মুক্তমত

বাংলা সনের উৎপত্তি ও আকবরের নবরত্ন

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: দিল্লীশ্বর তৃতীয় মুঘল সম্রাট আবুল ফাতহ জালাল উদ্দীন মুহম্মদ আকবরের (১৫৪২-১৬০৫) সম্রাটশাসিত মন্ত্রিসভার প্রধান সদস্য ছিলেন নয়জন, যাদের ইতিহাসে নবরত্ন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আবুল ফজল (১৫৫১-১৬০২) ছিলেন গ্রান্ড উজির, রাজা তোডর মল (১৫০০-১৫৮৯) অর্থমন্ত্রী, রাজা বীরবল ওরফে মহেশ দাস (১৫২৮-১৫৮৬) হিন্দুবিষয়ক উপদেষ্টা এবং মুখ্য সেনাপতি, আবু আল ফাইজ ইবনে মোবারক ওরফে ফৈজী (১৫৫৭-১৫৯৫) ছিলেন মালিক উশ শোয়ারা বা সভাকবি (পোয়েট লরিয়েট), রাজা মান সিংহ ১ (১৫৫০-১৬১৪) বিশ্বস্ত জেনারেল, মিয়া তানসেন (১৫০০-১৫৮৬) সংগীতজ্ঞ, মোল্লা দোপিয়াজা (১৫২৭-১৬২০) বুদ্ধির জাহাজ, ফকির আজিও আও দীন (১৫০৮-১৫৭২) ধর্মমন্ত্রী এবং আবদুল রহিম খান ই খানান (১৫৫৬-১৬২৭) কবি এবং আকবরের মেন্টর। দেখা যায় আকবরের কেবিনেটে সমরবিশারদ, বুদ্ধিজীবী, অর্থ ও ধর্মবিষয়ক পণ্ডিত, কবি ও সংগীতবেত্তাদের প্রাধান্য ছিল। সম্রাট আকবর ১৫৫৬ থেকে ১৬০৫ পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৪৯ বছর দোর্দণ্ডপ্রতাপ, প্রতিভা, রাজ্য বিস্তার ও প্রশাসনিক ক্ষমতা সংহতকরণ, ধর্ম-মত-অর্থ ও রাজস্ব সংস্কার সাধনে ব্যাপৃত হয়েছিলেন। আর এর জন্য তার নবরত্ন সভার সভাসদরা তাদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও পাণ্ডিত্য দিয়ে তাকে ঋদ্ধ করেছিলেন। তিনি ফসলি সন প্রবর্তনের যে কাজটি করেছিলেন সুদূর দিল্লির সিংহাসনে বসে, তা সুবে বাংলার (বর্তমানের বাংলাদেশ) জন্য আজও চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। পুরো ভারতবর্ষে একমাত্র বাংলাদেশে তার প্রবর্তিত ফসলি সন কার্যকর রয়েছে, বাঙালির নিজস্ব পঞ্জিকা বর্ষ বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন হিসেবে।

