আন্তর্জাতিকআলোচিতবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

পেগাসাস: নজরদারিতে আড়িপাতার খরচ কত?

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ‘পেগাসাস’ শব্দটি বললে এখন আর গ্রিক পুরাণের ডানাওয়ালা সেই ঘোড়ার ছবি মাথায় আসে না। আসে এক গোপন চোখ ও কানের ছবি। আজকাল বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর রাষ্ট্রীয় নজরদারিতে ব্যবহার করা হচ্ছে পেগাসাস নামের এই স্পাইওয়্যার। ইসরায়েলের এনএসও গ্রুপের তৈরি এই গুপ্তচর সফটওয়্যার শুধু আড়ি পাতাতেই নয়, নির্দিষ্ট নম্বরের আওতাধীন স্মার্ট ডিভাইসের যাবতীয় তথ্য চলে যাচ্ছে রাষ্ট্রের উচ্চ মহলের হাতে। অনেকটা ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক জর্জ অরওয়েলের ‘নাইন্টিন এইটটি ফোরের’ মতো। গোপন বলে আপনার আর কিছুই নেই। নিমেষে সবই জেনে যাচ্ছেন ‘বিগব্রাদার’।

এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, কোন কোন রাষ্ট্র এই স্পাইওয়্যার ব্যবহার করেছে? এই চেয়ে বরং বেশি প্রাসঙ্গিক, কে কে করছে না–সে প্রশ্নটি। আজকাল রাষ্ট্র, নিরাপত্তা আর নজরদারি যেন একসূত্রে গাঁথা। সেই নজরদারিকেই নতুন করে আলোচনায় এনেছে ‘পেগাসাস’।

পেগাসাসের এই গোপন কর্মটি এত দিন গোপনেই চলছিল। হঠাৎ করে সেটি সামনে এনে দিল প্যারিসভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ফরবিডেন স্টোরিজ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তাদের যৌথ অনুসন্ধান চালিয়ে পেগাসাস প্রকল্পের আওতায় থাকা ৫০ হাজারের বেশি ফোন নম্বরে আড়ি পাতার খবর ফাঁস করেছিল। একযোগে সেই খবর প্রকাশ করে দিল ১৭টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। এই অনুসন্ধানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘পেগাসাস প্রজেক্ট’।

অনুসন্ধানে বের হয়ে আসা ফোন নম্বরগুলোর মালিকের পরিচয় রীতিমতো গোটা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। এ তালিকায় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ যেমন রয়েছেন, তেমনি আছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী থেকে শুরু করে নির্বাচন কৌশুলী প্রশান্ত কিশোরসহ বহু সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী আছেন তালিকায়।

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে তথ্যের নিরাপত্তা এখন এক বিরাট বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হবে নাই-বা কেন? স্মার্ট ডিভাইস তো এখন হাতে হাতে। স্মার্টফোন না হলেও যোগাযোগের প্রয়োজনে মানুষ কোনো না কোনো ডিভাইস সঙ্গে রাখছেন। সেখানে থাকছে তার পরিচিতদের নম্বর, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর থেকে শুরু করে নানা তথ্য। ব্যক্তিগত মেসেজ বা অডিও-ভিডিও বা ছবির কথা না হয় বাদই গেল। মানুষের জীবনের এখন দুটি দিক—একটি চিরচেনা বাস্তব, অন্যটি ভার্চুয়াল। ফলে ভার্চুয়াল এই জগতের তথ্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পরাশক্তিগুলো একটি আরেকটির এই ভার্চুয়াল তথ্য হাতিয়ে নিতে কী না করছে? এ নিয়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কিংবা চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি দোষারোপ তো এখন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি ডিভাইস, সফটওয়্যার, ই–মেইল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মের রয়েছে সুনির্দিষ্টভাবে ঘোষিত ব্যক্তিগত গোপনীয়তার নীতি। যেকোনো সচেতন গ্রাহক এই নীতিটি খুব সতর্কতার সঙ্গে পাঠ করেন। কিন্তু পেগাসাস-কাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেখা যাচ্ছে, এই সতর্কতা কেবল নামেই, কোনো কাজে আসছে না।

