আলোচিতসারাদেশস্বাস্থ্য

আগুন লাগার ঝুঁকিতে ঢাকার ৪২২টি হাসপাতাল!

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : করোনাকালে আইসিইউতে চাপ পড়ায় বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে আগুনের ঝুঁকি বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশের সব হাসপাতাল ও ক্লিনিককে অগ্নি নির্বাপণের ব্যবস্থা করতে বললেও সেখানে আগুন লাগার ঝুঁকি কমার লক্ষণ নেই।

সর্বশেষ গত ১৭ মার্চ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাতালের করোনা ইউনিটের আইসিইউতে আগুন লেগে চার জন রোগী মারা গেছেন। এর আগে গত বছর মে মাসে বেসরকারি ইউনাইটেড হাসাপাতালে করোনা ইউনিটে আগুন লেগে পাঁচ জন মারা যান।

এর বাইরে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন স্থানের হাসপাতালগুলোতে আগুন লাগার ঘটনাও অনেক ঘটেছে। ঢাকা মেডিকেলে গত জানুয়ারি মাসেই আরেকবার আগুন লেগেছিল। ওই আগুন লেগেছিল পুরনো ভবনের আইসিইউতে।

ফায়ার সার্ভিসের হিসেব অনুযায়ী গত বছর (২০২০) সারাদেশে মোট আগুনের ঘটনা ঘটেছে ২১ হাজার ৭৩টি। এর মধ্যে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে আগুনের ঘটনা ঘটেছে ৯০ টি। তার আগের বছর, অর্থাৎ ২০১৯ সালে সারাদেশে আগুনের ঘটনা ছিল ২৪ হাজার। তারমধ্যে হাসপাতাল ও ক্লিনিকে আগুনের ঘটনা ছিল ৭৭৮টি। কিন্তু করোনার সময় আইসিইউতে আগুন লাগার ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. ফরিদ হোসেন জানান, ঢাকা মেডিকেলের আইসিইউতে সর্বশেষ আগুনের ঘটনা সামান্য একটা স্পার্ক থেকে। আর তা থেকে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বলেন, ‘‘আরো অনেকের প্রাণহানি হতে পারতো। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমত দ্রুত রোগীদের সরিয়ে নেয়ায় প্রাণহানি কম হয়েছে।’’

তিনি জানান, ‘‘করোনার সময়ে হাসপাতালের আইসিইউগুলোতে আগুনের ঝুঁকি বেড়ে গেছে। এর প্রধান কারণ লোড বেড়ে যাওয়া। আইসিইউতে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা থাকায় সেখানে অক্সিজেনোর চাপ অনেক বেশি। তাই সামান্য একটি স্পার্ক হলেও আগুন ধরে যায়। ঢাকা মেডিকেলে তাই হয়েছে।’’

তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে এখন রোগীডের লোড নেয়ার মতো ক্যাপাসিটি নাই। ইলেকট্রিক লাইনগুলোও লোড নিতে পারছে না৷ শর্ট সার্কিটের আশঙ্কা আছে। তবে হাসপাতালগুলোর এই অবস্থা নতুন নয়।

ফায়ার সার্ভিসের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার ৪৪২টি হাসপাতালের মধ্যে ৪২২টি হাসপাতালই আগুন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। শতকরা হিসেবে এটা ৯৭.৫ ভাগ। এই হাসপাতালগুলোকে ফায়ার সার্ভিস নোটিশ দিলেও তেমন কাজ হয় না। এই তালিকায় ‘সাধারণ ঝুঁকিতে’ আছে ২৪৯টি এবং ‘খুবই ঝঁকিপূর্ণর’ তালিকায় রয়েছে ১৭৩টি৷ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ‘খুবই ঝঁকিপূর্ণ’ তালিকার একটি সরকারি হাসপাতাল। ঢাকা শহরের আরো ২০টির মতো বড় সরকারি হাসপাতাল আছে এই তালিকায়। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘খুবই ঝঁকিপূর্ণ’ সোরাওয়ার্দী হাসপাতালেও আগুন লেগেছিল।

ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগের সহকারী পরিচালক ছালেহ উদ্দিন বলেন, ‘‘আমরা প্রতিবছরই তাদের নতুন করে নোটিশ দিই৷ আমাদের পরিদর্শন টিমও যায়। কিন্তু অবস্থার উন্নতি হয় না। আমরা সরাসরি তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারি না৷ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাদের জানাই।’’

তিনি বলেন, ‘‘হাসপাতালগুলোর ফায়ার সেফটি খুবই খারাপ অবস্থায় রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালেরই একই অবস্থা। অনেক হাসাপতালে ফায়ার সেফটি বলতেই কিছু নেই। কিন্তু প্রত্যেক হাসপাতালে ফায়ার সেফটি থাকা বাধ্যতামূলক।’’ তবে ফায়ার সার্ভিস মনে করে, করোনার সময় হাসপাতালে আগুন লাগা বেড়ে গেছে সেরকম কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। তাদের মতে, ভবনের ফায়ার সেফটি নেশনাল বিল্ডিং কোড-এর সঙ্গে জড়িত। তবে যে ভবনে দাহ্য পদার্থ বেশি থাকবে সেই ভবনের অগ্নি নিরাপত্তাও তত ভালো হতে হবে। ভবনটি কী কাজে ব্যবহার করা হচেছ তা খুবই জরুরি ফায়ার সেফটি নির্ধারণে।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) লে. কর্নেল জিল্লুর রহমান বলেন, ‘‘হাসপাতালে অনেক বেশি ইলেকট্রিক এবং ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম থাকে। হাসপাতালে এখন অত্যাধুনিক এমআরআই মেশিন, এক্স-রে মেশিন আছে। কিন্তু হাসপাতাল ভবনগুলো অনেক পুরনো। আবার আইসিইউতে হাই অক্সিজেন ফ্লো থাকে৷ তাই পুরনো অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়।’’

তিনি বলেন, তারা হাসপাতালগুলোকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এ বিষয়ে সতর্ক করেন, কিন্তু সরসারি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক দাবি করেন, ‘‘সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও ইউনাইটেড হাসপাতালে আগুনের পর সতর্ক করা হয়েছে। সব হাসপাতালের আইসিইউ পুরোপুরি ফায়ার প্রুফ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে৷ এটা আমরা মনিটরিং করবো।’’

তিনি আরো জানান, আগুনের পর ঢাকা মেডিকেলের আইসিইউ আরো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close