করেছে। এর একদিন পর বৃহস্পতিবার ভোর রাতে নদী থেকে রাব্বির লাশ পাওয়া যায়।

তারা আরো বলেন, ঘটনার সময় পুলিশের কোন ইউনিফর্ম ছিলো না। তারা প্রায় এক ঘন্টা ব্যাপী জাহাজে অভিযান পরিচালনা করেন। অনেককেই তারা মারধর করেছে। আবার কেউ কেউ নদীতে ঝাঁপ দিয়েছে এমন শব্দ শুনতে পেয়েছি। কিন্তু অন্ধকার থাকায় কাউকে চিনতে পারিনি। ওই সময় পুলিশ পরিচয় দেওয়া লোক ছিল প্রায় পাঁচ-ছয়জন।

এছাড়াও শনিবার রাত আনুমানিক সাড়ে বারোটার দিকে তাদের চারজনকে থানায় ডেকে নিয়ে রাতভর আলাদা আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। পরে সকালে বাড়ি ফিরেছে বলেও জানায় তারা।

হত্যা ও লাশ গুমের অভিযোগে মামলা

মামলার এজাহারে সূত্রে জানা গেছে, “গত ২৭ জুলাই (মঙ্গলবার) রাত আনুমানিক সাড়ে দশটার দিকে কালীগঞ্জের তুমুলিয়া ইউনিয়নের বঙ্গবন্ধু বাজারের দক্ষিণ পাশে এনসিজি ইটভাটা সংলগ্ন এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে নোঙ্গর করা এসভি মিথিলা সালমান নামক জাহাজে রাব্বি হাসান, সজিব, রিয়াদ, জিহাদ, তায়েব এবং ভাদার্ত্তী এলাকার ফারুকের ছেলে রনি(১৮) মোবাইল ফোনে গেমস খেলার সময় অপর আরেকটি জাহাজে হঠাৎ চিৎকারের আওয়াজ শুনতে পেয়ে তারা নিচে নেমে আসে। সে সময় অভিযুক্ত চারজনসহ অজ্ঞাত আরও ৪-৫ জন বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে রাব্বিসহ তার সঙ্গীদের চারদিকে ঘিরে ফেলে এবং রাব্বির শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারধর করে গুরুতর জখম করে। পরে লাথি দিয়ে রাব্বিকে নদীতে ফেলে দেয়। পরে আসামি শান্ত পানিতে লাফ দিয়ে রাব্বিকে পানিতে ডুবিয়ে রাখতে থাকে এবং ইকবাল পানিতে নেমে দুইজন মিলে রাব্বিকে পানিতে ডুবাতে থাকে। পরে রাব্বির দেহ নিস্তেজ হয়ে গেলে অর্থাৎ মৃত্যু নিশ্চিত করে তারা রাব্বিকে পানিতে রেখে উঠে আসে এবং অন্যরাসহ পালিয়ে যাওয়ার সময় ঘটনাস্থল সংলগ্ন বঙ্গবন্ধু বাজারে ডিউটিতে থাকা কালীগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শহিদুল ইসলাম ও এএসআই আ: ছামাদ হৈ চৈ শুনে এগিয়ে যায়। পরে শান্ত ও সাজেদ নামে দু’জনকে থানায় নিয়ে যায়। রাব্বি যথা সময়ে বাড়িতে না ফেরায় তাকে বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করে না পাওয়ায় তার সঙ্গীদের রাব্বির বিষয়ে জিজ্ঞেস করে ঘটনা জানতে পেরে টঙ্গী থেকে ডুবুরি দলকে সংবাদ দিয়ে এনে শীতলক্ষ্যা নদীতে তল্লাশি চালানো হয়। কিন্তু রাব্বির কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে ২৮ জুলাই আনুমানিক ভোর ৪টার সময় তুমুলিয়া ইউনিয়নের বড়িহাটি এলাকায় বিএমসি লবণ ফ্যাক্টরির উত্তর পাশে শীতলক্ষ্যা নদীতে লাশ দেখতে পেয়ে থানায় খবর দিলে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। অভিযুক্ত আসামিরা রাব্বিকে মারধর করে এবং পানিতে ডুবিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে রাত আনুমানিক সাড়ে দশটার দিকে পানিতে রেখে চলে আসে।”

মামলার বাদী নিহত রাব্বির বাবা খোকন মিয়া বলেন, রাব্বি নিখোঁজ হওয়ার পর স্থানীয়দের মাধ্যমে জানতে পারি জাহাজে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে কয়েকজন নদীতে লাফিয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে রাব্বিও ছিল। এর একদিন পর শীতলক্ষ্যা নদীতে রাব্বির লাশ পাওয়া যায়। তার দেহের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিলো।

তিনি আরো বলেন, ঘটনার দিন রাত আনুমানিক সাড়ে আটটার দিকে জাহাজে অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ ও তাদের কয়কজন সোর্স। সে সময় পুলিশের সোর্সরা রাব্বিকে মারধর করে নদীতে ফেলে দেয়। কিন্তু রাব্বি নিখোঁজের পরও বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে পুলিশ। আমাদেরকে কিছুই জানায়নি। লাশ উদ্ধারের পর প্রথমে পুলিশের দুই সদস্যসহ সাত জনের নামে এজাহার দায়ের করলেও মামলার নেয়নি পুলিশ। পরে থানার কম্পিউটার অপারেটর নতুন করে তাদের মন মতো এজাহার লিখে আমাকে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে। এরপর পুলিশের নাম ও কিছু তথ্য পরিবর্ত করে মামলা নেয় পুলিশ।

