খেলাধুলা

ক্রিকেটার-বিসিবি: পক্ষ-প্রতিপক্ষ!

গাজীপুর কণ্ঠ, খেলাধুলা ডেস্ক : সহসা কেউ সাহস করেন না এমনটা বলতে, যেমনটা বলেছেন সাকিব আল হাসান। যেমনটা মাশরাফি বিন মর্তুজাও। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বিপক্ষে ঠিক বিপ্লব হয়তো নয়। তবে দুজন সাহসী উচ্চারণের বিস্ফোরণে ঠিকই কাঁপিয়ে দিয়েছেন হর্তাকর্তাদের।

বাংলাদেশের ক্রিকেট আয়নার তাই অভিযোগের বারুদে পোড়া বিবর্ণ ছবি। লোকদেখানো আয়না মুছে যার শ্রী ফেরানো যাবে না কিছুতেই।

ক্রিকেটার ও বোর্ডকর্তা – পরষ্পরের প্রতিপক্ষ তো নয়। বরং একই ছায়াতলের সহচর হবার কথা। কিন্ত হালফিলে সেটি হচ্ছে কই! টুকটাক খুটখাট লেগেই আছে। সুযোগ পেলেই ক্রিকেটারদের কাঠগড়ায় দাঁড় করায় বোর্ড। ‘কোড অব কন্ডাক্ট’-এর শিকলে বেশিরভাগ সময় তা সহ্য করতে হয় মাঠের যোদ্ধাদের। কিন্তু কাঁহাতক!

সাকিব ও মাশরাফির মতো যোদ্ধারা তাই কখনো কখনো গা ঝাড়া দিয়ে ওঠেন। তাতে নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ যে একেবারে থাকে না, এমন নয়। সঙ্গে ক্রিকেটের বৃহত্তর স্বার্থের ছবিটাও জনমানসে স্পষ্ট হয় প্রবলভাবে।

এবারের ঘটনার শুরু সাকিবের শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ বাদ দিয়ে আইপিএল খেলার ইচ্ছেতে। ছুটির অনুমোদন হয় বটে, তবে দেশসেরা ক্রিকেটারের অমন ইচ্ছেকে ভালোভাবে নেয়নি বোর্ড। গণমাধ্যমে নিজেদের উষ্মা প্রকাশে ঝাঁঝালো ছিলেন কর্তাব্যক্তিরা।

সাকিব ছিলেন চুপচাপ। কিংবা সময়-সুযোগের অপেক্ষায়। ঘটনার বেশ কিছুদিন পর দিনকয়েক আগে এক ফেসবুক লাইভে নিজের ইচ্ছের স্বপক্ষে যুক্তি দেন। তার ছুটির দরখাস্ত এমনকি জাতীয় দলের দেখভালে থাকা ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান আকরাম খান পড়েননি পর্যন্ত বলে ছোঁড়েন পাল্টা তির। এই বিভাগের কার্যক্রম, আরেক সাবেক অধিনায়ক নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের হাই পারফম্যান্স বিভাগের কার্যকারিতাকে দাঁড় করান কাঠগড়ায়।

ব্যস, বারুদে বিস্ফোরণ। আক্রোশের ফণা তুলে ফোঁস করে ওঠেন বোর্ডকর্তারা। সাকিবের আইপিএল খেলার ছাড়পত্র বাতিলের কথা পর্যন্ত বলেন।

ওদিকে গণমাধ্যমে বোর্ডের বিপক্ষে সমানে কামান দাগতে শুরু করেন মাশরাফিও। অবসরকে ঘিরে বোর্ডের সঙ্গে যার টানাপড়েন দীর্ঘ সময় ধরে। সাকিবের সঙ্গে সুর মেলান তিনি। বোর্ডের নানা পর্যায়ের পেশাদারিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলে দেন একের পর এক। বাংলাদেশ ক্রিকেটের দুই কিংবদন্তির অভিযোগে কোণঠাসা হয়ে পড়ে বোর্ড।

