আলোচিতজাতীয়

আওয়ামী লীগের অন্তর্কোন্দলে জিম্মি বসুরহাট

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : নোয়াখালির কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট পৌর এলাকায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দুই দফায় সংঘর্ষে দুই জন প্রাণ হারিয়েছেন। দুই পক্ষের সংঘাতে এখনো জিম্মি সাধারণ মানুষ।

দুই দফায় সংঘর্ষের সময় অন্তত দুই ডজন আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হলেও একটি আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। শুধু ২৮ জনকে গ্রেফতারের কথা বলা হয়েছে।

বসুরহাটের পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে গিয়েছেন যুগান্তরের বিশেষ প্রতিনিধি মাহবুব আলম লাবলু। সেখানে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠার নেপথ্যের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আসলে রাজনৈতিক কারণেই এখানে সংঘাত। একটি পক্ষের নেতৃত্বে আছেন ওবায়দুল কাদেরের ভাই আব্দুল কাদের মির্জা এবং অপর পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদল। আসলে নোয়াখালি-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরীর হয়েই কাজ করেন বাদল। বিবাদমান দু’টি পক্ষই ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ট৷ আর বিবাদের কারণ যেটা বলছিলেন, সেটা হলো ঠিকাদারি কাজ, নিয়োগ, চাঁদার টাকার নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি। দু’টি পক্ষই আওয়ামী লীগ সেক্রেটারী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ট হওয়ায় পুলিশ কোনো কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। আসলে এখানে পুলিশের এখন শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থা।’’

বসুরহাট পৌরসভা নির্বাচনের সময় থেকেই আবদুল কাদের মির্জা বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় আসেন। এ সময় তার সঙ্গে স্থানীয় বেশ কয়েকজন নেতার দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে৷ এ নিয়ে দলের দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচি চলতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৯ ফেব্রুয়ারি উপজেলার চাপরাশিরহাট পূর্ব বাজারে পৌর মেয়র আবদুল কাদের মির্জা এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলের অনুসারীদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। সেখানে গুলিবিদ্ধ সাংবাদিক বোরহান উদ্দিন মুজাক্কির পরদিন ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। গত সোমবার নোয়াখালীর বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জার বিরুদ্ধে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি খিজির হায়াত খানকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। খিজির খানকে লাঞ্ছিত করার প্রতিবাদে পরদিন বসুরহাট পৌর এলাকার রূপালী চত্বরে সমাবেশ চলাকালে আবার সংঘর্ষ বাঁধে। সেদিন সংঘর্ষের সময় আলাউদ্দিন নামে একজন সিএনজি চালক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। তাকে বাদলের অনুসারীরা নিজেদের কর্মী বলে দাবি করেছেন।

দুই দফার সংঘাতে কী পরিমাণ অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে? প্রত্যক্ষদর্শীরা কী বলছেন? মাহবুব আলম লাবলু বলেন, ‘‘এখানকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে যেটা জানতে পেরেছি, অন্তত দুই ডজন আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে। সাধারণ মানুষ দেখেছে, শত শত রাউন্ড গুলি করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশ একটি অস্ত্রও উদ্ধার করতে পারেনি।’’ পুলিশের এ ব্যর্থতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘‘আসলে আগে যে বলেছিলাম, পুলিশ শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থার মধ্যে আছে। এখানে পুলিশ তো শক্ত অবস্থানে যেতে পারছে না। একজন পুলিশ কর্মকর্তা তো বলেছেন, আমাদের হাত-পা বেঁধে পানিতে সাঁতার কাটতে বলার মতো অবস্থা।’’

তবে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘‘বসুরহাটের পরিস্থিতি এখন আমাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমরা এখন পর্যন্ত ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছি। আমি নিজেও শনিবার বসুরহাট যাবো। সেখানকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলবো। তাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করবো।’’ প্রথম দফার সংঘর্ষে একজন সাংবাদিক নিহত হওয়ার পরও দৃশ্যত কঠোর ব্যবস্থা না নেয়া এবং আরেক সংঘর্ষে আরেকজন নিহত হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘প্রথম দফায় সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি শান্ত হয়েছিল। কিন্তু হুট করেই দ্বিতীয় দফায় আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠে৷ এখন আমরা সেখানে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করেছি। আমাদের অনুমতি ছাড়া কেউ সেখানে আর রাজনৈতিক কর্মসূচী পালন করতে পারবে না। কোনো না কোনো কর্মসূচিকে ঘিরেই তো সংঘাত, এখন সেখানে কোনো কর্মসূচি হবে না।’’

বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার করা মিজানুর রহমান বাদলকে পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার মামলায় শুক্রবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বেলা ১টার দিকে তাকে নোয়াখালীর মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালতে তোলা হয়। বাদলের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক শোয়েব উদ্দিন খান।

দু’পক্ষের সংঘর্ষে দুজন নিহত হওয়ার ঘটনার জন্য কে বা কারা দায়ী- জানতে চাইলে ডিআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘‘আমরা যে ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছি, তাদের মধ্যেই কারো গুলিতে মৃত্যু হতে পারে। বিষয়টি তদন্তাধীন। তদন্ত শেষ হলেই বলা যাবে।’’ ওই ২৮ জনকেই রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেছে পুলিশ।

এদিকে বৃহস্পতিবার রাতেও ফেসবুক লাইভে এসে কাদের মির্জা বলেছেন, ‘‘জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মেরুদণ্ডহীন প্রাণী। তাকে দিয়ে সঠিক তদন্ত হবে না৷ তাই আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বা চাঁদপুরের সুজিত রায় নন্দীকে দিয়ে তদন্ত কমিটি করা হোক। এছাড়া বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা বা ঢাকা থেকে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটিও চাইলে করতে পারে সরকার। এতে সঠিক তথ্য বেরিয়ে আসবে৷ নোয়াখালির সবাই ওদের দ্বারা প্রভাবিত, ফলে তারা সঠিক তদন্ত করতে পারবে না।’’

এতদিনেও বসুরহাটের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে নোয়াখালি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ. এইচ. এম খায়রুল আনম চৌধুরী সেলিম বলেন, ‘‘এখন তো বসুরহাটের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে, আমরাও ব্যবস্থা নিয়েছি।’’ তিনি আরো বলেন, ‘‘আমরা সেখানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দিয়েছি। আমরা তো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারি না।’’ কমিটি বিলুপ্ত করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘না, কমিটি বিলুপ্ত করিনি৷’’ আওয়ামী লীগের কোন্দলে দুই জন মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে বলে নোয়াখালি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ. এইচ. এম খায়রুল আনম চৌধুরী দুঃখ প্রকাশ করলেন এভাবে, ‘‘আমরা সত্যিই বিব্রত, লজ্জিত, দুঃখিত৷ আমি তাদের আত্মার শান্তি কামনা করি।’’ আব্দুল কাদের মির্জার বৃহস্পতিবারের ফেসবুক লাইভ সম্পর্কে তার মন্তব্য, ‘‘আসলে সে তো সবার বিরুদ্ধেই বলছে। মন্ত্রী, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও বলেন, নিশ্চয় তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না, ইনশাল্লাহ।’’

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close