অর্থনীতিআইন-আদালতআলোচিতসারাদেশ

ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠান লুটপাটে সহায়তা করেছেন নিরীক্ষক ও আইনজীবীরা!

দুদকের অনুসন্ধান

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ব্যাংক ও আর্থিক খাতে বেশকিছু আলোচিত ঋণ জালিয়াতি ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। পরে তদন্ত চালিয়ে এমন অনেক ঘটনায় আইনজীবী ও নিরীক্ষকদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে এমন কয়েকজন আইনজীবী ও নিরীক্ষকের নাম উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি ও জালিয়াতির মামলাগুলোয় তাদের আসামিও করা হয়েছে।

আর্থিক খাতের আলোচিত চরিত্র প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পিকে হালদার। একসময় আর্থিক খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করেছেন। সে সময় দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন তিনি। নামে-বেনামে প্রচুর অর্থ ঋণ নিয়েছেন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে। দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এ অপকর্মে তিনি আইনজীবী ও নিরীক্ষকদের কাছ থেকে প্রচ্ছন্ন সহায়তা পেয়েছেন।

এবি ব্যাংকের বড় অংকের ঋণ জালিয়াতির ঘটনায়ও দুদকের অনুসন্ধানে আইনজীবীদের নাম উঠে এসেছে। ওই জালিয়াতির ঘটনার সময়ে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের মধ্যে দুজন ছিলেন আইন পেশায় জড়িত। এবি ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় সাবেক চেয়ারম্যান এম ওয়াহিদুল হকসহ তাদের নামও এসেছে। দুদকের মামলায় আসামি করা হয়েছিল তাদেরও। অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে দুবাইয়ে এবি ব্যাংকের ১৬৫ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিয়েছে দুদক। তাদের মধ্যে একজন ব্যারিস্টারও রয়েছেন। মামলাটি এখন আদালতে বিচারাধীন।

আবার বিভিন্ন দুর্নীতির মামলার নথি বিশ্লেষণেও দেখা গিয়েছে, ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে সমাজের প্রসিদ্ধ আইনজীবী ও নিরীক্ষকদের জড়িত থাকার অনেক অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টিকে চরম অবক্ষয় হিসেবে দেখছেন আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা।

ব্যাংক ও আর্থিক খাতের দুর্নীতির মামলাগুলো তদন্তের কাজটি প্রধানত দুদকই করে। খাতটির বিভিন্ন জালিয়াতি ও লুটপাটের তদন্তকারী দুদকের একাধিক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে তাদের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্যমতে, দুর্নীতিবাজরা ব্যাংক লুটের নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। তারা আটঘাট বেঁধে নিশ্চিত মনে ব্যাংক লুট করছে, যাতে কোথাও তার সমস্যা না হয়। ভবিষ্যতে মামলা হলেও যাতে কোনো বিপদ না হয়, সে পথ তারা আগেই ঠিক করে রাখছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, ঋণ জালিয়াতির মতো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কোনো আইনজীবী জড়িত হতে পারেন না। ব্যক্তি হিসেবে কারো যদি এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় বা প্রমাণ হয় এ জাতীয় কর্মকাণ্ডে ইন্ধন দিয়েছেন তাহলে তিনিও সেই অপরাধে দায়ী হবেন।

পিকে হালদারের ঘটনায় আইনজীবী ও নিরীক্ষকদের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা পেয়েছেন দুদকের কর্মকর্তারা। এ ঘটনাকে দেখা হচ্ছে পেশা দুটি থেকে আগত কতিপয়ের ব্যাংক ও আর্থিক খাতের লুটপাটে জড়িয়ে পড়ার আদর্শ কেস স্টাডি হিসেবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুদক সূত্রে জানা গিয়েছে, পিকে হালদারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ব্যারিস্টার নুরুজ্জামান ছিলেন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। বেশ কয়েক বছর সরকারি চাকরির পর একটি ল ফার্ম দেন তিনি। পিকে হালদারের সঙ্গে সখ্যের ভিত্তিতে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পরিচালকও হয়েছিলেন তিনি। পিকে হালদারের ইন্টারন্যাশনাল লিজিং লুটপাটের ঘটনায় অন্য পরিচালকদের মতো নীরবে সমর্থন দিয়ে গিয়েছেন তিনিও। ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের আরেক পরিচালক নাসিম আনোয়ার ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত নিরীক্ষক। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং লুটপাটে পিকে হালদারকে সমর্থন দিয়েছেন তিনি। বিনিময়ে পিকে হালদারের আনুকূল্যে অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন তারা। পিকে হালদারের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের দায়ের করা মামলার ১৫টিতে তারা এজাহারভুক্ত আসামি।