কী এই পেগাসাস?
আগেই বলা হয়েছে, এটি একটি স্পাইওয়্যার। সোজা বাংলায় ভার্চুয়াল গুপ্তচর। বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ফোন, কম্পিউটার বা ট্যাবে ঢুকে তথ্য হাতিয়ে নেওয়াই এর কাজ। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, নিভ কারমি, শালেভ হুলিও ও ওমরি লাভিয়ে নামের তিন ইসরায়েলি ২০১০ সালে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যাদের অন্তত দুজন ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক সদস্য। তিনজনই নিজেদের নামের আদ্যক্ষর দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করেন এনএসও। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, লাভিয়ে এবং হুলিও এখনো এনএসওর পরিচালনা পরিষদে আছেন। এই এনএসওই তৈরি করেছে স্পাইওয়্যার পেগাসাস।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের তথ্যমতে, ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান এনএসও গ্রুপ থেকে এই স্পাইওয়্যার কিনে নিজের দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি চালিয়ে আসছে ‘কর্তৃত্ববাদী’ সরকারগুলো। এনএসও অন্তত ৫০টি দেশের সামরিক বাহিনী কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার কাছে ‘পেগাসাস’ বিক্রি করেছে। এই তালিকায় এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো টেলিফোন নম্বর আছে কি না, তা স্পষ্ট করে জানা যায়নি। তবে আড়ি পাতার অভিযোগ উঠেছে ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে। দেশটিতে এটি এতটাই আলোড়ন তুলেছে যে, করোনা মোকাবিলার কর্মকৌশল নিয়ে অনুষ্ঠেয় বৈঠকও বর্জন করেছে বিরোধী দলগুলো।

২০১৬ সালের ২৫ আগস্ট ফোর্বসে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, লাভিয়ে ও হুলিও দুজনই ইসরায়েলের ‘ইউনিট ৮২০০ সিগনালস ইন্টেলিজেন্স আর্ম’-এর সাবেক সদস্য। ইউনিট ৮২০০ হচ্ছে ইসরায়েলের ‘ইন্টেলিজেন্স কোর’-এর একটি অংশ। সরাসরি ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘আইডিএফ ডাইরেক্টরেট অব মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সে’র অধীনে বিভাগটি কাজ করে।

নিভ কারমি, শালেভ হুলিও ও ওমরি লাভিয়ে বেশ ভালো প্রকল্পই হাতে নিয়েছেন বলা যায়। গোটা বিশ্বে এর বাজার যে বেশ ভালো—তা তো এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, বাহরাইন, ভারত, মেক্সিকোসহ বহু দেশ এর ক্রেতা। দেশগুলোর সরকার তার নাগরিকদের দেওয়া করের অর্থ বিপুল পরিমাণে ঢালছে ওপর নজরদারির জন্য। ২০১৬ সালে দ্য গার্ডিয়ানে এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল। সে সময় এনএসও গ্রুপের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, যেকোনো দেশের বৈধ সরকারের কাছে সন্ত্রাস ও অপরাধ দমনে সহযোগিতার অংশ হিসেবে তারা এই প্রযুক্তি বিক্রি করে আসছে। কিন্তু ২০২১ সালে যে তালিকা সামনে এল অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও ফরবিডেন স্টোরিজের মাধ্যমে, সেখানে মাদক ব্যবসায়ী, বৈধ সরকারের কর্তাব্যক্তি, মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, বিরোধীপক্ষের নেতা, গণতান্ত্রিক পথে আন্দোলন করা নেতা, আইনজীবী—সবাইকে এক কাতারে দেখা গেল। ভারতে সেই সাংবাদিকদের নামই পাওয়া গেল তালিকায়, যারা নরেন্দ্র মোদি সরকারের কোনো প্রভাবশালী নেতার বা তাঁর আত্মীয় বা পরিবারের সদস্যদের করা দুর্নীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছেন। এখনো ফাঁস হওয়া নম্বরগুলোর সব মালিকের খোঁজ জানা যায়নি। পুরোটা প্রকাশ হলে আর কার কার দিকে আঙুল উঠবে বলা কঠিন।

পেগাসাস সফটওয়্যারের দাম কত?
পেগাসাস সফটওয়্যারের দাম এই সময়ে কত, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা না গেলেও ২০১৬ সালে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে ধারণা পাওয়া যায়। এনএসও গ্রুপকে উদ্ধৃত করে নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, এই নজরদারি সফটওয়্যার অন্য যেকোনো সফটওয়্যারের চেয়ে ব্যয়বহুল। সফটওয়্যারটি ইনস্টল করতে প্রথমে ৫ লাখ ডলার প্রয়োজন পড়ে। তবে মোবাইল ডিভাইসভেদে খরচের তারতম্য রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, একবার এই পেগাসাস সফটওয়্যার ইনস্টল করতেই খরচ হবে ৫ লাখ মার্কিন ডলার। আইফোন ও অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের জন্য এ খরচ ৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার, ব্ল্যাকবেরি ব্যবহারকারীর জন্য ৫ লাখ ডলার, আর সিমবিয়ান মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর জন্য এই খরচ দাঁড়ায় ৩ লাখ ডলার।