মাশরাফি এখন আর বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তিতে নেই। নিষেধাজ্ঞার সময় চুক্তি থেকে বাদ পড়েছিলেন সাকিব। পরবর্তীতে আর নতুন করে চুক্তি হয়নি জাতীয় পর্যায়ে। সে হিসেবে মুখ বন্ধ রাখার বাধ্যবাধকতার সিলমোহর নেই তারও। সাকিবের ব্যাপারে বোর্ডসভা ডেকে সিদ্ধান্ত নেয়া, প্রয়োজনে আইপিএল খেলার ছাড়পত্র বাতিলের যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন আকরাম-দুর্জয়রা, সেটিও কথার কথা হয়েই থেকেছে। বরং এ নিয়ে আর কোনো ‘বাড়াবাড়ি’ যেন না করা হয়, সে নির্দেশনা নিজেরোই নিজেদের দিয়েছেন বোর্ডকর্তারা।

সাকিবের বিদ্রোহের লাল পতাকার বিপরীতে বিসিবি ওড়াচ্ছে সমঝোতার সাদা পতাকা। ব্যাপারটির আর জল গড়াতে দিতে চায় না, নিজেদের তরফ থেকে জলঘোলা করতেও অনিচ্ছুক।

তাতে সাকিব-মাশরাফির কথার এক ধরনের নৈতিক বিজয় হলো সত্যি। কিন্তু ক্রিকেট বোর্ডের বদলে যাওয়ার আশা করা যায় কি? বছর দেড়েক আগে মাশরাফিকে বাদ দিয়ে দেশের সব ক্রিকেটার নিয়ে যে ‘বিপ্লব’, সেটির ফলাফলে কতটুকু শুধরেছেন কর্তারা? কতটা বদলেছে কিংবা উপকৃত হয়েছে ক্রিকেট? এবার তাই সাকিব-মাশরাফির ব্যক্তিপর্যায় থেকে গণমাধ্যমে দেয়া বক্তব্যে পরিবর্তন হবে নীতিনির্ধারকদের মনমানসে, কাজ ও বিশ্বাসে – এ আশার আশ্বাস নেই সামান্যতম।

কিন্তুএই যে ক্রিকেটার ও বোর্ডের পারষ্পরিক বিশ্বাসহীনতা, সেটি কেন? ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব)-এর সাধারণ সম্পাদক দেবব্রত পাল বোর্ড ও ক্রিকেটারদের অভ্যন্তরীণ বিষয় মিডিয়ায় চলে আসাকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন। পাশাপাশি পেশাদারিত্বের অভাবের কথাও উল্লেখ করেন তিনি, ‘‘সাকিব চিঠিটা যার কাছে দিয়েছেন, উত্তরটাও তার কাছ থেকেও চাইবেন৷ প্রয়োজনে তিনি (বিসিবির সিইও) মিডিয়ায় কথা বলবেন। তাই তো হওয়া উচিত ছিল। এখন বোর্ড যেহেতু সাকিবকে ছুটি দিয়েই দিয়েছে, এরপর সেটি নিয়ে আর আলোচনার অবকাশ আমি অন্তত দেখি না।”

ক্রিকেটারদের সঙ্গে বোর্ডের সার্বিক সমন্বয়ের অভাবও দেখেন তিনি। তাতে তো সেতু হিসেবে কাজ করার কথা ক্রিকেটারদের এই সংগঠনেরই! কোয়াবের সাধারণ সম্পাদক সেটা মেনে নিচ্ছেন, ‘‘এ জায়গায় আমাদের দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারি না। আমাদের সঙ্গে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটারদের সার্বিক সমন্বয় আছে। কিন্তুজাতীয় দলের কিছু প্লেয়ারের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতি আছে; এটা সত্য। সাকিবের যে ব্যাপারগুলো মিডিয়ায় বলছে, সাকিবও কিন্তু আমাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করেনি। সাকিব যোগাযোগ করলে অবশ্যই আমরা বলতাম। আমাদেরও আরো প্রো-অ্যাকটিভ হওয়া উচিত ছিল। এ জায়গায় আমাদের অবশ্যই ঘাটতি আছে।”

ঘাটতি আসলে অনেক জায়গাতেই৷ বিশেষত ওই ‘পেশাদারিত্ব’ শব্দটায়। এর সঙ্গে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভাব হয়নি। বরং অভাবটাই প্রকট। কখনো-সখনো তাই সাকিব-মাশরাফিদের বিস্ফোরণ ঘটলেও পরিবর্তন হয় না তেমন কিছুর। না বিসিবির; না ক্রিকেট পরিচালনার।

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close