পিকে হালদারের আরেক পরামর্শক উজ্জ্বল কুমার নন্দী একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। পিকে হালদারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান লুটের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধেও। বিনিময়ে পিকে হালদার তাকে আনান কেমিক্যাল, নর্দান জুট মিলস, রাহমান কেমিক্যাল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বানিয়েছেন। পরে তাকে পিপলস লিজিংয়েরও চেয়ারম্যান বানানো হয়। দুদকের পিকে হালদারসংশ্লিষ্ট চার মামলার আসামি উজ্জ্বল কুমার নন্দী বর্তমানে গ্রেফতার হয়ে জেলে আছেন।

আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে উজ্জ্বল কুমার নন্দী বলেছেন, তিনি পিকে হালদারের মাসিক ৫ লাখ টাকায় বেতনভুক্ত অডিটর ছিলেন। পিপলস লিজিংয়ের চেয়ারম্যান হওয়ার যোগ্যতা তার নেই। পিকে হালদারই তাকে এ পদে বসিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি লুট করেন।

পিকে হালদারের খালাতো ভাই অমিতাভ অধিকারী ছিলেন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। পড়াশোনা করেছিলেন আইন বিষয়ে। পিকে হালদারের পরামর্শে চাকরি ছেড়ে তার বিভিন্ন কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হন তিনি। বর্তমানে উজ্জ্বল কুমার নন্দী ও অমিতাভ অধিকারী উভয়েই দুদকের একাধিক মামলার আসামি।

সুকুমার মৃধা ছিলেন একজন কর আইনজীবী। পিকে হালদারের আয়কর ও জমিজমাসংক্রান্ত সব বিষয় দেখভালের দায়িত্ব ছিল তার। নিজের আইনজীবী মেয়ে অনিন্দিতা মৃধাকে পিকে হালদার সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন তিনি। অনিন্দিতা মৃধা ছিলেন অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান উইন্টেল ইন্টারন্যাশনালের এমডি। পিকে হালদারের অর্থ আত্মসাতে সহযোগী হিসেবে তাকেও চিহ্নিত করেছে দুদক। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে এফএএস ফাইন্যান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার ভুয়া ঋণ নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পিতা-কন্যা দুজনেই বর্তমানে দুদকের মামলার আসামি। গ্রেফতার হয়ে জেল খাটছেন।

আদালতে দোষ স্বীকার করে তারা জানিয়েছেন, পিকে হালদারের কথামতো অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে কাগজপত্র তৈরি করে তাকে লিজিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতে সাহায্য করেছেন তারা।