এই খরচের বাইরেও প্রতি ১০০ জন অতিরিক্ত ব্যবহারকারীর ফোনে আড়ি পাতার জন্য খরচ পড়ে ৮ লাখ ডলার, ৫০ ব্যক্তির ক্ষেত্রে ৫ লাখ আর ২০ জন ব্যক্তির ক্ষেত্রে দেড় লাখ ডলার। এ ছাড়া এই সফটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা বাবদ প্রতিবছর মোট ব্যয়ের ১৭ শতাংশ দিতে হয়। সফটওয়্যার ইনস্টল হওয়ার আগেই এক বছরের এই খরচ অগ্রিম নিয়ে নেয় প্রতিষ্ঠানটি।

পেগাসাসই একমাত্র নয়
পেগাসাসই একমাত্র আড়ি পাতার সফটওয়্যার নয়। বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পেগাসাসের বাইরেও ব্যক্তির ফোনে আড়ি পাতার জন্য বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহার করে থাকে। এর একটি হলো ‘ক্যানডিরু’।

ইসরায়েলের তেল আবিবভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ক্যানডিরু তৈরি করেছে সবচেয়ে ব্যয়বহুল আড়ি পাতার সফটওয়্যার। এর নামও দেওয়া হয়েছে কোম্পানির নামে। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এই সফটওয়্যার পেগাসাসের চেয়েও দামি, যার ইনস্টলেশন ব্যয় ২৮ মিলিয়ন (২ কোটি ৮০ লাখ) ডলার।

পেগাসাস ৬০ বার ইনস্টল করলে যে খরচ পড়ে, ক্যানডিরু একবার ইনস্টল করলে সেই খরচ পড়ে। পেগাসাসের মতোই টার্গেট বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্যয়ও বেড়ে যায়। এই একটি সফটওয়্যার দিয়ে আইফোন, অ্যান্ড্রয়েড, ম্যাক, ব্যক্তিগত কম্পিউটার ও ক্লাউড অ্যাকাউন্ট পর্যবেক্ষণ করা যায়।

ড্রপআউট জিপ
যুক্তরাষ্ট্রের এনএসএর তৈরি এই সফটওয়্যার দিয়ে ব্যক্তি পর্যায়ে নজরদারি করে বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থা। ড্রপআউট জিপ ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, বিশেষ করে আইফোনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইনস্টল হয়ে যায়। যার মাধ্যমে সহজেই ব্যবহারকারীদের ফোনের সব মেসেজ, ছবি, ই-মেইল, জিপিও লোকেশন, কল রেকর্ড বের করা সম্ভব।

আরসিএসএ অ্যান্ড্রয়েড
পেগাসাস, ড্রপআউট জিপ, ক্যানডিরুর মতো এটিও একটি আড়ি পাতার সফটওয়্যার। ইতালিভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘হ্যাকিং টিম’ সফটওয়্যারটি তৈরি করেছে। তবে এটি দিয়ে শুধু অ্যান্ড্রয়েড ফোনে আড়ি পাতা যায়। গুগল প্লে স্টোরের অ্যাপসের মাধ্যমে এই সফটওয়্যার ছাড়া হয়। এটা ফোনে ইনস্টল হওয়ার পর ব্যবহারকারীর পুরো ফোনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়।

এক্সোডাস
এই সফটওয়্যার তৈরি করেছে ইতালিভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইসুরভ। এই ম্যালওয়্যারটি টার্গেট ডিভাইসে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহারকারীর কাছ থেকে ওই ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় এবং এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে ফোনের সব তথ্য পাচার হতে থাকে।

পি–৬–জিইও
এটি জিএসএম মোবাইলে ফোন ব্যবহারকারীদের ওপর নজরদারির জন্য ব্যবহার করা হয়। ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান পিকসিক্সের বানানো এই স্পাইওয়্যারের মাধ্যমে গোয়েন্দা সংস্থা জিএসএম, ইউএমটিএ ও এলটিই ব্যবহারকারীদের অবস্থান, ইনকামিং ও আউটগোয়িং কলের সবকিছু শনাক্ত করা যায়।

এবার বলুন, গোপন বলে আপনার আর কিছু থাকল?

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close