বাংলা সন প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে জলবায়ু, অঞ্চল ও বিরাট রাষ্ট্রীয় কাজে রাজস্ব আহরণে স্বার্থে ও সুবিধার্থে সময়ের প্রয়োজনেই বাংলা সনের উদ্ভব হয়। সরকারি খাজনা আদায় করা হতো চন্দ্র সনের হিসেবে। তখন এ অঞ্চলে হিজরি সনই ছিল দিন গণনা এবং দাপ্তরিক কাজকর্মের একমাত্র মাধ্যম। তত্কালীন যুগে বাংলার এ অঞ্চল ছিল কৃষিনির্ভর। তখন জমিতে ফসল উৎপাদনের সময়ের ওপর ভিত্তি করে জমির খাজনা আদায় করা হতো। এক্ষেত্রে হিজরি সনের হিসাব করা হতো। কিন্তু হিজরি সন চান্দ্রমাসভিত্তিক হওয়ায় তা কোনো ফসলি মৌসুম মেনে চলত না। এ সনের মাসগুলো কোনো নির্দিষ্ট ঋতুতে স্থির থাকে না। এতে বছরে ১১ দিন সময় কমে যেত। যার ফলে ফসলের ঋতুর মিল থাকত না। কৃষকরা সাধারণত বৈশাখ মাসে শস্যাদি বাজারজাত করতেন। কৃষকরা উৎপাদিত ফসল খেয়ে ফেলার পরে সরকার খাজনা নিতে আসত। তাতে মানুষের হাতে না থাকত ফসল, না থাকত অর্থ। ফলে রাজস্ব বা খাজনা আদায়ের হিসাব-নিকাশ সংরক্ষণে রাজস্ব বিভাগের দারুণ অসুবিধার সৃষ্টি হতো। একদিন রাজ্যের হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে কয়েকজন সম্রাট আকবরের কাছে গেলেন। বললেন, ‘বাদশাহ আমাদের ধর্মকর্ম সম্পর্কিত অনুষ্ঠানে আরবি অর্থাৎ হিজরি সাল ব্যবহার করতে ইচ্ছে হয় না। তাই আপনি আমাদের একটি পৃথক সাল নির্দিষ্ট করে দিন।’ এর কিছুদিন পরেই আবার অসন্তোষ দেখা দিল সম্রাটের রাজস্ব বিভাগের কর্মচারীদের মধ্যে। সম্রাটের কাছে তারা তাদের আবেদনে জানান, ‘জাঁহাপনা সৌর পদ্ধতিতে হিজরি সালের কিছু ত্রুটি এবং চান্দ্র সালের কারণে ফসলের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের সময়কাল নির্দিষ্ট রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এমন অবস্থায় আপনি হিজরি এবং চান্দ্রবর্ষের সমন্বয়ে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক নতুন সালের প্রবর্তন করে দিন। যাতে নির্দিষ্ট দিন বা সময়ে আমরা জমির খাজনা আদায় করতে পারি।’

সম্রাট আকবর ছিলেন রাজ্যের সুশাসক এবং ধর্মমতের ব্যাপারে উদার। বিষয়টির গুরুত্ব তিনি উপলব্ধি করেন। তার শাসনামলের ২৯ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর এ সমস্যার সমাধান বের করতে তিনি রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে একটি নতুন সৌর সন উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এটি নিয়ে আলাপ করেন তার সভাসদ আবুল ফজল এবং অর্থমন্ত্রী রাজা তোডর মলের সঙ্গে। তাদের পরামর্শে সম্রাট কঠিন এ কাজ সম্পাদনের দায়িত্ব দিলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমির ফতেউল্লা সিরাজির ওপর।

পারস্যের সাফাবিদ ঘরানার সুফি সৈয়দ মীর ফতেউল্লা সিরাজি (? -১৫৮৯) ছিলেন একাধারে গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিদ, দার্শনিক, পদার্থবিদ, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও ইসলামী আইনবেত্তা। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত দার্শনিক এবং কোরআন-হাদিস বিদ্যাবিশারদ গিয়াস আল দীন মনসুরের (১৪৬১-১৫৪২) শিষ্য। তারা আগে থেকেই ছিলেন গান পাউডার সমরাস্ত্র নির্মাতা হিসেবে সুপ্রসিদ্ধ। এ পরিচয়ে ফতেউল্লা সিরাজি সম্রাট আকবরের দরবারে কামান তৈরিতে বিদেশী কনসালট্যান্ট হিসেবে ১৫৫৬ সালে যোগদান করেন। প্রথম দিকে তিনি মুঘল সেনাবাহিনীর জন্য ভলি গান, হাত কামান, ছোট কামান এবং পরবর্তীকালে ষোল গোলাবিশিষ্ট কামান তৈরির পারদর্শিতা দেখান এবং গোলন্দাজ শাখায় সেরা সম্পদ হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। তিনি সম্রাট আকবরের ‘অযুদদুদদৌলা’ বা সম্রাটের হস্ত উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি প্রধান উজির পণ্ডিত আবুল ফজলের আরাম আয়েশের জন্য এমন একটা বাহন তৈরি করেন, যা ছিল বহুল ব্যবহারযোগ্য। একসময় তা দিয়ে ফসল মাড়াইয়ের কাজও করা যেত।