পিকে হালদারের ব্যবসায়িক অংশীদার মো. জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। এফএএস ফাইন্যান্সের ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছিলেন তিনি। পিকে হালদারের বন্ধু মো. সিদ্দিকুর রহমান হয়েছিলেন চেয়ারম্যান। তিনি ছিলেন এফসিএ করা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। তাদের দুজনের সহযোগিতায় পিকে হালদার এফএএস ফাইন্যান্স থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা লুট করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পিকে হালদার ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা অনুসন্ধান ও তদন্তে জড়িত কর্মকর্তারা জানান, দেশের একটি প্রসিদ্ধ ল ফার্মের সঙ্গে আইনি সহায়তার জন্য ৩০ কোটি টাকার চুক্তি করেছিলেন পিকে হালদার। তাদের দায়িত্ব ছিল ঋণ কেলেঙ্কারি-সংক্রান্ত আইনি ঝামেলা থেকে পিকে হালদারকে সুরক্ষা দেয়া। আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষায় পিকে হালদারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো সমস্যায় যাতে না পড়তে হয়, সেজন্যও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করেছেন তিনি। দুদক বলছে, তাদের প্রচ্ছন্ন সহায়তায়ই পিকে হালদার তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। দেশের বাইরে পাচার করেছেন শত শত কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বোর্ডে এখনো অসংখ্য আইনজীবী ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষা দিতেই সরকার তাদের সেখানে নিয়োগ দেয়। তাদের অনেকেই সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে নিজ দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু সবাই যদি তাদের মতো করে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করত, তাহলে ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি হতো না। কিন্তু কোনো কোনো আইনজীবী ও নিরীক্ষক লুটেরাদের সঙ্গে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান লুটপাটে জড়িত হয়ে পড়ছেন। অর্থের বিনিময়ে ভুয়া নিরীক্ষা প্রতিবেদন দিয়ে লুটপাটকারীদের ঋণ পেতে সহায়তা করছেন তারা। তাদের সহায়তায় ঋণ জালিয়াতির হোতারা প্রতি বছর বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে দেশের বাইরে পাচার করছে। বিদেশে গড়ে তুলছে বাড়ি, গাড়ি, শপিং মলসহ বিলাসবহুল প্রাসাদ। আবার কিছু আইনজীবী ঋণখেলাপিদের আইনি সহায়তা দেয়ার সময়েও নানা অনৈতিক চর্চা করছেন।

এছাড়া মানহীন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান দিয়ে অডিট করানোর বিষয়টিও এক্ষেত্রে কিছুটা ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন হোদা ভাসি চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের সিনিয়র পার্টনার এবং দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) সাবেক প্রেসিডেন্ট এএফ নেসারউদ্দিন এফসিএ।

তিনি বলেন, দেশে এখন পর্যন্ত যতগুলো প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম হয়েছে, সেগুলোর পর্ষদ সদস্য ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যই ছিল লুটপাট করা। এর মূল সুবিধাভোগীও কিন্তু তারাই। রক্ষক যখন ভক্ষক হয়ে যায়, তখন সেটি ঠেকানো বেশ কঠিন। এক্ষেত্রে প্রথমেই দায় বর্তায় পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ওপর। এছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থারও ভূমিকা রয়েছে। এরপর এসব প্রতিষ্ঠানের বহিঃনিরীক্ষক যারা ছিলেন, তারাও দায় এড়াতে পারেন না। এককভাবে শুধু নিরীক্ষককে দায়ী করা ন্যায়সংগত হবে না। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং স্বতন্ত্র পরিচালকদেরও দায় রয়েছে। দেশে মানসম্পন্ন নিরীক্ষা নিশ্চিত করতে না পারার মূল কারণ হচ্ছে অপর্যাপ্ত নিরীক্ষা ফি। অথচ যখন কোনো আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ধরা পড়ে, তখন কিন্তু ঠিকই বড় নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অনেক বেশি ফি দিয়ে নিয়োগ করা হয় তদন্তের জন্য। যদি শুরুতেই ন্যায্য ফি দিয়ে ভালো নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ করা হতো, তাহলে এ ধরনের ঘটনা শুরুতেই ঠেকানো সম্ভব হতো।

আলোচিত ঠিকাদার এসএম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জিকে শামীমের ঘটনায়ও আইনজীবীর বিরুদ্ধে অনৈতিক চর্চার অভিযোগ রয়েছে। জিকে শামীমকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে জামিন করানোর অভিযোগ উঠেছে তার একজন আইনজীবীর বিরুদ্ধে। বলা হচ্ছে, আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে তার বিরুদ্ধে বর্তমানে দুদকে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে দুদকের কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. মো. মোজাম্মেল হক খানের অভিমত হলো খারাপ মানুষ যে পেশায় যাবে সে পেশাকেই কলুষিত করবে। তিনি বলেন, পেশাভিত্তিক নৈতিকতার বিষয়টি অপরাধীদের বেলায় সাজে না। পেশার বিবেচনায় তাদের কোনো ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। দুদকের আইনে তারা অপরাধী। অপরাধী যেই হোক, তাদের ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। আইন ও বিধি অনুযায়ী তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে দুদকের পক্ষ থেকে সব রকম উদ্যোগই নেয়া হবে।

 

সূত্র: বণিক বার্তা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close