ইতিহাস-ঐতিহ্যগাজীপুর

কালীগঞ্জে এক প্রকল্পেই বদলে দিলো ইতিহাস, জীবনযাত্রায় এসেছে আমুল পরিবর্তন

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : আশির দশকেও বর্তমান কালীগঞ্জ উপজেলার দুই ইউনিয়ন এবং রূপগঞ্জের এক ইউনিয়নের হাজার হাজার হেক্টর কৃষি জমি বছরের পর বছর অনাবাদি পড়ে থাকতো। বর্ষা মৌসুম এলেই গোটা এলাকা পানিতে তলিয়ে যেত। পানিবন্দি হয়ে পরতো হাজার হাজার পরিবার। আর এ কারণেই এক প্রকার বসবাসের অনুপযোগী ছিল বেশির ভাগ অঞ্চল। নিরাপদ যাতায়াত ও পরিবহন ব্যবস্থার জন্য ছিল না উপযোগী কোন সড়ক। 

কিন্তু বর্তমানে ওই অঞ্চলেই প্রতি বছরে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১৭ হাজার মেট্রিক টন আমন এবং বোর ধান। এছাড়াও সবজি চাষ করে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে অনেকেই বাণিজ্যকভাবে বিক্রি করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। নিশ্চিতে এবং নির্বিঘ্নে বসবাসের উপযোগী হয়েছে গোটা অঞ্চল। বসতি হয়েছে হাজার হাজার পরিবারের।

নিরাপদ যাতায়াত ও পরিবহন ব্যবস্থার জন্য বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে উপযোগী সড়ক নেটওয়ার্ক হয়েছে। মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে আমুল পরিবর্তন। যা তাদের জীবনযাত্রাকে পাল্টে দিয়েছে।

আর এসব কিছুই সম্ভব হয়েছে “উত্তর রুপগঞ্জ পানি সংরক্ষণ প্রকল্প” বাস্তবায়নের ফলে।

প্রকল্পের মূল অবকাঠামোটি গড়ে উঠেছে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী কালীগঞ্জ উপজেলার তুমুলিয়া ইউনিয়নের বর্তুল এলাকায়। যা বিনোদন প্রেমিদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান হিসেবেও পরিচিত।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঢাকা কেন্দ্রীয় জোনের অধীনে নরসিংদী সার্কেলের পরিচালনায় ‘উত্তর রুপগঞ্জ পানি সংরক্ষণ প্রকল্পের’ প্রশাসনিক কার্যক্রম ও নিয়ন্ত্রণ পরিচালনা করা হয়।

তৎকালীন সরকার ১৯৮৫ সালের এপ্রিল মাসে বর্তমান কালীগঞ্জ উপজেলার তুমুলিয়া ও নাগরী ইউনিয়ন এবং রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের প্রায় ৩ হাজার ৭’শ হেক্টর এলাকা নিয়ে “উত্তর রুপগঞ্জ পানি সংরক্ষণ প্রকল্প” বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেন। যা ১৯৯০ সালের অক্টোবর মাসে আলোর মুখ দেখে। আর এই একটি মাত্র প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলেই বদলে যায় গোটা এলাকার দৃশ্যপট। শুরু হয় নতুন দিগন্ত। এরপর থেকেই ওই অঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয় এবং জীবনযাত্রায় আমুল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

“উত্তর রুপগঞ্জ পানি সংরক্ষণ প্রকল্পের” নথিপত্র পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন এবং সেচ প্রদানের উদ্দেশ্যে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বাংলাদেশ সরকার এবং চীনের যৌথ অর্থায়নে ৩৬ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে চায়না প্রযুক্তিগতদল দীর্ঘ পাঁচ বছর ৬ মাস কর্মযজ্ঞ শেষে প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ শেষ করেন। প্রকল্পের মোট জমির পরিমাণ ৩ হাজার ৭’শ হেক্টর। বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৮ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে যা বর্তমানে সড়ক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। প্রকল্পের মধ্যে সেচ অঞ্চল রয়েছে ২ হাজার ২’শ ৭০ হেক্টর জমি।

প্রকল্পটি রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের বেলদী এলাকা থেকে শুরু হয়ে কালীগঞ্জ উপজেলার তুমুলিয়া ইউনিয়নের প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা হয়ে নাগরী ইউনিয়ন ঘুরে বৃত্তাকার হয়ে দাউদপুর ইউনিয়নে গিয়ে যুক্ত হয়েছে।

সেচ খাল নির্মাণ করা হয়েছে মোট ৩৮.৫ কিলোমিটার। এরমধ্যে ১৮.৩৫ কিলোমিটার প্রধান সেচ খাল, ১৬.৩৭ কিলোমিটার পার্শ্ববর্তী সেচ খাল এবং ৩.৭৮ কিলোমিটার উপ-পার্শ্ববর্তী সেচ খাল রয়েছে।

এছাড়াও ১৫.৫০ কিলোমিটার নিষ্কাশন খাল নির্মাণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ৭.৬৫ কিলোমিটার প্রধান নিষ্কাশন খাল এবং ৭.৮৫ পার্শ্ববর্তী নিষ্কাশন সেচ খাল রয়েছে।

একটি পাম্প স্টেশন থেকে পুরো প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