সম্রাট আকবরের দরবারে আমির ফতেউল্লা সিরাজি নতুন সাল উদ্ভাবন প্রস্তাব পেশ করেন।

সিরাজি ছিলেন প্রজ্ঞাসম্পন্ন মনীষী। তিনি খুবই সাধারণ জীবন যাপন করতেন। ঐতিহাসিক আবুল ফজল তার আকবরনামা গ্রন্থে সিরাজি সম্পর্কে এমন মন্তব্যও করেছেন, ভারতের সব প্রত্নতাত্তিক জিনিস যদি ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে সিরাজি তা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবেন। তাই তার গ্রন্থে তাকে প্রত্নতাত্ত্বিক বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। সম্রাট আকবর ফতেউল্লা সিরাজির মৃত্যুতে গভীর শোকাহত হন। আইন-ই-আকবরিতে আবুল ফজল লিখেছেন:

মহামতী আকবর তার সভাসদদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করতেন। মীর ফতেউল্লাকে আকবর তার উকিল মনে করতেন। আকবরের মতে, ‘ভারতীয় ইতিহাসে মীরের সমতুল্য একাধারে দার্শনিক, পদার্থবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী কেউ ছিলেন না। মহামতী আকবর বলতেন, কোনো কারণে সিরাজি যদি শত্রুদের হাতে ধরা পড়ে এবং তার মুক্তির পণ হিসেবে আমার ট্রেজারির সমুদয় সম্পদও দাবি করা হয় আমি তা দিতে কুণ্ঠিত হব না, বরং আমি মনে করব এমন রত্ন আমি সহজ বিনিময়ে ফেরত পেলাম।’

১৫৮৪ সালে নতুন সাল উদ্ভাবনে নিয়োগ পেয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমির ফতেউল্লা সিরাজি ভারতের বিভিন্ন এলাকার সনকে চন্দ্র ও সৌর বৈশিষ্ট্যে সমন্বিত করেন। এখানে আমির সিরাজি তদানীন্তনকালে প্রচলিত সব বর্ষপঞ্জি পর্যালোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হিজরতকে মূল ঘটনা ধরে হিজরি সনের বর্ষকে অক্ষুণ্ন রেখে, ১, ২, ৩ এভাবে হিসাব না করে মূল হিজরি সনের চলতি বছর থেকেই বাংলা সনের গণনা শুরু দেখিয়ে বাদশা আকবরের মসনদে অধিষ্ঠানের বছর ৯৬৩ হিজরিকে ৩৫৪ দিনে গণনার স্থলে ৩৬৫ দিনে এনে একটি প্রস্তাব বাদশার দরবারে পেশ করেন ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে। ৯৬৩ হিজরি ঠিকই থাকে, শুধু পরবর্তী বছর থেকে ৩৬৫ দিনে তা গণনায় আনায় ঋতুর সঙ্গে এর সম্পর্ক স্থিত হয়ে যায়। ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দেই বাদশা আকবর হিজরি চান্দ্র সনের এ বিশেষ সৌর সনের গণনাকে অনুমোদন দান করেন এবং ২৯ বছর আগে তার সিংহাসনে আরোহণের বছর (হিজরি ৯৬৩, ১৫৫৬ সন) থেকে উদ্ভাবিত নতুন সৌর বর্ষপঞ্জিকার হিসাব শুরু করার নির্দেশ দেন। এই সন ইলাহি সন, ফসলি সন প্রভৃতি নামে শাহি দরবারে পরিচিত হলেও বাদশা কর্তৃক গঠিত সুবা বাঙ্গালা বা বাংলা প্রদেশে এসে এই সন বাংলা সন নামে ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়। সিরাজি উদ্ভাবিত বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী মুঘল রাজদরবার থেকে বৈশাখ মাসকে নববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করে ফরমান জারি করা হয়; এবং এ মাসেই ভূমি রাজস্ব বা ওশর আদায়ের তাগিদ প্রদান করা হয়। এভাবে বৈশাখ মাস বাংলা বছরের প্রথম মাস হওয়ার মর্যাদা লাভ করে।

