গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : এক লাখ পিস মাল তুমি আনছ আমি কি আগে জানছিলাম? তোমার ঘর চেক (তল্লাশি) করতে গেছে আমি জানছিলাম? কক্সবাজারেও তুমি টাকা লেনদেন করছ।
-এক লাখ পিস বাকি আনা হয়েছিল। এক কোটি টাকার জিনিস। আমার কাছে বাসায় ছিল ১৩ লাখ টাকা। আমি ওইটা তখন দিয়ে দিই। পরে শুনছি রিন্টু বাসায় ডিবি পুলিশ নিয়ে গেছে। তারা বাসায় মন্ত্রীর সঙ্গে আমার ছবি দেখে ফিরে যায়। আমি ডিবিরে জিজ্ঞাসা করছি আপনারা কেন গেছেন? যদি কোনোভাবে মালগুলো (ইয়াবা) আমার বাসা থেকে উদ্ধার হইত, আমার মান ইজ্জত থাকত?
-তা হলে ৩০ লাখ টাকা তোমারে কেন দিলাম?
-না না কাকি ৩০ লাখ না, ২০ লাখ। মাত্র ৬ মাসের মধ্যে সব ভুইলা গেলেন?
টঙ্গীর চিহ্নিত মাদককারবারি সাঈদা বেগমের সঙ্গে টঙ্গী সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. রেজাউল করিমের কথোপকথনের একটি অংশ এটি। রেজাউল করিম ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিরও সহসম্পাদক। টঙ্গী এলাকায় ইয়াবা ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এখন এ ছাত্রলীগ নেতার হাতেই। মাদক ছাড়াও ঝুট ব্যবসা থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি- সবকিছুতেই উঠে এসেছে তার নাম। আর সাঈদা বেগমের নামে রয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে আটটি মামলা।
স্থানীয়রা জানান, ছাত্রলীগ নেতা রেজাউল করিম এক সময় পড়ালেখার পাশাপাশি বাসের টিকিট বিক্রেতা হিসেবে কাজ করতেন। পরে মাঠপর্যায়ের খুচরা মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে যান। বিক্রি করতেন ফেনসিডিল। গাজীপুরে এক আওয়ামী লীগ নেতাকে ‘ম্যানেজ’ করে টঙ্গী সরকারি কলেজের সাধারণ সম্পাদকের পদও বাগিয়ে নেন। এর পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। খুচরা মাদক বিক্রেতা থেকে হয়ে ওঠেন টঙ্গী এলাকার ইয়াবা ব্যবসার অন্যতম নিয়ন্ত্রক।
জানা যায়, টঙ্গীতে খালি হাতে আসা রেজাউল করিম এখন চলাফেরা করেন ব্যক্তিগত গাড়িতে। দত্তপাড়া এলাকায় আড়াই কাঠা জমির ওপর গড়েছেন অট্টালিকা। এ ছাড়া পরিবহন ও ঝুট ব্যবসায়ও রয়েছে তার বিনিয়োগ। তবে মূল ব্যবসা ইয়াবার। কক্সবাজার থেকে মাদকটি এনে টঙ্গীর বিভিন্ন কারবারিদের হাতে পৌঁছে দেন রেজাউল করিম। চাঁদাবাজিতেও সিদ্ধহস্ত ছাত্রলীগের এই নেতা। সর্বশেষ গত ১ এপ্রিল রেজাউল স্থানীয় ব্যবসায়ী সাজ্জাদুল ইসলাম মনিরের কাছে দাবি করে বসেন পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা। এ ঘটনায় ব্যবসায়ীর স্ত্রী শিল্পী আক্তার বাদী হয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। তবে শিল্পীর অভিযোগ, ‘পুলিশ কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছে না। আমরা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছি।’
এ প্রসঙ্গে টঙ্গী থানার ওসি শাহ আলম বলেন, ‘বিষয়টি তদন্ত করছেন একজন কর্মকর্তা। খোঁজ নিয়ে জানাতে হবে।’
টঙ্গীর ব্যাংকের মাঠ বস্তি ও কেরানীর টেক বস্তি এলাকার মাদক ব্যবসার অন্যতম হোতা সাঈদা বেগম ইয়াবাসহ ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাকে ঘিরেই রেজাউলের সঙ্গে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। কারণ কক্সবাজার থেকে আনা রেজাউলের এক লাখ ইয়াবা বেহাত হওয়ার জন্য সাঈদাকেই দায়ী করেন এ ছাত্রলীগ নেতা। এ নিয়ে দুজনের কথোপকথনে পুরো চিত্র উঠে আসে। মাদককারবারি সাঈদা বেগম বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।
মাদককারবারি সাঈদা : এই টাকা তো ডিবিরে খাওয়াইছি। আর তুমারে দিলাম।
ছাত্রলীগ নেতা রেজাউল : হুম… একজন আসছে, আপনার ছেলেরে জেলে দিয়ে দিতে বলে। আমি বলছি- সাঈদা কাকি যদি বলে, আমার বাপুরে (মাদককারবারির ছেলে) জেলে দিয়ে দে। তাইলে আমি দিমু।
সাঈদা : হুম।
ছাত্রলীগ নেতা : থানায় তো আমি নিয়মিত যাই। ওসি (টঙ্গী পূর্ব থানার সদ্য সাবেক ওসি আমিনুল ইসলাম) তো আমগো খাস লোক। ফোন দিয়ে যা বলি তাই করে দেয়। পুলিশ, নেতাদেরও আমি বলছি- ধরছে টেকা চাইছে দিতে পারে নাই। পরে চালান দিয়ে দিছে। ঢাকার ডিবি তো, এই জন্য কিছু করতে পারি নাই। টঙ্গী অথবা গাজীপুরের ডিবি না। তারা বাইরে থেকে আসছে। আল্লাহর কাছে শুধু আলহামদুলিল্লাহ বলেন, আল্লাহ আপনারে রাখছে।
সাঈদা : হ, ক্রস (ক্রসফায়ার) দিলে তো আজকে আমার এই কথাডা তোমার শুনতে হইত না। তোমারে পাইলে ক্রস দিত না?
ছাত্রলীগ নেতা : কেন?
সাঈদা : মাল তো তোমার আন্ডারে আসছে। এখন আমি জেলে থেকে অসুস্থ হয়ে গেছি। আমার কাছে কোনো টাকা নাই। আমার চিকিৎসা দরকার। আমাকে কয় লাখ দিবা এখন?
ছাত্রলীগ নেতা : দোয়া করেন, দোয়া করেন যাতে পাশে থাকতে পারি। জীবনে অনেক টাকা কামাইছেন না? রাখতে পারছেন?
সাঈদা : আমি তো তোমার ফাঁদে পাড়া না দিলে এত বড় মাইরডা খাইতাম না।
ছাত্রলীগ নেতা : হ, এইডা আমি স্বীকার করি।
সাঈদা : দেইখ গুলি করে আমারে মাইরা ফেলাইও না। তোমারে আমার ভয়ই করে। তোমারে ৩০ লাখ টাকা না দিলে এখন আমি অন্তত চলতে পারতাম।
এই কথোপকথন ও অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগে নেতা রেজাউল করিম বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করে কথা বলতে চাই।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেন, ‘ছাত্রলীগে মাদক কারবারিদের স্থান নেই। তার বিষয়টি আমাদের জানা নেই। তদন্ত করে তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অন্যদিকে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে টঙ্গী পূর্ব থানার সদ্য বিদায়ী ওসি আমিনুল ইসলামের সহজ জবাব, ‘এমন কোনো বিষয় আমার জানা নাই।’