ঘটনার অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব থাকা সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ঘটনার দিন রাত সাড়ে আটটা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত অভিযুক্ত পুলিশের দুই অফিসার ঘটনাস্থল এলাকায় উপস্থিত ছিলেন বলে।

আসামি শান্তকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ড

৩০ জুলাই (শুক্রবার) ভোর রাতে প্রধান আসামি শান্তকে নরসিংদীর সদর এলাকা থেকে শান্তকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দশ দিনের রিমান্ড চেয়ে ওই দিনই আদালতে পাঠায় পুলিশ।

পরে শুক্রবার (৩০ জুলাই) বিকেলে রিমান্ড শুনানির পর গাজীপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক শেখ নাজমুন নাহার দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। দুই দিন রিমান্ড নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর রোববার (২ আগস্ট) শান্তকে আদালতের মাধ্যমকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

রিমান্ড আবেদনে পুলিশ উল্লেখ করেন, গত ২৭ জুলাই (মঙ্গলবার) রাত সোয়া দশটার দিকে কালীগঞ্জের তুমুলিয়া ইউনিয়নের বঙ্গবন্ধু বাজারের দক্ষিণ পাশে এনসিজি ইটভাটা সংলগ্ন এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে নোঙ্গর করা এসভি মিথিলা সালমান নামক জাহাজে গ্রেপ্তার শান্তসহ অভিযুক্ত আসামিরা পূর্ব শত্রুতার জের ধরে রাব্বি হাসানসহ তার সঙ্গীদের ঘেরাও করে রাব্বিকে মারধর করে লাথি মেরে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয়। পরে আসামি শান্ত নদীতে ঝাঁপ দিয়ে নেমে রাব্বিকে ডুবাইতে থাকে এবং অপর আসামি ইকবালও নদীতে ঝাঁপ দিয়ে নেমে দু’জনে মিলে রাব্বিকে নদীর পানিতে ডুবিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। পরে রাত সাড়ে এগারোটা দিকে তারা রাব্বিকে পানিতে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে ডুবুরি দল নদীতে খোঁজাখুঁজি করেও রাব্বির লাশের সন্ধান পায়নি। এরপর ২৯ জুলাই (বৃহস্পতিবার) ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে তুমুলিয়া ইউনিয়নের বড়িহাটি এলাকার বিএমসি লবণ কারখানাল উত্তর পাশে শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসমান অবস্থায় রাব্বির লাশ পাওয়া যায়। গ্রেপ্তার শান্তকে ঘটনার বিষয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যায়। সময় স্বল্পতার কারণে তাকে ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হয়নি। মামলার সুষ্ঠ তদন্ত ও ন্যায় বিচারের স্বার্থে মামলার এজাহারনামীয় সহ অজ্ঞাত পলাতক আসামিদের শনাক্ত, অবস্থান নির্ণয়, পূর্ণ নাম-ঠিকানা সংগ্রহ, গ্রেপ্তার ও মামলার ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটনে আসামিকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে ব্যাপক ও নিবিড় ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা এবং আসামিসহ গ্রেপ্তাতারী ও তল্লাশি অভিযান পরিচালনার জন্য আসামিকে ১০ দিনের রিমান্ড প্রয়োজন।

পুলিশের বক্তব্য

ঘটনার পর ২৮ জুলাই কালীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শহীদুল ইসলাম এবং সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আ: ছামাদ বলেছিলেন, মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বঙ্গবন্ধু এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে নোঙর করা একটি জাহাজে মাদক উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করা হয়। সে সময় রাব্বি নামে এক যুবক নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পালিয়ে যায়। অভিযানে পুলিশের সোর্স হিসেবে নয় পুলিশের সহযোগী হিসেবে ইকবাল, শান্ত, নাদিম ও রানাও আমাদের সঙ্গে ছিল।

এরপর কয়েকবার তাঁদের মোবাইল ফোনে কল করলেও তাঁরা এ বিষয়ে আর কোন বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কালীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাদিকুর রহমান বলেন, শুক্রবার ভোর রাতে রাব্বি হত্যা মামলার প্রধান আসামি শান্তকে নরসিংদী সদর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। আসামিকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দশ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করা হলে দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। পরে শান্তকে রিমান্ড নিয়ে দুই দিন জিজ্ঞাসাবাদের পর রোববার (১ আগস্ট) শান্তকে আদালতের মাধ্যমকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পলাতক অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলছে।

এসকল বিষয়ে জানতে মামলার তদারকি কর্মকর্তা কালীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফারজানা ইয়াসমিনের সরকারি মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

 

আরো জানতে….

কালীগঞ্জ থেকে মিজানুল হককে সরিয়ে ওসি হিসেবে আনিসুর রহমানকে পদায়ন

কালীগঞ্জে নদী থেকে লাশ উদ্ধার: রাব্বিকে মারধর করে নদীতে ফেলে ডুবিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে ২ আসামি

কালীগঞ্জে পুলিশের ধাওয়ায় শীতলক্ষ্যায় নিখোঁজ রাব্বির ‘আঘাতপ্রাপ্ত’ লাশ উদ্ধার

কালীগঞ্জে পুলিশের ধাওয়ায় শীতলক্ষায় ঝাঁপ দিয়ে যুবক নিখোঁজ, উদ্ধার অভিযানে ডুবুরি দল

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close