সন হিসেবে ‘বাংলা সন’ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত কার্যকর ও বিজ্ঞানসম্মত বলে বিবেচিত হয়। এর কারণ হলো এটি একই সঙ্গে চন্দ্র ও সৌর পদ্ধতির সার্থক উত্তরাধিকারী। এর প্রথমাংশ, অর্থাৎ ৯৬৩ বছর, সম্পূর্ণ হিজরি সনভিত্তিক তথা চান্দ্রসন। পরবর্তী অংশ অর্থাৎ ৯৬৩ হতে অদ্যাবধি সৌরভিত্তিক। ফলে বিশ্বে সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত ইংরেজি তথা গ্রেগরিয়ান ক্যালন্ডারের সঙ্গে ‘বাংলা সন’ সামঞ্জস্য রেখে চলে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে ৯৬৩ সালে পয়লা বৈশাখ হয়েছিল ১১ এপ্রিল, ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে আবার ১৪২৮ বাংলা সনে পয়লা বৈশাখ হয়েছে ১৪ এপ্রিল। অর্থাৎ ১৪২৮-৯৬৩=৪৬৫ বছরে পার্থক্য হয়েছে মাত্র তিনদিনের। আর ভবিষ্যতেও এর চেয়ে অধিক পার্থক্য হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এই ৫৯৩-এর সঙ্গে নতুন বাংলা সন যোগ করা হলে বর্তমান ইংরেজি সাল পাওয়া যাবে। আগত নতুন বাংলা সন ১৪২৮-এর সঙ্গে ৫৯৩ যোগ করলে দাঁড়ায় ১৪২৮+৫৯৩ = ২০২১ অর্থাৎ ইংরেজি ২০২১ সাল। বাংলাদেশসহ ভারত উপমহাদেশে ফতেউল্লা সিরাজি বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রবর্তিত হিজরিভিত্তিক ‘বাংলা সন’ আবিষ্কারের অসাধারণ কৃতিত্ব প্রদর্শন করে ইতিহাসে স্মরণীয় ব্যক্তিত্বের স্থান অধিকার করে আছেন।

পৃথিবীর দুটি বিখ্যাত ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মুসলমানদের আছে বিরাট ঐতিহ্য ও ইতিহাস। বাংলা ও হিজরি সন দুটোই সৃষ্টি করেছে মুসলমানরা। ‘সন’ ও ‘তারিখ’ দুটিই আরবি শব্দ। সন অর্থ হলো ‘বর্ষ’ বা ‘বর্ষপঞ্জি’ এবং তারিখ অর্থ ‘দিন’। আরবিতে ‘তারিখ’ দ্বারা ইতিহাসও বুঝিয়ে থাকে। ‘সাল’ হচ্ছে একটি ফারসি শব্দ, যার অর্থ হলো বছর। বাংলা সনের সূত্রপাত হয়েছে আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে।

আগেই উল্লেখিত হয়েছে বাংলাদেশের এ ক্যালেন্ডারেও মাসের হিসাব করতে কিঞ্চিৎ সমস্যা ছিল। ২৯ দিন ১২ ঘণ্টা ৪০ মিনিটে এক চান্দ্রমাস হয়। এ হিসেবে এক চান্দ্রবর্ষ হবে ৩৫৪ দিন ৯ ঘণ্টায়। আর সৌরবর্ষ হবে ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিটে। প্রত্যেক সৌরবর্ষ এক চান্দ্রবর্ষ থেকে ১১ দিন বেশি। ফলে প্রতি সাড়ে ৩২ বছর পর এক চান্দ্রবর্ষ বৃদ্ধি পায়। এ পর্যন্ত হিজরি সন (চান্দ্রবর্ষ) বাংলা বা ফসলি সন (সৌরবর্ষ অপেক্ষা ১৩ বছর বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৬৩ সনে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর (১৮৮৫-১৯৬৯) নেতৃত্বে বাংলা সন সংস্কার কার্যক্রমে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই গবেষণা কমিটি ১৯৬৬ সনের ১৭ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করে। তারই আলোকে ১৯৮৮ সালে অধিবর্ষের ব্যবস্থাসহ দিন ও তারিখাদির অনিয়ম সংশোধন করে নিম্নবর্ণিত সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয়:

১. মুঘল আমলে বাদশা আকবরের সময়ে হিজরি সনভিত্তিক যে বঙ্গাব্দ প্রবর্তন করা হয় তা থেকে বছর গণনা করতে হবে।