কালীগঞ্জ উপজেলার তুমুলিয়া ও নাগরী এবং রূপগঞ্জের দাউদপুর ইউনিয়নে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন এবং সেচ সরবারহের উদ্দেশ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এই প্রকল্পের প্রধান ভিত্তি ছিলো বন্যা নিয়ন্ত্রণ। যা ওই সময় খুবই মারাত্মক হয়ে পরেছিল গোটা প্রকল্প অঞ্চলে। ১৮ কিলোমিটার বাঁধ এবং ১৫.৫ কিলোমিটার নিষ্কাশন খাল নির্মাণের পরে প্রকল্প এলাকায় বন্যার পানি আসা সফলভাবে রোধ করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়াও শীতলক্ষ্যা নদীর পানি সঞ্চয় করে তা কৃষি কাজে ব্যবহারের ফলে প্রকল্প এলাকায় প্রায় ১৭ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের পূর্বে নদীর তীর ঘেঁষে মানুষ চলাচল করলেও কোন সড়ক বা অবকাঠামো ছিলো না। আর বর্ষা মৌসুমে পুরো এলাকাই তলিয়ে যেতে পানির নিচে। পানিবন্দি হয়ে পরতো হাজার হাজার পরিবার। মানুষ এবং গবাদি পশু-পাখি থাকার মতো কোন পরিবেশ থাকতো না সে সময়। পানি চলে যাওয়ার পর ঘরবাড়ি মেরামত করতে হতো নতন করে। কৃষি কাজ করার মতো সুযোগ ছিলো খুবই কম। আর বর্তমানে অমন এবং বোর ধান চাষ ছাড়াও সারা বছর জুড়েই কৃষি কাজ করা সম্ভব হচ্ছে। বসবাসের মতো উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কৃষি কাজের জন্য নিয়মিত সেচ দেয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। বৃষ্টির পানি জমলে তা নিয়মিত নিষ্কাশন করা হচ্ছে। নির্মাণ করা বেড়ি বাঁধই বর্তমানে যান চলাচলের জন্য প্রধান সড়কে রূপান্তরিত হয়েছে। মানুষের জীবনযাপন এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে এই প্রকল্পের ফলে। তা গোটা সমাজ ব্যাবস্থারই পরিবর্তন ঘটিয়েছে।

কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফারজানা তসলিম বলেন, “উত্তর রুপগঞ্জ পানি সংরক্ষণ প্রকল্পের মধ্যে থাকা কালীগঞ্জ উপজেলার তুমুলিয়া এবং নাগরী ইউনিয়নের প্রায় ৭০০ হেক্টর কৃষি জমিতে বর্তমানে আমন এবং বোর ধান চাষ করা হয়। এতে প্রায় ১৫ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। এছাড়াও স্থানীয় কৃষকরা সবজি চাষ করে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বাণিজ্যক ভাবে তা বিক্রি করে নিজেরা এখন স্বাবলম্বী। আর এ সবই সম্ভব হয়েছে এই প্রকল্পের কল্যাণে।”

কালীগঞ্জ উপজেলার তুমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বকর মিঞা বাক্কু বলেন, “বাঁধ নির্মাণের পূর্বে বর্ষা মৌসুম এলেই গোটা এলাকা পানিতে তলিয়ে যেত। আর এ কারণেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পারতো বেশিরভাগ অঞ্চল। যাতায়াতের জন্য ছিলনা ভালো কোন সড়ক। নদীর তীরে দিয়ে লোকজন পায়ে হেঁটে যাতায়েত করতো। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে গোটা এলাকার দৃশ্যপট বদলে গেছে। এখন আর বন্যায় প্লাবিত হওয়ার ভয় নেই। কৃষকরা স্বনির্ভর হয়েছে। এলাকার অর্থনৈতিক এবং সামাজিক পরিবর্তন এসেছে। রূপগঞ্জ উপজেলার অধীনে থাকা তুমুলিয়া এবং নাগরী ইউনিয়ন ১৯৯১ সালের নভেম্বর মাসে কালীগঞ্জ উপজেলায় যুক্ত হয়।”

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নরসিংদী সার্কেলের উপ-সহকারী প্রকৌশলীর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন এবং সেচ সরবারহের উদ্দেশ্যে এই প্রকল্প নির্মাণ করা হয়। এই প্রকল্পের প্রধান ভিত্তি হলো বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং সেচ সরবারহ করা।”

তিনি আরো বলেন, উত্তর রুপগঞ্জ পানি সংরক্ষণ প্রকল্প নির্মাণের পূর্বে এই অঞ্চল বন্যার কারণে খুবই মারাত্মক হয়ে পরতো। ১৮ কিলোমিটার বাঁধ এবং ১৫.৫ কিলোমিটার নিষ্কাশন খাল নির্মাণের পরে ওই এলাকায় বন্যার পানি আসা সফলভাবে রোধ করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়াও শীতলক্ষ্যা নদীর পানি সঞ্চয় করে তা কৃষি কাছে ব্যবহারের ফলে প্রকল্প এলাকায় প্রায় ১৭ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।”

 

আরো জানতে…….

শত বছরেরও বেশি সময় যাবৎ বিরামহীন সেবা দিয়ে যাচ্ছে আড়িখোলা রেলস্টেশন

কালীগঞ্জ নির্বাচনী এলাকা থেকে যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন

তৎকালীন ‘কালীগঞ্জ হাই ইংলিশ স্কুল’ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস

বস্ত্র শিল্পের এক ঐতিহ্যবাহী শিল্প প্রতিষ্ঠানের নাম ‘মসলিন কটন মিল’

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close