২. বাংলা মাস গণনার সুবিধার্থে বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত প্রতি মাস ৩১ দিন হিসেবে এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত ৩০ দিন পরিগণিত হবে।

এ সুপারিশমালায় আরো বলা হয় যে ৪ দ্বারা যে সাল বিভাজ্য হবে তা অধিবর্ষ বা লিপ ইয়ার বলে গণ্য হবে। সেই ভিত্তিতে বর্তমানে প্রচলিত বাংলা সন ১৯৮৮ সন থেকে কার্যকর হয়।

বাংলা সন মূলত ইসলামী হিজরি সনের ওপর নির্ভরশীল হলেও দিন ও মাসের নামকরণের ক্ষেত্রে শকাব্দের কাছেও সে কিঞ্চিৎ ঋণী। বাংলা সনে আমরা বর্তমান দিন ও মাসের যে নামগুলো ব্যবহার করি তা শকাঙ্গ থেকে গৃহীত। সপ্তাহের নামগুলো রবি, সোম, মঙ্গল ইত্যাদি গৃহীত হয়েছে গ্রহপুঞ্জ ও সূর্য থেকে। মাসের নামগুলো বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় ইত্যাদি পেয়েছি নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে। বর্তমান ভারতীয় জাতীয় সন শকাঙ্গ। রাজা চন্দ্রগুপ্ত খ্রিস্টপূর্ব ৩১৯ অব্দে ‘গুপ্তাব্দ’ প্রবর্তন করেন। এ সন পরে ‘বিক্রমাব্দ’ নামে অভিহিত হয়। এ অব্দ প্রথমে শুরু হতো চৈত্র মাস থেকে। পরবর্তী পর্যায়ে কার্তিক মাসকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে পরিচিহ্নিত করা হয়। খ্রিস্টপূর্ব ১৫ সালে ভারতে শক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। শক সনের স্মারক হিসেবে ৭৮ খ্রিস্টাব্দে শকাব্দ চালু করা হয়। সৌরভিত্তিক শকাব্দের রবিমার্গের দ্বাদশ রাশির প্রথম মেষ অন্তর্গত পূর্ণচন্দ্রিকাপ্রাপ্ত প্রথম নক্ষত্র বিশাখার নামানুসারে বছরের প্রথম মাসের নাম রাখা হয় বৈশাখ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে নাক্ষত্রিক নিয়মে বাংলা সনের মাসগুলোর নাম নক্ষত্রগুলোর নাম থেকে উদ্ভূত হয়েছে। যেমন বিশাখা নক্ষত্রের নাম অনুসারে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠা থেকে জ্যৈষ্ঠ, শ্রাবণা থেকে শ্রাবণ, ভাদ্রপদা থেকে ভাদ্র, আশ্বিনী থেকে আশ্বিন, কার্তিকা থেকে কার্তিক, অগ্রহায়ণ থেকে অগ্রহায়ণ, পৌষা থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, ফল্গুগুনী থেকে ফাল্গুন, চিত্রা থেকে চৈত্র। ‘ফসলি সন’ যখন প্রবর্তিত হয়, তখন ১২ মাসের নাম ছিল কারওয়াদিন, আরদিভিহিসু, খারদাদ, তীর, আমরার দাদ, শাহরিয়ার, মিহির, আবান, আহঢ়র, দার, বাহমান ও ইসকান্দর মিয়।

প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলা সনের প্রথম মাস কোনটি ছিল সে বিষয়ে কিঞ্চিৎ মতানৈক্য রয়েছে। অধিকাংশ ঐতিহাসিক অভিমত প্রকাশ করেন যে অগ্রহায়ণ হলো অগ্রাধিকার বিধায় অতীতে আমাদের নববর্ষের দিন ছিল পয়লা অগ্রহায়ণ। অর্থাৎ হায়ণ বা বছরের প্রথমে যার যে মাস তার প্রথম দিন ছিল আমাদের নববর্ষের দিন; কিন্তু ৯৬৩ হিজরিতে যখন ‘ফসলি সন’ বা ‘বাংলা সন’ শুরু করা হয়, তখন হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম বৈশাখ মাসের সঙ্গে মিশে যায়। ফলে এ দেশে পয়লা বৈশাখই ‘নওরোজ’ বা ‘নববর্ষ’ হিসেবে পরিচিহ্নিত হয়। উল্লেখ্য, ইংরেজি তথা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারেও প্রথম পয়লা মার্চ ছিল ‘নিউ ইয়ার্স ডে’, কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে পয়লা জানুয়ারি সে সম্মানজনক স্থান দখল করে নেয়। সম্রাট আকবরের সময় মাসের প্রতিটি দিনের জন্য পৃথক নাম ছিল। সম্রাট শাহজাহানের সময়কালে এ জটিল প্রথা পরিহার করে সপ্তাহের সাতটি দিনের জন্য সাতটি নাম নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে ব্যবহূত ওই সাতটি নামের সঙ্গে রোমান সাপ্তাহিক নামগুলোর সাদৃশ্য সহজেই পরিলক্ষিত হয়। অনুমিত হয় যে বাদশা শাহজাহানের দরবারে আগত কোনো ইউরোপীয় (পর্তুগিজ) মনীষীর পরামর্শক্রমে মূলত গ্রহপুঞ্জ থেকে উদ্ভূত নিম্নে বর্ণিত নামগুলোর প্রচলন করা হয়: রবি (সূর্য), সোম (চন্দ্র), মঙ্গল (মঙ্গল গ্রহ), বুধ (বুধ গ্রহ), বৃহস্পতি (বৃহস্পতি গ্রহ), শুক্র (ভেনাস) ও শনি (শনি গ্রহ) থেকে। পাশ্চাত্য জগতে রবিকে মূল করে সপ্তাহের শুরু করা হয়। বাংলা সপ্তাহও অনুরূপভাবে রবি থেকে শুরু হয়েছে। এক কথায় বিখ্যাত রাজজ্যোতিষী আমির ফতেউল্লা সিরাজি হিজরি সালকে সুকৌশলে বাংলা সনে রূপান্তরিত করেছেন। হিজরি চান্দ্র সালকে সৌর সালের হিসাবে গণনায় এনে বাংলা সালের উদ্ভব হলেও এর প্রত্যেক মাসের যে বিভিন্ন তিথির যোগসূত্র রয়েছে তা চাঁদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। চান্দ্রমাসের হিসাবে রয়েছে ৩০টি তিথি। এই তিথিগুলো দুই পক্ষে বিভক্ত আর তা হচ্ছে শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষ। এই পক্ষগুলোতে রয়েছে অমাবস্যা, প্রতিপদ, দ্বিতীয়া, তৃতীয়া, চতুর্থী, পঞ্চমী, ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, দশমী, একাদশী, দ্বাদশী, ত্রয়োদশী, চতুর্দশী। পূর্ণিমা-অমাবস্যার গাঢ় অন্ধকার দূর করে দিয়ে পশ্চিম দিগন্তে সাঁঝের বেলায় চিকন চাঁদ উঠে নতুন আলোর আগমনের বারতা ঘোষণা করে। তা দিন দিন মোটা হতে হতে গোলাকার আলোর আগমনের থালার রূপ নেয়, আসে পূর্ণিমা। বাংলা সনের মাস গণনা সৌর হিসাবে হলেও তার অবয়বজুড়ে চাঁদের যে সম্পর্ক এবং মাসগুলোর নামকরণে যে নক্ষত্ররাজির সম্পর্ক তা লক্ষণীয়।

বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় মূলত আকবরের সময় থেকেই। সে সময় বাংলার কৃষকরা চৈত্র মাসের শেষদিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূস্বামীর খাজনা পরিশোধ করত। পরদিন নববর্ষে ভূস্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ উপলক্ষে তখন মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। ক্রমান্বয়ে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে পয়লা বৈশাখ আনন্দময় উৎসবমুখী হয়ে ওঠে এবং বাংলা নববর্ষ শুভদিন হিসেবে পালিত হতে থাকে।

অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। এটি পুরোপুরিই একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার। গ্রামে-গঞ্জে-নগরে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রারম্ভে তাদের পুরনো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষে তারা নতুন-পুরনো খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতেন এবং নতুনভাবে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপন করতেন। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয়।

লেখক: ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, সরকারের সাবেক সচিব ও এনবিআাারের সাবেক চেয়ারম্যান।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close